Wednesday , April 1 2020
Breaking News
You are here: Home / মতামত / বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একটি কালজয়ী কবিতা
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একটি কালজয়ী কবিতা

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একটি কালজয়ী কবিতা

শারজীনা দীপা

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু যেন একইডালে বসা দুটি পাখি। একটি পাখি উড়ে গেলে যেমন আরেকটি আর গাছে কসে থাকে না, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি স্বাধীনতার ডাক না দিতেন তাহলে হয়ত বাংলাদেশকে আমরা স্বাধীন রূপে বরণ করতে পারতাম না।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কোন গতানুগতিক ভাষণ নয়। যে ভাষণে জাতি দিক নির্দেশনা পায়, জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও স্বতন্ত্র জাতিস্বত্ত্বা বিনির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়, এমনকি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনতে পারে বিশ্বের মানচিত্রে। এমন ভাষণকে কালজয়ী কবিতা না বললে এর প্রকৃত মূল্য দেওয়া হয় না। তাই তো কবিদের কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন-
” একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা
বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে; কখন
আসবে কবি? ”

বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ বাগ্মীতা, দূরদর্শিতা, সূদুরপ্রসারী চিন্তার সাথে একজন আদর্শ লেখক সত্ত্বার মিল অভেদ্য। কারণ একজন কবি বা লেখক যখন কলম অস্ত্র ধারণ করেন তখন তা সময়োপযোগী যুদ্ধের সাথে তুলনা করা চলে।

জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণ ও কোন প্রথাগত বা লিখিত ভাষণ ছিল না। এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর একান্ত অন্তরের আবেগ। তাই এই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি তাদের প্রাণ বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে জাতির পিতার অসামান্য অবদান। তার অনন্য বাগ্মীতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ভাস্বর ঐ ভাষণে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, বাঙালির আবেগ, স্বপ্ন ও আকাঙক্ষাকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। এই ভাষণের মধ্যেই তিনি দিয়েছিলেন বাংলার স্বাধীনতার ডাক।

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

১৯৭১ সাল। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি যখন সবদিক থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের কাছে বন্দী তখনই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক্যবদ্ধ এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। কোন ধরণের আপোসে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন স্বাধীনতার। আর তারই আহ্বানে বাংলার ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করে যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
কবিতা যেমন কবির একান্ত নিজস্ব হৃদয়ের প্রতিফলন ঠিক তেমনই ৭ মার্চের ভাষণও পূর্ব পরিকল্পিত নয়। আবার এটি লিখিত আকারেও ছিলনা। কবি ওরফে বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক হৃদয়োৎসারিত প্রতিফলন এটি যা পাঠকের ওরফে শ্রোতার মনকে নাড়া দিয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।
এখন আসি সেই প্রশ্নে, কেন বঙ্গবন্ধুকে এই ভাষণরুপী কবিতা রচনা করতে হলো লাখ জনতার সামনে? যেকোন মানুষের কাছেই বিস্ময়কর মনে হবে, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরের মধ্যে কোন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি!

প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি তে জয়লাভ করে। জাতীয় পরিষদ ছিল ৩০০ আসন বিশিষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৩ আসন পেয়ে জুলফিকার আলী ভূট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ২য় স্থান অধিকার করে। ঐ নির্বাচন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রতি জনগণের রায়
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, জুলফিকার আলী ভূট্টোর পিপিপি, কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল ষড়যন্ত্র শুরু করে। এদিকে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অটল থাকেন। ৩ জানুয়ারী ১৯৭১ তিনি তার দলের জনপ্রতিনিধিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় শপথ গ্রহণ পরিচালনা করেন। ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা ও জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ পাঠ করান।

শাসক গোষ্ঠীর চলমান ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভূট্টো সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবেন না। তিনি অধিবেশন বয়কট করবেন এই জন্য যে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হলে পাকিস্তানের স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থাকবে না। এসব ছিল তার দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি এবং ষড়যন্ত্রের অংশ।
বঙ্গবন্ধু বলেন যে আমরা ৬ দফা কারও উপর চাপিয়ে দেব না। একজন সদস্যও যদি যুক্তিযুক্ত কোন দাবি করেন, তা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা কোন সমাধানে আসতে চায়নি। তারা এদেশের মাটি ও মানুষকে জিম্মি করে শোষণ করতে চেয়েছিল। তাই তো বঙ্গবন্ধু নামক অমর কবিকে এই কালজয়ী কবিতাখানি রচনা করতে হয়েছে যা এনে দিয়েছে স্বাধিকার, এসেছে স্বাধীনতা।

  • লেখক: শিক্ষক
  • ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ  

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top