Wednesday , August 5 2020
Breaking News
You are here: Home / সময়ের সাহিত্য / জগদীশ গুপ্ত, ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক : রোজী আহমেদ সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
জগদীশ গুপ্ত, ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক :  রোজী আহমেদ সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

জগদীশ গুপ্ত, ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক : রোজী আহমেদ সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলা ছোটগল্প ধারার এক ব্যতিক্রমী শিল্পী জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭)। ‘কল্লোল’ পত্রিকায় তারুণ্যের সবল প্রতিক্রিয়াজনিত যে নতুন ভাবনা, মত-পথ দেখা গিয়েছিল, জগদীশ গুপ্ত তার পুরোধা। গূঢ়সঞ্চারী এই লেখক জীবনকে এক রহস্যাচ্ছন্ন তির্যক দৃষ্টিতে লক্ষ করেছেন। মানব মনের বিবিধ জটিলতাকে অভ্যস্ত ধারণা থেকে মুক্ত করে সাহিত্যে সমীকৃত করেছেন তিনি। অবচেতনের গভীরে মানসিক জটিলতার ফলে তাঁর চরিত্ররা জীবনবিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতাবোধে আক্রান্ত। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পেলব সম্পর্কের অন্তরালে যৌনানুভূতির তীব্রতা ও আক্রমণাত্মক মনোভঙ্গি কতটা ক্রিয়াশীল তা আবিষ্কার তাঁর সাহিত্যকে অনন্যতা দিয়েছে। তিনি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনকে অন্বেষণ করেছেন। তাঁর শিল্পী সত্তার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ জীবনের গহনসঞ্চারী রহস্যের দিকে, মানব চরিত্রের অন্তর্গত জটিলতার উৎস সন্ধানে। আর এই জীবনার্থ সন্ধান ও মানব চরিত্র উপলব্ধির ঐকান্তিক প্রয়াসের সূত্রে জীবনের যে তির্যক ও সর্র্পিল রূপ তা এই লেখকের অন্তর্ভেদী তীক্ষè দৃষ্টির সম্মুখে অনাবৃত্ত হয়েছে। তার ফলে জীবন সম্পর্কে এক প্রবল সংশয় ও অবিশ্বাসে তাঁর মন তিক্ত ও ক্লিষ্ট হয়ে উঠেছে।
জগদীশ গুপ্তের বাড়ি ছিল কুষ্টিয়া শহরের গড়াই নদী তীরবর্তী আমলা পাড়ায়। পিতামহ আনন্দমোহনের নামানুসারে তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘আনন্দ ভবন’ । জগদীশ গুপ্তের বিদ্যাশিক্ষার হাতে খড়ি কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পন্ডিত রামপাল সাহার পাঠশালায়। এখানকার পাঠ শেষ করে তিনি কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন কিন্তু পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, তাকে কলকাতায় চলে যেতে হয়। তবে ১৯৪৭ পর্যন্ত অনেকবার কুষ্টিয়ায় অবস্থান করেছেন তিনি। তাঁর সাহিত্য ভাবনায় কুষ্টিয়ার বাড়ির চারিপার্শে^র পরিবেশ বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। ব্যক্তিগত জীবনে জগদীশ গুপ্ত অন্তর্মুখী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। নিজেকে আড়াল করে রাখার মধ্যেই যেন স্বস্তি খুঁজে পেতেন। কথা কম বললেও তাঁর আন্তরিকতার কোন অভাব ছিল না।
মানবজীবন মূলত তার অন্তর্নিহিত বোধ ও প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয়- এই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেই জীবনের সকল প্রতিক্রিয়ার সূত্র ব্যক্তি মানস চেতনার গভীরে সন্ধান করেছেন জগদীশ গুপ্ত। সমাজ ইতিহাসের গতি কীভাবে ব্যক্তিমানসকে পরিবর্তিত করে এই দৃষ্টিকোণ থেকে কখনোই ব্যক্তি এবং সমাজকে তিনি দেখেননি। চরিত্রগুলোর সম্পর্ক এবং সংঘাত তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে লক্ষ করেছেন, অবচেতন মানসের ক্রিয়াপদ্ধতির ফলে কীভাবে এই সংঘাত রচিত হয়েছে তা তিনি অনুসরণ করেছেন। জীবন সম্পর্কিত সকল নীতি বোধ ও কল্যাণমূলক মূল্যমানকে কেবল অস্বীকার করেই তৃপ্ত নন, বিশ্বপ্রবাহের মূলে এক অমোঘ শক্তির অস্তিত্ব তিনি অনুভব করেছেন, যা একান্তরূপে বিনাশক-ক্রূর এবং কদর্য।
জগদীশগুপ্ত একাধারে ঔপনাসিক, ছোটগল্পকার, কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস লঘু গুরু, অসাধু সিদ্ধার্থ, রতি ্ও বিরতি, রোমন্থন, যথাক্রমে,গতিহারা জাহ্নবী ইত্যাদি। চিরপরিচিত পল্লিকেন্দ্রিক বাঙালি সমাজ থেকে উপন্যাসগুলোর কাহিনি এবং চরিত্র আহরণ করা হলেও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ অভিনব এবং আমাদের অপরিচিত। অচেতন বা নির্জ্ঞান মনোরাজ্যের প্রবৃত্তিগত সংঘাতের বিশ্লেষণে তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছে এই সমস্ত রচনায় কিন্তু বাইরের ঘটনাপ্রবাহে তার আলোড়ন স্বল্প, মানসপ্রদেশেই তার বিস্তার সমধিক।
লঘু গুরু উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কেউই সৃষ্টিশীল,সংস্কৃতিমনা,শুদ্ধাচারী নয়। এই গ্রন্থের বেশিরভাগ পতিত চরিত্র নির্মল নয় বরং বিকারগ্রস্থ নির্মম। উপন্যাসে উত্তম চরিত্রটি সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন বিরোধী পরিবেশের মধ্য দিয়ে চরিত্রটি বিবর্তিত হয়েছে। গণিকা জীবনের পরিবেশ থেকে উত্তম কীভাবে পারিবারিক জীবনাদর্শে আকৃষ্ট হল এই সম্পর্কে লেখক বলেছেন: ‘ মানুষ হাতে পাইয়া তাহাকে বশীভূত করিয়া খেলাইয়া খেলাইয়া পিষ্ট করিয়া তুলিবার বিদ্যাটা সে চেষ্টা করিয়া, ভিতরকার বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করিয়াছিল-তখন তার নাম ছিল বনমালা- তারও আগের নাম যূথী। মানুষ সেই যূথীর শত্রু।’ কিন্তু একসময় উত্তমের নিজের সমাজ অস্বীকৃত কাজে ঘৃণা জন্মে। ঠিক ঐ সময় বিশ^ম্ভরের সঙ্গে পরিচয়ে তার হিংস্র পুরুষ বুভুক্ষা লুপ্ত হয়ে সুস্থ সংসারজীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয় সে। যে পুরুষ তাকে গার্হস্থ্যজীবনের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করেছে সেই পুরুষ সমাজকে শাসন করে মানুষ করে তোলার আনন্দে সে সংসারজীবন শুরু করে। গণিকাবৃত্তি ছিল তার উপর আরোপিত, সে কখনই এই বৃত্তিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। উপন্যাসটির আরেক চরিত্র সুন্দরীর সাথে উত্তমের পার্থক্য এখানেই। সুন্দরীর জীবনদর্শনে দেহের সুখই প্রধান, সে বিশ^াস করে মনের সুখও দেহের সুখের থেকে আসে। গণিকা জীবনে তার দেহের সুখই একমাত্র লক্ষ্য। গর্ভবতী বিধবার সন্তান নষ্ট করার আগ্রহ, টুকীর যৌবনের জন্য ক্ষোভ তার রুচিবোধের পরিচায়ক।বিশ^ম্ভরের সংসারে সতীন কন্যা টুকীকে পেয়ে উত্তম তার এতদিনের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবার সম্ভাবনা দেখতে পায়। কিন্তু গার্হস্থ্য জীবনযাপনের আপ্রাণচেষ্টা করলেও অতীত জীবনের ইতিহাস তার পারিবারিক জীবনযাপনে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। একদিকে সুস্থ পারিবারিক জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা অন্যদিকে অতীত জীবনের জন্য অপরাধবোধ উত্তমের মানসিকতায় অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। টুকীর বিবাহ সম্পর্কিত সমস্যা উত্তমের অতীত ইতিহাসের জন্য সৃষ্টি হওয়ায় তার অপরাধবোধের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পায়।
অসাধু সিদ্ধার্থ উপন্যাসের সিদ্ধার্থ তথা নটবরের নিঃসঙ্গতার বীজ প্রোথিত আছে তার নিজেরই বিকৃত জীবন ইতিহাসের মধ্যে। সে তার অবচেতনের অপরাধবোধজনিত শাস্তির বেদনা বহন করে চলে।তার নিজের কাছে এই বেদনাবোধ যে কত তীব্র এবং সত্য তা তার মন্তব্যে সুস্পষ্ট হয় : ‘সিদ্ধার্থর মনে হইল, জীবনের অন্তহীন ধারা একটিমাত্র স্তবকে সীমাবদ্ধ হইয়া একটি রেখার সম্মুখে গতিহীন হইয়া পড়িয়াছেন। ঐ রেখাটি উত্তীর্ণ হইতে সিদ্ধার্থর মন কিছুতেই চাহিল না।’ একদিকে জীবনের তীব্র ব্যর্থতার মধ্যে বাচঁবার সান্ত্বনা, উল্লাস অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির নারীসঙ্গলিপ্সায় চাতুর্যের উদয় সিদ্ধার্থ চরিত্রকে বিভাজন করেছেন। সিদ্ধার্থ দুষ্কৃতি, অপকর্ম এবং বহু অধর্মের কাজে সম্পৃক্ত থাকলেও এগুলোর জন্য তার তীব্রতর মনস্তাপ লক্ষ করা যায় । বন্ধু দেবরাজের প্রস্তাবে তমসুক জাল করার জন্য রাজি হলেও অপরাধবোধজনিত হতাশা প্রবলভাবে তাকে বিদ্ধ করে । সে যেন অনুভব করে কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে জোর করে এই পথে নামিয়ে দিয়েছে। সে নিজে যেন এর জন্য দায়ী নয়। সিদ্ধার্থ সাংসারিক জীবনের শাস্তি এবং আনন্দ একান্তভাবে কামনা করে কিন্তু অতীতের দৃঢ় বন্ধনের জন্য সে সাংসারিক জীবনে যেতে পারছে না। লেখকের ভাষায়: ‘সিদ্ধার্থ গৃহী নয়, গৃহ তার নাই-বৈরাগী সে নহে, বৈরাগ্য তার জন্মে নাই-মাঝখানে সে দুলিতেছে…ইহা যে কত বড় ব্যর্থতা, বিরহ আর শূন্যতা তাহা কেবল সেই জানে যার ঘটিয়াছে।’ সিদ্ধার্থ চরিত্রের এই আত্মচেতনা এবং আত্মবিশ্লেষণের ঐকান্তিক চেষ্টা তার ঘৃণ্য জীবনযাত্রার উপরেও মানুষের চিরকালের মর্যাদাময় সংগ্রামের গৌরবটি উজ্জ্বল করে তুলেছে। সিদ্ধার্থ নিজের আকাক্সক্ষা তৃপ্ত করতে হীন জীবন গ্রহণ করেনি বা বিলাসবহুল জীবনযাত্রা ভোগ করার জন্য লোককে প্রতারণা করে অর্থসংগ্রহ করেনি,প্রকৃতপক্ষে তার অস্তিত্বই এমন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল যে তার তাগিদেই এই জীবনযাত্রা অনিবার্য হয়ে পড়ে। সিদ্ধার্থের মধ্যে নীতিবোধের চাপ কখনও কখনও এত তীব্র হয়ে ওঠে যার জন্য সে আত্মহত্যার চিন্তাও করে। এই অপরাধবোধ তার অন্তর্নিহিত।‘সিদ্ধার্থের মনে হইতে লাগিল, সে যেন গলিত কর্দ্দম কুণ্ডের কৃমি, মানুষের পদস্পর্শের যোগ্য সে নয়।’-অহং শক্তির এই দুর্বলতার জন্য বাস্তব পৃথিবীতে চলবার স্বাভাবিক মাত্রাজ্ঞান সে রক্ষা করতে পারেনি। ফলে সহজেই প্রবঞ্চক ইতরে পরিণত হয়েছে।
জগদীশ গুপ্ত তাঁর ছোটগল্পে নরনারীর মনোজীবনের নিগূঢ় রহস্যের জটিল গ্রন্থি মোচন করতে চেয়েছেন। তাঁর গল্প জীবন রহস্যের অতল অন্ধকারের দিকেই ইঙ্গিত করে। রুদ্রের যে নিষ্ঠুর বামরূপ তিনি সারাজীবন প্রত্যক্ষ করেছেন তারই রহস্য সন্ধানে তিনি যেন একাগ্রচিত্ত। প্রেমের চেয়ে বিকৃত কামনা, আশা ও বিশ্বাসের চেয়ে হতাশা ও সংশয়, জীবনের চেয়ে মৃত্যুর দুঃসহ রূপই তার সাহিত্যে প্রাধান্য পেয়েছে। জগদীশ গুপ্ত ফ্রয়েড দর্শনে প্রাজ্ঞ ছিলেন এমন প্রমাণ নেই বরং বিপরীতটিই আছে। সমভাবাপন্ন কোনো গোষ্ঠী বা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সংবাদ নেই অর্থাৎ জীবনকে দেখতে এবং আঁকতে গিয়ে লেখক মনের এমন গহনে নেমে পড়েছেন যাতে ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব বিশ্লেষণের আশ্চর্য্য সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।
ছোট বেলা থেকে তাঁর আশেপাশের যে প্রবাহমান জীবনধারা সেখান থেকেই তিনি রচনার উপাদান সংগ্রহ করেছেন। বহুদিনের আচরিত বাঙালির গার্হস্থ্যজীবনের ধারাটি আশ্রয় করে তিনি সাহিত্য রচনা করলেও শেষপর্যন্ত সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া আবিষ্কার করেন। গার্হস্থ্যজীবনের এতদিনের অভ্যস্ত ধারণাকে আঘাত করার মধ্যে তাঁর বিদ্রোহী সত্তা স্পষ্টতা পেয়েছে। সামাজিক ও সংস্কৃতিগত মূল্যবোধগুলোর অন্তরালে অবচেতনের বা নির্জ্ঞানের যে অসামাজিক আকাক্সক্ষাগুলো তা দীর্ঘ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন তিনি। জগদীশ গুপ্তের সৃষ্ট চরিত্রগুলো প্রাথমিকভাবে বাঙালি জীবনের অভ্যস্ত গার্হস্থ্য জীবনের চরিত্রানুযায়ী ভূমিকা পালন করে কিন্তু গল্প অগ্রসর হবার সাথে সাথে অন্তনির্হিত প্রবৃত্তিগুলির প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তুলে চরিত্রগুলো সম্পর্কে আমাদের প্রত্যাশিত ধারণাকে বিপর্যস্ত করে নতুন সম্পর্কের প্রতি দিক নির্দেশ করে। শরৎচন্দ্র -প্রভাতকুমার প্রভৃতির সম্মিলিত প্রয়াসে কথাসাহিত্যে যে সাহিত্যরুচি গড়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধে জগদীশ গুপ্ত সাহিত্যিক প্রতিবাদ। বাঙলা কথাসাহিত্যে আধুনিকতার বিবেচনা জগদীশ গুপ্তকে দিয়ে শুরু করতে হয়। কল্লোলগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া থেকে তাঁর সাহিত্য ধমের্র যে বিশিষ্ট পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল একমাত্র জগদীশ গুপ্তর রচনায় তাঁর সার্থক প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘জগদীশ গুপ্ত কল্লোলের কালবর্তী এবং সঙ্গে সঙ্গে একথাও সত্য যে কল্লোলের যা মূল বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত ছিল তা একমাত্র জগদীশ গুপ্তের রচনাতেই অভিব্যক্ত।’ অনিলবরণ রায়ের মতে, ‘আমাদের দেশে সম্প্রতি এক প্রতিভার আবির্ভাব হইয়াছে, সেটি একেবারে মৌলিক। শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র গুপ্ত তাঁহার ছোটগল্পে যে ধারা প্রবর্তিত করিয়াছেন কি প্রাচ্য কি পাশ্চাত্য, কি প্রাচীন কি আধুনিক কোথাও তাঁহার তুলনা নাই বলিলেই হয়।’ বিশ্বজিৎ ঘোষ জগদীশ গুপ্ত সম্পর্কে বলেন, ‘জগদীশ গুপ্ত তাঁর উপন্যাসে ও ছোট গল্পে পৌন:পুনিকভাবে নিয়তিশাসিত অসহায় একাকী মানুষের ছবি এঁকেছেন। তাঁর কথাসাহিত্যে শিল্পিত হয়েছে বিপর্যস্ত মানবাত্মার বিনষ্টি, মানুষের ক্লিন্ন-বিকার এবং অন্তশ্চাপ- বহিশ্চাপসম্ভব বহুমাত্রিক অসঙ্গতি। সমাজ- অসঙ্গতিজাত ব্যক্তি অসঙ্গতির রন্ধ্রপথেই জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্যে ছায়াপাত ঘটেছে নৈঃসঙ্গ্যচেতনার।’
‘শঙ্কিতা অভয়া’ গল্পে অভয়ার স্বামী অতুল ও তাদের মেয়ে সপ্তদশী শান্তির অবয়বে আছে এক গোপন দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা। মা অভয়া মেয়ে শান্তির রূপসৌন্দর্যের বিকাশে উদ্বিগ্ন, ভয়-ব্যাকুল। মাঝে মাঝে আপন বিভ্রান্তির মধ্যে সে নিজের চাপা আতঙ্ক ও শিহরণে আত্মহননের কথাও ভাবে। বাবার সঙ্গে শান্তির অশরীরী প্রেম, পরকিয়া প্রেম, নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রচ্ছন্ন যৌনতা, চুম্বন আকর্ষণ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা যা অভয়ার কাছে উদ্ভট ও উৎকট মনে হয়। অভয়ার মনে যে সন্দেহ ও ভয় জটিলতা আছে তা অভয়া-অতুলের দাম্পত্যের সূক্ষ্ম সন্দেহকে কেন্দ্র করে। শান্তি অতুলের রক্ত সম্বন্ধের সন্তান নয় সুতরাং অতুলের সঙ্গে শান্তির সম্পর্ক ভাবনায় অভয়ার সন্দেহ মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার সৃষ্টি করে। অতুল-অভয়া-শান্তি তিনটি চরিত্রের মনোলোকের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার টানাপড়েনে এই গল্পটি বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। অবচেতন মনের রহস্যময় অস্থির আলোক অন্ধকার থেকে যে বোধের জন্ম ও বিস্তার অভয়া তারই আধারে সক্রিয়। মূলত জগদীশ গুপ্ত অভয়াকে ফ্রয়েডীয় যৌনদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে চিরন্তন এক নারীর জটিল মনকে গল্পের কেন্দ্রে আদ্যন্ত সক্রিয় রেখেছেন।
স্বামী স্ত্রীর প্রেমের সম্পর্কের স্থানে পুরুষের দেহ সর্বস্বতার জন্য তা যদি শরীরের সীমার মধ্যে আটকে পড়ে তাহলে নারীর আত্মিক জগৎ কী পরিমাণ নিঃসঙ্গ হয়ে উঠতে পারে তারই পরিচয় বহন করে ‘বিধবা রতিমঞ্জরী’ গল্পটি । রতিমঞ্জরী স্পষ্ট অনুধাবন করে তার স্বামী অক্ষয় তাকে কখনও ভালোবাসে নি । দীর্ঘ এগার বছর দাম্পত্যজীবন কাটিয়ে স্বামী দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও রতিমঞ্জরীর কাছে এই সময়টা যেন বেশ্যাবৃত্তিরই নামান্তর। কারণ ‘লম্পট বেশ্যাকে যে চোখে দেখে তিনি (অক্ষয়) আমাকে (রতিমঞ্জরীরকে) সেই চোখের দেখতেন।’ তাই স্বামীর মৃত্যুর পর সে বিশেষ কোনো দুঃখ অনুভব করে না। বরং ‘ শ্রাদ্ধের দিনে মনে হল, সে ভারি একা- পরলোকগতের সঙ্গে ইহবাসীর ইহলৌকিক যে সম্পর্ক এমন দিনে নিবিড়তর হয়ে শ্রদ্ধায় ধৌত হতে থাকে তা এখানে নেই।’দীর্ঘদিন আনন্দবঞ্চিত রতিমঞ্জরীর দৈনন্দিন দিনযাপনের গ্লানিতে ক্লান্ত ও অতৃপ্তি অনুভব করে। জীবনের দীর্ঘতর অনুভূতির অন্তরালে আবদ্ধ এক নিদারুণ নিঃসঙ্গতা তাকে নতুন উপলব্ধি ও জীবনবোধ সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। নৈঃসঙ্গ্য মানবস্বভাবের অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। স্বামীর সাথে তার সম্পর্ক যৌনতার ঊর্ধ্বে কোনো গভীর প্রেমপূর্ণ সৌম্যরূপ ধারণ করতে পারে নি। রতি চেয়েছিল স্বামীর হৃদয়ভরা ভালোবাসা কিন্তু স্বামী অক্ষয় রতির দেহকে চেয়েছে । রতির কল্পনার যে পবিত্র পুরুষ, সুন্দরের সাথে মিলিত হবার, আনন্দে উজ্জীবিত হবার উদ্দেশ্যে সে যাকে গ্রহণ করতে চায় তেমন কাউকে না পেয়ে চরম নিঃসঙ্গ হয়ে যায় । তার সমাজের মানুষের প্রতি এমন চরম ক্ষোভ জন্মে যে সে সিদ্ধান্ত নেয় সে গণিকা হবে। এই গল্পে নারীর আত্মিক বিচ্ছিন্নতার চিত্র ফুঁটে উঠেছে।
মানব স্বভাবের বিকৃতির চরম রূপ ধারণ করেছে ‘আদি কথার একটি’ গল্পে। পঁচিশ বছরের যুবক সুবল বিধবা কাঞ্চনের শিশুকন্যা খুশিকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছিল কাঞ্চনকে পাবার জন্য । নানা অজুহাতে কাঞ্চনকে কাছে আনা, আকস্মিকভাবে হাত ধরা ইত্যাদির ফলে দীর্ঘ দিনের সুপ্ত আকাক্সক্ষা ব্যক্ত হয়ে পড়ে। সুবলকে আঘাত করে দূরে সরিয়ে দিলেও পরমুহূর্তে কাঞ্চনের মানসিকতায় যে বিশ্লেষণ লেখক করেছেন তাতে তার নির্জ্ঞানের অবরুদ্ধ আকাক্সক্ষার স্বরূপ অনুমান করা যায়।লেখকের বর্ণনায়: ‘সুবলের অন্তরভূমি কাঞ্চনের চোখের সামনে যেন প্রসারিত হইয়া দেখা দিলো; সে যেন স্পষ্ট দেখিতে পাইল, বহুদিনের সঞ্চিত ইচ্ছা খলতায় ছলনায় পরিপূর্ণ হইয়া শামুকের মতো ধীরে ধীরে বুকে হাঁটিয়া অগ্রসর হইয়া হঠাৎ খাড়া হইয়া উঠিল।’ কাঞ্চনের মনস্তত্ত্বে এক ধরণের স্ববিরোধী মানসিকতার প্রাবল্য চোখে পড়ে। অসচ্ছল, স্বামীহীন সংসারজীবন, যৌনজীবন বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে মনের অজান্তে সে সুবলের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। প্রেমহীন, আবেগবর্জিত জীবনে তার মধ্যে অবচেতনে একঘেয়েমি চলে আসে। তাই সুবলের সক্রিয় ইঙ্গিতে কাঞ্চনের নির্জ্ঞানের অতৃপ্ত আকাক্সক্ষা প্রকাশ পায়। কাঞ্চনের মানসিকতায় এই অর্ন্তদ্বন্দ্ব সক্রিয় থাকায় সুবলের প্রতি সে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দ্বন্দ্ব অনুভব করেছে। কাঞ্চনের দোলাচল মনোবৃত্তির সুযোগে সুবল যখন নিজে বাঁচতে চাইল তখন ক্রুদ্ধ হলেও কাঞ্চনের কিছু করার থাকে না। জগদীশ গুপ্ত এই গল্পে সুবল এবং কাঞ্চনের দেহ কামনার জটিল আকর্ষণ-বিকর্ষণের ফলে তাদের সংকটকে গ্রাম্যগণ্ডি অতিক্রম করে মানুষের চিরন্তর সংকটের স্তরে উন্নীত করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবকিছুর দায়ভার নারীর উপর বর্তায় এই নিষ্ঠুর সমাজ সত্য গল্পটিতে প্রমাণিত হয়েছে।
জগদীশ গুপ্তের ‘অরূপের রাস’ বাংলা ছোটগল্প ধারায় ব্যতিক্রম ও অভিনব সংযোজন। জটিল মনস্তত্ত্ব সাথে সাথে প্রেম-সম্পর্কের সঙ্গে একাত্ম পুরুষ নারীর যৌথ দেহ ভাবনার কথা স্থান পেয়েছে । প্রিয়জনের অভাবে প্রিয়জনের ব্যবহৃত উপকরণের দ্বারা কামতৃপ্তি (ঋবঃরংযরংস) এই গল্পের মূল বিষয়। রানু ও কানু ছিল শিশুকালের বন্ধু। বয়ঃসন্ধিকালে রানুর বিয়ের সংবাদে কানু উল্লাস প্রকাশ করলে রানু কষ্ট পায়। বিবাহ পূর্ব লজ্জাবনত রানুকে দেখে সে মুগ্ধ হলেও রানুর অনুরাগকে না বুঝে ক্রোধ বলে ভুল করেছে । বহুদিন পর সন্তানবতী রানু বিবাহিত কানুর সাথে দেখা হলে রানুর পূর্ণতা দেখে কানু নিজেকে অসম্পূূর্ণ অনুভব করে। তাদের শৈশবের স্মৃতি দুজনকেই ভারাক্রান্ত করে। রানু কানুর স্ত্রী ইন্দিরার সঙ্গে দেহগত ভাবে একাত্ম হয়ে যাবার যে আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে সেখানে ভবঃরংযরংস বা বস্তুকাম এর মনোভাব স্পষ্টতা পেয়েছে।
‘পয়োমুখম্’ গল্পে কবিরাজ শ্রীকৃষ্ণকান্ত সেনশর্মা পুত্র ভূতনাথের বিবাহে পণের টাকা লাভ করবার জন্য বারবার ঔষুধের পরিবর্তে বিষ প্রয়োগ করে পুত্রবধূদের হত্যা করে । ভূতনাথের প্রথম স্ত্রী মনিমালা এবং দ্বিতীয় স্ত্রী অনুপমাকে কৃষ্ণকান্ত হত্যা করেছে অসুস্থতার সুযোগে । তৃতীয় বার বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করতে গিয়ে পুত্রের কাছে ধরা পড়ে যায় সে। স্বার্থপরতা মানুষের আদিম ও অকৃত্রিম চরিত্রলক্ষণ। সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে মানুষের স্বার্থপরতার স্বরূপ পরিবর্র্তন হলেও তা মনে এখনও ক্রিয়াশীল। মানুষের সভ্য রূপের আড়ালে নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর রূপ গুপ্ত থাকে। নৈতিকতা ও কল্যাণকামিতা মানুষের উপরিতলে থাকলেও মানুষ প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত। মানব জীবনের তলদেশ যে হিংস্র শ্বাপদের মতো বহুতর প্রবৃত্তি অবস্থান করে জগদীশ গুপ্ত তার অপূর্ব রূপকার। তৃতীয়বারে পুত্র ভূতনাথের কাছে কৃষ্ণকান্তর ধরা পড়ে গেলে ভূতনাথের অবস্থা :‘একটা নিদারুণ অতি ভয়ঙ্কর সন্দেহ ধীরে ধীরে ভূতনাথের মনে স্থিতি লাভ করিতেছিল। কী হেতু অবলম্বন করিয়া এই অসহ্য সন্দেহের উদ্ভব তাহা তাহার নিজের কাছেই একটা দূরূহ হেঁয়ালির মতো। অথচ সন্দেহটা যে আদৌ অমূলক নয় এ বিশ্বাসও অনিবার্য, যেন নিজেই তৈরী হইয়া উঠিয়াছে।’
নারীর মানবীয় অন্তর্জগৎ এবং সামাজিক বাস্তবতার রসায়নে ‘চন্দ্র-সূর্য যতোদিন’ গল্পটি বিশিষ্ট। দৈহিক ও দেহাতীত তৃষ্ণার ব্যগ্রতায় এবং পুরুষের দেহসর্বস্ব লোলুপতায় নারী জীবনের চরম বিপর্যয় এই গল্পের পটভূমি রচিত। এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে আছে দীনতারণের প্রথম স্ত্রী ক্ষণপ্রভা। ক্ষণপ্রভার ছোট বোন প্রফুল্লের সঙ্গে স্বামী দীনতারণের বিয়ে হলে ক্ষণপ্রভার মগ্নচৈতন্য বিপর্যস্থ হয়।ক্ষণপ্রভার মনস্তত্ত্ব লেখক তুলে ধরেছেন: ‘মুগ্ধ নেত্রে স্বামী এই দেহখানার দিকেও তো একদিন চাহিয়া থাকিতেন- পুলকে তখন শিরশির করিয়া সর্বাঙ্গে রোমাঞ্চ জাগিতো। -সে দিন গত কি বিদ্যমান সে -সংবাদটা তার মর্মস্থলে কোনোদিন পৌঁছিতো কিনা কে জানে, পৌঁছিলেও সে কী আকার লইয়া আসিতো তাহা অনুমান করাও সুকঠিন, কিন্তু বড়ো কষ্টের কথা এই যে, না- থাকার সেই নিদারুণ সংবাদটা আজ যে মহাসমারোহ সহকারে তার সুপ্তি ভাঙ্গিয়া দিয়া এমন অকস্মাৎ তার অন্তঃস্থলে আনিয়া দিলো সে তাহারই বোন।’ ক্ষণপ্রভার সমস্ত চৈতন্য জুড়ে যখন ঝড় হাওয়া বইছে সে সময় তাকে দীনতারণের শয্যাসঙ্গী হতে হলে তার মনে হয়… ‘শয্যায় প্রবেশ করিতে তার গা ঘিন ঘিন করিতেছে-অদূরবর্তী ঐ লোকটা কেবল একটা মাংসপিণ্ড – যেমন কদর্য তেমনি লোলুপ, তার মাংসাশী দেহটা সর্বাঙ্গ দিয়া হা করিয়া আছে-মন দিয়া ঐ দেহ স্পর্শ করা সে যেন স্মরণাতীত কোন যুগে পরিত্যাগ করিয়াছে।’ নারীর মনের এই অনুভূতির বাঙময় রূপ প্রকাশ করেছেন গল্পকার। মন না চাইলে এমনকি স্বামীর ক্ষেত্রেও শরীর মরে যেতে পারে এই সত্য প্রমাণিত হয়। নারীর ব্যক্তিগত জীবনের চরমতম গ্লানির মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল ক্ষণপ্রভার জন্য। গল্পকার সংযমে সত্যের রূঢ়তম চেহারাকে তুলে এনেছেন ‘কিন্তু দেবতা তার প্রাপ্য অর্ঘ্য আদায় না করিয়া ছাড়িল না।’ স্বামীর অমানবিক যৌনাচরণে ক্ষণপ্রভার মধ্যে মানসিক বৈকল্য দেখা দেয়। প্রেম ও মমত্বহীন দেহগত সম্পর্ক কোনো কোনো সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে এই চরম সত্যই প্রতিপাদিত হয়েছে গল্পটিতে।
জগদীশ গুপ্তের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অক্ষর(১৯৩২), তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ কাব্যগ্রন্থ কশ্যপ ও সুরভী প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে কুষ্টিয়ার অন্নদা সাহিত্য ভবন থেকে। তাছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অজস্র কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কল্পিত চরিত্র সৃষ্টি করে কাহিনিধর্মী কবিতায় তিনি বেশি লিখেছেন। এই কবিতাগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য -বিশেষ নামকরণ, পরিহাস রসিকতা, দীর্ঘ আয়তন, নাটকীয় ভঙ্গিতে একাধিক চরিত্রের সংলাপ প্রভৃতি।রাবীদ্রিক ভঙ্গিতে কিছু সনেট তিনি রচনা করেন। এক্ষেত্রে তাঁর ’ভয়’ কবিতাটি উল্লেখ করা যেতে পারে:
কিশলয় কহে ডাকি স্নিগ্ধ মৃদু সুরে
ভূপতিত ধূলিম্লান জীর্ণ পত্রটিরে:
জননীর কোল ছাড়ি’ গেছ বহুদূরে
অগ্রজ আমার তুমি ; কৌমুদি শিশিরে,
অরুণ- আলোস্নানে পলব হিল্লোলে
নাহি তব প্রয়োজন । নবমঞ্জুরীরে
বিকাশের অবকাশ দিয়া কুতুহলে
আমার সেবায় রত সন্তানবৎসলা
জননী প্রকৃতি ; আমি অতি পুলকিত;
তবু কোথা হতে আসি ’ গভীর উতলা
একটি নিঃশ^াস মোরে করে চমকিত!
তোমরা গিয়েছ আর যেতেছ যেখানে
আমি কি চলেছি সেথা প্রবাহের টানে।
জগদীশ গুপ্ত মনোলোক সচেতন লেখক। তাঁর সাহিত্যে মানব- সম্পর্কের নানামুখী জটিল আবর্তন ও বিবর্তন লক্ষ করি। নিরালম্ব মানুষের আর্তিতে জগদীশগুপ্তের জগৎ বিমর্ষ। সেই জগতে ভালোবাসার বা শ্রদ্ধা করার মতো মানুষের বড় অভাব। ফলে অধিকাংশ চরিত্রই শুধু দেহগতভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে তৎপর।তারা নিঃসঙ্গ ও একা, সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন। বাংলা সাহিত্যে জগদীশ গুপ্তের এই ধারাটি একান্তই নিজস্ব এবং জীবন তৃষ্ণার অনন্য প্রকাশ। অন্তহীন মানব জীবনের গূঢ় সত্য জগদীশ গুপ্তের রচনাকে ভিন্নতর এক মাত্রা দান করেছে। তিনি প্রথাগত নৈতিক আদর্শের নিরিখে জীবনকে বিশ্লেষণ না করে বাস্তবতায় বিচার করেছেন।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!