Friday , July 10 2020
Breaking News
You are here: Home / সময়ের সাহিত্য / এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে
এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে

এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে

মুর্শিদা আক্তার রজনী  

বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে একটি মহাদেশের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই মহাদেশের অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ। হ্যাঁ, বলছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বঙ্গদেশ প্রীতি এবং তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টিকর্মের পেছনে এদেশের জীবন ও প্রকৃতির প্রভাবের কথা। পৈত্রিক জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বহুবার আসতে হয়েছে বাংলাদেশে, বহু সময় অতিবাহিত করেছেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর, নওগাঁর পতিসর এবং প্রমত্ত পদ্মার বুকে ভেসে ভেসে। এছাড়াও রয়েছে তাঁর শ্বশুরবাড়ি খুলনার দক্ষিণডিহি।

রবীন্দ্র সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে পদ্মা ও তার চারপাশের প্রকৃতি। কবিতা, গান,গল্প, উপন্যাস, নাটক,প্রবন্ধ, চিত্রশিল্প -মোটকথা একমাত্র মহাকাব্য ব্যতীত সাহিত্যের সর্বস্তরে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর স্বচক্ষে দেখা বাংলার রূপ -রস-গন্ধ-সুরের মূর্ছনা। সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য চিত্রকল্প। ফলস্বরূপ শতবর্ষ আগের বাংলার সেই রূপ একালের পাঠকের সামনে অনায়াসে ভেসে ওঠে। এসব চিত্রকল্পে লুকিয়ে থাকে দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের পরিচয়। শিলাইদহে বোটে বসে লেখা তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সোনার তরী’ যেন পুরো একটি চিত্রকল্প এবং পুরো একটি জীবনদর্শন –

“একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসী মাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা
এ পারেতে ছোটো খেত,আমি একেলা।”

বাংলার রূপে বিমোহিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিটি মুহূর্তই যেন হয়ে উঠেছে শিল্পসৃষ্টির প্রেরণা। পতিসরে বসে এক ফাগুনের সন্ধ্যা বেলায় আকাশের নিত্য তারা উঠার দৃশ্যকে চমৎকার উপমায় ভরিয়ে তুললেন –
“আকাশের দূরান্তরে
একে একে অন্ধকারে হতেছে বাহির
একেকটি দীপ্ত তারা,সুদূর পল্লীর
প্রদীপের মতো। ”
(‘সন্ধ্যা’ :চিত্রা)

শিলাইদহ অভিমুখে বোটে বসে রচনা করেছেন পৃথিবীর সৌন্দর্যের শাশ্বত প্রতীকরূপী ‘উর্বশী ‘কে –
“স্বর্গের উদয়াচলে মূর্তিমতী তুমি হে উষসী,
হে ভুবনমোহিনী উর্বশী! ”

পদ্মার বুকে বসে লেখা ‘আবেদন ‘কবিতায় ভৃত্য রূপ কবি রানী’র মালঞ্চের মালাকর হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। সে জন্য তিনি সবকিছু ছেড়ে আসতে রাজী।নিজেকে বাংলার প্রকৃতির কোলে সঁপে দিতে চেয়েছেন। তাই রানী যখন ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করেছে -‘কী কাজে লাগিবি?’ তখন ভৃত্য রূপ কবি বলেছেন –
“অকাজের কাজ যত,
আলস্যের সহস্র সঞ্চয়। শত শত
আনন্দের আয়োজন। যে অরণ্যপথে
কর তুমি সঞ্চরণ বসন্তে শরতে
প্রত্যুষ অরুণোদয়ে, শ্লথ অঙ্গ হতে
তপ্ত নিদ্রালসখানি স্নিগ্ধ বায়ুস্রোতে
করি দিয়া বিসর্জন, সে বনবীথিকা
রাখিব নবীন করি।”

বাংলার প্রকৃতিই শুধু নয়,সাধারণ গ্রাম্য মানুষের প্রতি তাঁর রয়েছে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, প্রীতি, মমতা। তারই ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছে ‘দুই বিঘা জমি ‘র মতো অসামান্য কবিতা। গরিব, খেটে খাওয়া মানুষের উপর শাসক শ্রেণির শোষণে তাঁর মন কেঁদে উঠেছিল।তাই আক্ষেপ করে বলেছেন –
“এ জগতে, হায়,সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি। ”

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনঘনিষ্ঠতার পরিচয় মেলে তাঁর গল্প সমূহে যার অধিকাংশ গল্পতেই রয়েছে বাঙালি জীবনের প্রভাব। ‘সমাপ্তি ‘,’পোস্টমাস্টার ‘,’ছুটি ‘, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন ‘ প্রভৃতি বিখ্যাত গল্পে বাংলার নদী-প্রকৃতি ও মানব জীবনের ছাপ সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

শিলাইদহ, পদ্মা, গড়াই – এসব মনে পড়লে যেমন রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে তেমনি আরেকটি নামও স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। আর তিনি হলেন ছেঁউড়িয়ার লালন সাঁই। যদিও দু’জনের সাক্ষাতের বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে তবুও রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা ‘উপন্যাসে লালনের গানের ব্যবহার এবং বিভিন্ন সভা -সেমিনারে লালনের গান থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার লালনকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। লালন শিষ্যদের কাছ থেকে তিনি লালনের অনেক গান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। ‘জীবনস্মৃতি ‘তেও তিনি স্মরণ করেছেন লালনের গান –
“খাচার মাঝে অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।”
(গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ)

বাংলা গানের কথা মনে পড়তেই বাঙালি মনে ঝঙ্কৃত হয়ে ওঠে রবীন্দ্র সংগীতের সুর।বাংলার ঋতু -প্রকৃতি, নদী,গাছপালা, ফুল-ফসল সবকিছুকে তিনি পরম মমতায় অবলোকন করেছেন এবং তাঁর গানে সুর তুলেছেন অনুপম ব্যঞ্জনায়।পড়শি লালনের প্রভাবে কিছুটা বাউল ভাবও ফুটে উঠেছে তাঁর গানে।বাংলাদেশকে ভালবাসতেন বলেই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে লেখেন ‘আমার সোনার বাংলা ‘ গানটি।আর তার সুর দেন শিলাইদহের ডাকপিয়ন গগন হরকরা রচিত ‘আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটির সুর অনুসারে। তারই সম্মানে গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পায়।এ থেকে প্রমাণিত হয় তিনি যেমন বাংলাদেশকে ভালবেসেছেন তেমনি বাংলাদেশের মানুষও তাঁকে উচ্চ মর্যাদা প্রদান করতে ভুলে যায়নি। এখানেই বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে তাঁর নিবিড়তার বহিঃপ্রকাশ।

প্রেম ও মানবতার কাছে প্রথাগত ধর্ম সংস্কার ও আচার সর্বস্ব ধর্মীয় অনুভূতির পরাজয় ঘটেছে যে ‘বিসর্জন ‘ নাটকে তার সৃজনকর্মটি সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশের সাহাজাদপুরে।কলকাতার কোলাহল ছেড়ে নীরব প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর চিন্তা-চেতনায় যে বিশুদ্ধতা নিয়ে এসেছে এসব সৃষ্টিকর্ম তারই ফল।

কবির ভাতিজি ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠি যা পরে ‘ছিন্নপত্র ‘ নামে প্রকাশিত হয় তার পাতায় পাতায় কবি পদ্মা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষ, জীবন, প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে –

“বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালবাসি।… আমি যখন শিলাইদহে বোটে থাকি তখন পদ্মা আমার পক্ষে সত্যিকার একটি স্বতন্ত্র মানুষের মতো,অতএব তার কথা যদি কিছু বাহুল্য করে লিখি তবে সে কথাগুলো চিঠিতে লিখবার অযোগ্য মনে করা উচিৎ হবে না। ”

বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অনস্বীকার্য। শহুরে জীবন ছেড়ে এই বাংলাদেশেই প্রথম তাঁর গ্রামীণ জীবন ও গ্রাম্য মানুষের সঙ্গে পরিচয়। তাই এই মানুষজনের মুখে মুখে প্রচলিত ছড়াগুলো তাঁকে অভিভূত করেছিল। এর ভেতরকার রস আস্বাদন করেই ক্ষান্ত হলেন না-সংগ্রহ এবং ‘ছেলেভুলানো ছড়া ‘ নামে প্রকাশ করে অমর করে রাখলেন বাংলার লোকসাহিত্যকে।

যে কোনো নান্দনিক সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে প্রভাব বিস্তার করে লেখকের স্থান, কাল,পাত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিলেও বাংলাদেশে না আসলে, বাংলার প্রকৃতি ও জনজীবনকে নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ না পেলে হয়তো তাঁর এতো এতো সৃষ্টিকর্মের অর্ধেকটা বাকিই থেকে যেতো।এদেশের নীরব প্রকৃতি,শান্ত নদী, কখনো তার উন্মত্ত ঢেউ, গ্রাম্য জনজীবনের সরলতা প্রভৃতি ছিল কবিগুরুর ভালবাসার অনুষঙ্গ। তাই বুঝি ‘চিত্রা ‘ কাব্যগ্রন্থের ‘দিনশেষে ‘ কবিতায় বলেছেন –

“নামিছে নীরব ছায়া ঘনবনশয়নে,
এ দেশ লেগেছে ভালো নয়নে। ”

লেখক: সহকারী শিক্ষক(বাংলা) 

হার্ভার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, ঝিনাইদহ।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!