Friday , July 10 2020
Breaking News
You are here: Home / মতামত / সাংবাদিকতায় কবি নজরুলের বিদ্রোহী অধ্যায়: প্রসেনজিৎ হালদার
সাংবাদিকতায় কবি নজরুলের বিদ্রোহী অধ্যায়: প্রসেনজিৎ হালদার

সাংবাদিকতায় কবি নজরুলের বিদ্রোহী অধ্যায়: প্রসেনজিৎ হালদার

‘বল বীর- বল উন্নত মম শির! শির নেহারী’ আমারি নত শির ওই শীখর হিমাদ্রির!’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতাখানিতে এভাবে বিদ্রোহ দেখিয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। এমনকি, প্রতিষ্ঠানও আছে তাঁর নামে। বাংলার অহংকার কিংবদন্তী আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সাদামাটাভাবেই জীবনটা শেষ করেছেন রাষ্ট্র, সমাজ তথা শোষিত মানুষের জয়গান গেয়ে। ১৮৯৯ সালের ২৫শে মে জন্ম ‘দুখু’ নামের সেই বালক জয় করেছেন কোটি মানুষের প্রাণ। গেঁথে আছেন হৃদয়ে অক্ষয়। তাইতো, শতবর্ষ পার হয়ে গেলেও ঝাকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো সেই মানুষটাকে ভুলে যায়নি কেউ।

শুধু ভারত কিংবা বাংলাদেশ নয় বরং পৃথিবীর অনেক দেশেই তার সুনাম রয়েছে। সমাজ-রাষ্ট্রের নির্যাতিত মানুষের বাণী প্রচার করেছেন নজরুল। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক নজরুল বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্যও সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তার কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। এতকিছুর মধ্যেও তাঁর আরও একটি উৎকর্ষ দেখেছে তৎকালীন শতাব্দী। সেটি হলো তাঁর সাংবাদিকতা। মূলত সাংবাদিকতা দিয়েই শুরু কবি নজরুলের কর্মজীবন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যে তাঁর অনুরাগ ছিল। সে সময় বৃটিশ শাসকদের অত্যাচার দেখে তার ভেতর বিদ্রোহী মনোভাব জাগ্রত হয়। অখন্ড ভারতবর্ষে তখন যে অত্যাচার-তান্ডব চলেছে তা নিজের চোখে দেখেই জ্বলেছেন নজরুল, হয়েছেন ‘বিদ্রোহী কবি’। বাংলা-বাঙালীকে জাগ্রত করার লক্ষ্যেই সমগ্র জীবন কলম চালিয়েছেন এই কিংবদন্তী। আর সাংবাদিকতা এ পথে তাকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে।

নজরুল তাঁর সৃজনকর্মে নিবেদিত হলেও বিদ্রোহী চেতনা ধারণ করে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে উঠেছেন। বার বার তাকে বৃটিশ রাজের রোষানলে পড়তে হয়েছে। আর এজন্য সাংবাদিকতার ভুবনে পা রাখা ছিল এক আবশ্যকীয় কর্মযজ্ঞে নিজেকে শামিল করা। ১৯১৫ এর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্তও নজরুলের শৈল্পিক জীবনের তেমন কোন আভাস পাওয়া যায় না। তৎকালীন সময়ে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত ‘মাসিক সওগাত’-এ টুকটাক লেখালেখির মাধ্যমেই শুরু হয় নজরুলের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে সৈনিক হিসেবে করাচীতে যাওয়ার পরবর্তী সময়ে তিনি শৈল্পিক দক্ষতায় সৃজনকর্ম তৈরিতে বিশেষভাবে প্রবেশ করেন। আর করাচীতে বসে লেখা গল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’র মধ্য দিয়েই বিদ্রোহী কবি তাঁর সাহিত্যিক জগতের দ্বার উন্মোচন করেন। ১৯১৯ সালে করাচী থেকে পাঠানো এই গল্প ‘মাসিক সওগাত’-এ প্রকাশ করলেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন। এরপর পত্রিকায় নিজের লেখা দেখে বিস্মিত ও অভিভূত কবি তার সহযোদ্ধাদের নিকট পড়ে শুনিয়েছেন। পরবর্তীতে টুকটাক লেখাই তাঁকে সাংবাদিক হতে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করে।

নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াযযিন হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়েই তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ১৯২০ সালের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এ সময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। তখনই তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘ভাঙার গান’র মতো কবিতা; ‘ধূমকেতু’র মতো সাময়িকী। জেলে বন্দী হয়ে লিখেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। এসব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে কলম চালিয়েছেন কাজী নজরুল। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল।

১৯২০ সালে নজরুলের সৈনিক জীবনের অবসান হয়। সাহিত্য রচনার পাশাপাশি গণমাধ্যমের দিকেও তাঁর নজর আসে। অবিভক্ত বাংলার পরিস্থিতি তখনও সুখকর ছিল না। আর এ সময়েই সরাসরি নজরুল গণমাধ্যমের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত করেন। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই সান্ধ্য ‘দৈনিক নবযুগ’র যাত্রা শুরু হয়। সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন মুজাফফর আহমদ এবং কাজী নজরুল ইসলাম। এই দৈনিক নবযুগ নজরুলের অসাধারণ লেখনীশক্তির প্রভাবে প্রথম দিন থেকেই জনপ্রিয়তা পায়। সংবাদপত্রের আঙিনায় একেবারে অনভিজ্ঞ নজরুল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তার সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করেন। লেখার ক্ষুরধারে ধীরে ধীরে জাগ্রত হতে থাকে পাঠক সমাজ।

১৯২২ সালের ‘দৈনিক সেবক’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার জগতে দ্বিতীয়বারের মতো ফিরে আসেন কবি নজরুল। এই পত্রিকাটিও বিশ শতকের উত্তাল সময়ের বিক্ষুব্ধ অধ্যায়ের সাক্ষী। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতা ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে ‘দৈনিক সেবক’-এর ভূমিকা ছিল প্রগাঢ়। এই পত্রিকার মাধ্যমেও নজরুল ছড়িয়েছেন তার বিদ্রোহের ছাপ। এরপর ‘দৈনিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় ব্যঙ্গ রসাত্মক কলাম লিখতে শুরু করেন। ১৯২২ সালে এই পত্রিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। শুধু ব্যঙ্গ রসাত্মক আলোচনায়ই নয়, শিরোনাম তৈরিতেও কবি অবিভক্ত বাংলায় জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সাংবাদিক হিসেবে নজরুলের এই অসামান্য কৃতিত্ব সমকালে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯২২ সালের আগস্ট মাসে নতুন একটি রাজনৈতিক পত্রিকা প্রকাশ করতে নজরুল আর মুজাফফর আহমদ একমত পোষণ করেন। এর জন্য অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থাও হয়ে যায়। সপ্তাহে দু’দিন বের হওয়া নজরুলের নতুন পত্রিকার নাম ‘ধূমকেতু’। এই ‘ধূমকেতু’ বাংলার সংবাদ মাধ্যমে অভাবনীয় আবেদন রেখেছে। সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অবিস্মরণীয়। ফলে জনপ্রিয়তাও আকাশ ছোঁয়া হতে সময় লাগেনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পত্রিকার শব্দবাণ সারা বাংলায় তোলপাড় সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ রাজন্যবর্গের মসনদ কেঁপে ওঠে। ১২টি সংখ্যায় প্রকাশিত এই সংবাদপত্রের ১২তম সংখ্যায় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাখানি ছাপা হয়। এতে সচেতন রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে আসায় ঔপনিবেশিক শাসক নজরুলের ওপর শুধু ক্ষুব্ধই হলো না, তাঁকে আটক করে ১ বছর কারাবন্দী করা হয়।

শাসক শ্রেণীর অত্যাচার, অবিচার ও শোষণ, তৎকালীন সাম্প্রদায়িক সমাজের জড়তা, দুর্নীতি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধেও কলম ধরেন বিদ্রোহী নজরুল। সম্পাদকীয় প্রবন্ধ হিসেবে ধূমকেতুর প্রবন্ধগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশের যৌবন-রক্তে সেসব দুঃসাহসী ও নির্ভীক প্রবন্ধ যে আবেগ ও উদ্দীপনার অগ্নি সঞ্চার করেছিল। কথ্য ভাষায় আরবি, ফারসি, দেশি শব্দের নিপুণ প্রয়োগে সেগুলো হতো তীক্ষ ও প্রাণবন্ত করেছিলেন নজরুল। সাংবাদিক জীবনের নিষ্ঠা, কর্তব্যজ্ঞান, নির্ভীকতা ইত্যাদি সদ্গুণের দুর্লভ সমাবেশ ঘটেছিল নজরুলের মধ্যে। নবযুগ ও ধূমকেতু ছাড়াও স্বরাজ পার্টির মুখপত্র ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন নজরুল। এরপর নজরুল দীর্ঘদিন পত্রিকা সম্পাদনা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন।
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নজরুল বলেছেনÑ ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।… আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সেবাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যাদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে…।’

 

লেখক : সাংবাদিক

prosenjit8000@gmail.com

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!