Monday , September 21 2020
Breaking News
You are here: Home / মতামত / অনুবাদ সাহিত্যে স্বতন্ত্র বিদ্যাসাগর: ফয়সাল সজীব
অনুবাদ সাহিত্যে স্বতন্ত্র বিদ্যাসাগর: ফয়সাল সজীব

অনুবাদ সাহিত্যে স্বতন্ত্র বিদ্যাসাগর: ফয়সাল সজীব

উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষবিদ, সমাজ সংস্কারক, মানবতার প্রাণপুরুষ ও গদ্যকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১ খ্রি.)। যাঁরা অতীতের জড়বাধা লঙ্ঘন করে দেশের চিত্তকে ভবিষ্যতের পরম সার্থকতার দিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার সারথীস্বরূপ – বিদ্যাসাগর সেই মহারথির একজন অগ্রগণ্য পথিক। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনি। উনিশ শতকের মানবতাবাদে তাঁর যেমন অবদান রয়েছে তেমনি বাংলা গদ্যের শিল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আকাশচুম্বি। রামমোহন বাংলা গদ্যের কাঠামো তৈরি করেন আর বিদ্যাসাগর তাতে প্রাণ সঞ্চার করেন। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর প্রধান অবদান অনুবাদ সাহিত্যে। তিনি মৌলিক রচনার পাশাপাশি বেশ কিছু অনুবাদ সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঋদ্ধ। এই অনুবাদ সাহিত্যের পথ ধরেই সাহিত্যে রেনেসাঁসের ঢেউ লাগে। বাংলা কথাসাহিত্যের সৃষ্টি হয়।

অনুবাদক যদি সৃজনশীল ও মৌলিক প্রতিভার অধিকারী হন তবে তাঁর অনুবাদ কর্মটিও সৃজনশীল ও মৌলিক হবে। বিদ্যাসাগর এমনই একজন শিল্পী। তিনি সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্য থেকে বিভিন্ন গ্রন্থের অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত থেকে কাহিনি এনেছেন কিন্তু বর্ণনাভঙ্গির ক্ষেত্রে নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন। অনুবাদের স্বকীয়তা, কাহিনির বর্ণনায় মাধুর্যতা ও ভাষা ব্যবহারে কুশলতা তাঁকে গদ্য শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিদ্যাসাগরের প্রথম অনূদিত গ্রন্থ বাসুদেব চরিত এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। এমন কি এর পাণ্ডুলিপিও নষ্ট হয়ে গেছে। গ্রন্থটির শিল্পসৌকর্য, ভাষা সাবলীলতা, সুষমিত পদবিন্যাস, ধ্বনিমাধূর্য ও শব্দচেতনার যথার্থ ব্যবহার দেখলে বোঝা যায় এটি অনুবাদ গ্রন্থ। তার দৃষ্টান্ত:

এক দিবস কৃষ্ণ, বলরাম ও অন্য অন্য গোপ বালকেরা একত্রে মিলিয়া খেলা করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে বলরাম প্রভৃতি গোপনন্দনেরা নন্দমহিষির নিকট গিয়া কহিলেন, ওগো, কৃষ্ণ মাট খাইয়াছে। আমরা বারন করিলাম শুনিল না। [বাসুদেব চরিত]

বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) বিদ্যাসাগরের দ্বিতীয় অনুবাদ গ্রন্থ। হিন্দি বৈতাল পচ্চীসী গ্রন্থ থেকে এটি অনুবাদ করেন। এ গ্রন্থ থেকে সে যুগের বাঙালিসমাজ সর্বপ্রথম গল্পরসের আস্বাদ লাভ করেন। তাছাড়া এর কাহিনি শুনতে সেকালে অনেকেই ভালোবাসতেন। যেমন নীল দর্পণ-এ সৈরিন্ধের উক্তি: ‘ছোটবউ, বসিস, আমি আসছি, বিদ্যাসাগরের বেতাল শুনবো।’ বিদ্যাসাগর এ গ্রন্থে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য স্থাপন করেছেন। গ্রন্থটি হিন্দি থেকে অনূদিত হলেও ঘটনার অনিবার্যতার কারণে অনেক কিছু বাদ দিয়েছেন আবার কিছু সংযোজন করেছেন। শুধু কাহিনি বিন্যাসে নয়, ভাষা বিন্যাসেও তিনি নিজস্ব স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন। বেতালের ভাষাবিন্যাস ও শব্দযোজনা অতি সহজ অথচ গম্ভীর রীতি ব্যবহার করেছেন। তবে এখানে তিনি রোমান্টিক। যেমন:

তথায় এক মনোহর সরোবর ছিল। তিনি তাহার তীরে গিয়া দেখিলেন কমল সকল প্রফুলস্ন হইয়া আছে, মধুকরেরা মধুপানে মত্ত হইয়া গুণ গুণ রবে গান করিতেছে। [বেতাল পঞ্চবিংশতি]

শকুন্তলা (১৮৫৪) বাংলা সাহিত্যে নানা দিক দিয়েই নতুন এক পথের সন্ধান এনে দিয়েছে। বিদ্যাসাগর মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম নাটকের উপাখ্যানভাগ অবলম্বন করে শকুন্তলা রচনা করেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি’র মাধ্যমে যে যথার্থ শিল্পীর আবির্ভাব, শকুন্তলা তার পরিপূর্ণ সার্থকতা। অনুবাদ করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর ভেঙেছেন, গড়েছেন। গ্রহণ ও বর্জন, মার্জিত ও পরিশিলীত করে বাঙালি পারিবারিক জীবনের আবহ সৃষ্টি করেছেন। বাগভঙ্গির মধ্য দিয়ে তপোবন নায়িকাদের চরিত্রে বাঙালিজীবনের স্বভাবধর্ম উজ্জীবিত করে তুলেছেন। আর এখানেই বিদ্যাসাগর জীবনঘনিষ্ট শিল্পী। যেমন: ‘‘সখি অনসূয়ে! কেবল পিতা আদেশ করিয়াছে বলিয়াই, জল সেচন করিতে আসিয়াছি এমন নয়; আমারও ইহাদের উপর সহোদরসেণহ আছে।’’ শকুন্তলা’র উপাখ্যান রচনায় বিদ্যাসাগর মূল নাটকের অনেক বিষয়কে তিনি যুগরুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বর্জন করেছেন। এখানে বিদ্যাসাগর আদি রসের অংশগুলো কেটে বাঙালির রুচিতেই অনুবাদ করেছেন। তাই দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে আলিঙ্গন করতে চাইলে ভীতা ও সংকুচিতা শকুন্তলা বাধা দিয়েছে যা বাঙালি নারীরই স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে: ‘‘অনন্তর রাজা, শকুন্তলার চিবুকে হসত্ম প্রদান করিয়া তাহার মুখ কমল উত্তোলিত করিলেন। শকুন্তলা শঙ্কিতা ও কম্পিতা হইয়া, রাজাকে বারংবার নিষেধ করিতে লাগিলেন।’’

বিদ্যাসাগর সংস্কারান্ধ ছিলেন না। তাই সংস্কৃত সাহিত্যে অশেষ জ্ঞান থাকলেও ইংরেজি গদ্যের প্রাঞ্জলতা, প্রসাদগুণ, পরিমাণবোধ বিদ্যাসাগরকে মুগ্ধ করেছিল। সংস্কৃত ও ইংরেজি উভয় ধারার সম্মিলনে বিদ্যাসাগরের স্টাইল বাংলা গদ্যের সাধু ভাষার প্রথম সাহিত্যিক প্রকাশ এবং শকুন্তলা এর শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। শকুন্তলা অনুবাদ প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের একটি বড় গুণ হলো – বিষয় অনুসারে ভাষাপ্রয়োগ। শুধু বিষয় অনুসারে ভাষার প্রয়োগ নয়, তিনি যে পরিবেশ, যার মুখে যে ধরনের ভাষা ও শব্দ চেতনার আবহ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন তিনি তাই করেছেন। এর কথোপকথনের ভাষা বিশেষ করে নারী চরিত্রের ভাষা একেবারে খাঁটি বাংলার লালিত্য মাধূর্য এবং তাতে আমরা সহজবোধ্যতার স্বাদ পাই। যেমন:

রাজা মনে মনে এই আন্দোলন করিতেছেন, এমন সময়ে, অপরা তাপসী, কুটির হইতে, মৃন্ময় ময়ূর আনায়ন এবং কহিলেন বৎস! কেমন শকুন্তলাবণ্য দেখ। … শকুন্তলাবণ্য শব্দে জননীর নামান্তর শ্রবণ করিয়া, উহার জননীকে মনে পড়িয়াছে। উহার জননীর নাম শকুন্তলা।

শকুন্তলার এই লাবণ্যময়ী রূপ বাংলা উপন্যাসে প্রথম চিরন্তনময়ী রোমান্টিক নায়িকার আবির্ভাব। তাছাড়া বিদ্যাসাগর মধুসূদনের মতো পৌরাণিক নায়িকাদের আদর্শের বৃত্ত ভেঙে আধুনিক জীবনোত্তাপ এবং যুগচেতনার শিল্পিত রূপ প্রকাশ করেছেন। শকুন্তলা’র কাহিনির নমনীয়তা, নিসর্গ মাধূর্য ও বেদনার সুর বাঙালি মনকে হরণ করে। তাই বিচারক বঙ্কিমের রায়ে শকুন্তলা সৃজনশীল না হয়ে শুধু অনুবাদ হয়েও মৌলিক ও সৃজনশীল সৃষ্টি।

সীতার বনবাস (১৮৬১) বিদ্যাসাগারের এক অনবদ্য সৃষ্টি। এটি ভবভূতির উত্তরচরিত নাটকের প্রথম অঙ্ক এবং বাল্মীকির রামায়ণ’র উত্তরকা-র আখ্যানের অনুসারে অনূদিত। বাংলার নারী জাগরণের অন্তর্মথিত মর্মন্তুদ বেদনা বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর আপন মর্ম থেকে অনুভব করেছেন বলেই তিনি বাল্য বিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। আর উৎসাহী হয়েছেন নারী শিক্ষা প্রসারে। অমত্মঃপুরে বন্দিনী, অবিচার ও অনাচারে অবহেলিত নিরন্তর দুঃখের দহনে দগ্ধ নারীর করুণ আর্তনাদে বিদ্যাসাগরের হৃদয় হাহাকার করে উঠেছে। এই হৃদয়যন্ত্রণার সার্থক শিল্পরূপ সীতার বনবাস। সীতার বনবাস-এ যে মৌলিকতা দেখা যায় তা সীতার করুণ পরিণতি। বাল্মীকি রামায়ণ-এ সীতা দুঃখে পাতালে প্রবেশ করে, ভবভূতিতে রাম-সীতার মিলন ঘটিয়েছেন। আর বিদ্যাসাগর দেখিয়েছেন এভাবে:

সীতা, বাল্মীকির দক্ষিণ পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিয়া, নিতান্ত আকুল হৃদয়ে, প্রতিক্ষণেই পরিগ্রহ প্রতিক্ষা করিতেছিলেন, শ্রবণমাত্র বজ্রাহতার প্রায় গতচেতনা হইয়া বাতাহতা লতার ন্যায় ভূতলে পতিত হইলেন।’ [সীতার বনবাস]

সীতার বনবাস-এ বিদ্যাসাগর রাম-সীতার পৌরাণিক যুগের সমস্যাকে আধুনিক জীবনমানস পটভূমিকায় রূপায়িত করেছেন। এ গ্রন্থে বিদ্যাসাগর বাঙালির সাংস্কৃতিক আবহ বাঙালিসুলভ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। উত্তররামচরিত-এ দেখা যায়, সীতা পরিত্যাগ কালে রাম সীতার পদতলে মসত্মক রেখে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগরের অনুবাদে বাঙালিপনার পরিচয় পাওয়া যায় এভাবে: ‘‘অঞ্জলি বন্ধলি বন্ধনপূর্বক সাতিশয় করুণ স্বরে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, প্রিয়ে! হতভাগ্য রাম এ জন্মের মতো বিদায় লইতেছে।’’ বিদ্যাসাগর ছিলেন কঠোর বাসত্মববাদী। কারণ তিনি মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী। কোনো আবেগই তাঁকে বশীভূত করতে পারতো না। কিন্তু মানুষের দুঃখে বেদনায় অস্থির হয়ে পড়তেন। বিশেষ করে নারীর প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ, যা সীতার বনবাস-এ রাম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। এ রাম চরিত্রের মধ্যে দিয়ে লেখক তাঁর জীবনের বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সীতার বনবাস-এ তাই রামের কণ্ঠে উচ্চারিত বিদ্যাসাগরের চিরন্তণ আর্তনাদ: ‘‘কি বলিয়া মনকে প্রবোধ দিব; কেমন করিয়া প্রাণ ধারণ করিব; প্রিয়ারে বনবাসে দেওয়া অপেক্ষা আমার আতমঘাতী হওয়া সহস্রগুণে শ্রেয়ঃকল্প ছিল।’’ উপন্যাস জীবনের চিত্রপ্রতিফলন নয়, জীবনের সমস্যার রূপায়ণ। উপন্যাস বাসত্মবজীবনাশ্রিত। সুসংবদ্ধ ও সুসংহত কাহিনি, আখ্যায়িকা, চরিত্র, সংলাপ, জীবনদর্শন উপন্যাসের উপাদান। এদিক থেকে বিচার করলে সীতার বনবাস একটি আধুনিক উপন্যাস। কারণ সীতার বনবাস-এর কাহিনিতে উপাদানগুলো লক্ষণীয়। আর চরিত্রগুলো পৌরাণিক কাহিনি থেকে উঠে আসা একেবারে খাঁটি বাংলার মা-মাটি-মানুষ। অন্যদিকে আত্মদ্বন্দ্বে পরাভূত ও হৃদয় রক্তক্ষরণে উন্মত্ত প্রায় রামচন্দ্র যখন বলে: ‘‘এখন কি করি কিছুই বুঝিতে পারি না। এ লোকাপবাদ দুর্নিবার হইয়া উঠিয়াছে … কেহ কখনো আমার মত উভয় সংকটে পড়ে না।’’

ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংরেজ শাসনে হিন্দুধর্মের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব, নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ বিদ্যাসাগরকে ভাবিয়ে তুলেছিল, তাই তাঁর মনে শঙ্কা জাগে তাঁর মতো কেউ যেন উভয় সংকটে না পড়ে। বিদ্যাসাগর তাঁর এই মানসপটেই রাম চরিত্রটি সৃষ্টি করে কাহিনি অপেক্ষা চরিত্রবিশেস্নষণ ও মননসমীক্ষণে শিল্পোৎকর্ষ দেখিয়েছেন। তাছাড়া ভাষাব্যবহারে বিদ্যাসাগরের স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষনীয়। শকুন্তলা’র ভাষা হতে সীতার বনবাস’র ভাষা আরও গতিমুখর। পদমাধূর্য ও ধ্বনিতরঙ্গে এবং বাক্য ও শব্দযোজনায় বিষয়ানুসারে এর ভাষা কোথাও ক্লাসিকগাম্ভির্য, কোথাও রোমান্টিকতার আলো-ছায়াই বৈচিত্র্যময়। এক কথায় বাংলা গদ্যের ক্লাসিক ও রোমান্টিক রীতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে সীতার বনবাস-এ। এর ভাষা দৃষ্টান্ত:

এই সেই জন্মস্থান মধ্যবর্তী প্রসবণ গিরি। এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চারমান জলধর মণ্ডলী যোগে নিরন্তর … তরঙ্গ বিসত্মার করিয়া প্রবলবেগে গমন করিতেছে।’ [সীতার বনবাস]

ফলে সীতার বনবাস গ্রন্থটি আধুনিক মৌলিক ট্রাজিক উপন্যাসে পরিণত হয়েছে একথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের প্রতি বিদ্যাসাগরের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আর এই ভক্তির অনুরাগে তিনি শেক্সপিয়রের The Comedy of Errors নাটক অবলম্বনে বিদ্যাসাগর ভ্রান্তিবিলাস গ্রন্থটি রচনা করেন। বিদ্যাসাগর শেক্সপিয়রকে বাঙালিমনের অধিকারী করে গড়ে তোলার জন্য নাটকীয় কাহিনিকে গল্পের আধারে ঢেলে সাজিয়ে নাটকের নাম বদলে ভারতীয় নাম দিয়েছেন। ঘটনার সংস্থান ও আচার-ব্যবহার ভারতীয় মনের অনুকূল করে নিয়েছেন ফলে ভ্রান্তিবিলাস অনুবাদ হলেও এটি মৌলিক রচনার মর্যাদা লাভ করেছে। উনবিংশ শতাব্দীতে এটি ছিল প্রথম হাস্যরসাত্মক রচনা। স্মর্তব্য, বিদ্যাসাগরের জীবনটা খুব একটা সুখের ছিল না, ছোটবেলা কেটেছে দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে। বড় হয়ে চাকরি পেয়ে সমাজভাবনা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বিধবার বিদগ্ধ যন্ত্রণা তাঁকে পীড়াদায়ক করে তুলেছিল – জীবনযন্ত্রণায় তিনি হাসির উত্তাপ ছড়িয়ে সহজ থেকে সহজতর করতে চাইতেন। যার প্রকাশ ভ্রান্তিবিলাস নাটকে। যেমন:

বিদ্যাধর চিরঞ্জীবকে বলিল, বাবু! তোমার হাতটা দাও, নাড়ির গতি কিরূপ দেখিব। চিরঞ্জীব যৎপরনাসিত্ম কুপিত হইয়া বলিলেন এই আমার হাত, তুমি কানটি বাড়াইয়া দাও।’

ইংরেজি কাহিনি থেকে অনূদিত হলেও বাঙালি পাঠকের কাছে ভ্রান্তিবিলাস কখনও বিদেশি কাহিনি বলে মনে হয়নি। কাহিনি বিন্যাসে, সংলাপ রচনায় তিনি শিল্পীসত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নাটকের স্থান, ঘটনা, পরিবেশ পরিবর্তন করে বাঙালিয়ানায় কাহিনির রূপ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, চরিত্রগুলোর নাম পর্যন্তও বাঙালি আবহ থেকে নিয়েছেন। বিদ্যাসাগর নিজেই বলেছেন:

বাঙ্গালা পুসত্মকে ইয়ুরোপীয় নাম সুশ্রাব্য হয় না; বিশেষতঃ যাঁহারা ইংরেজি জানেন না, তাদৃশ পাঠকগণের পক্ষে বিলক্ষণ বিরক্তিকর হইয়া ওঠে। এই দোষের পরিহার বাসনায় ভ্রান্তিবিলাস-এ সেই সেই নামের স্থলে এতদ্দেশীয় নাম নিবেশিত হইয়াছে।

সুতরাং ভ্রান্তিবিলাস শুধু প্রহসনমূলক অনুবাদই নয়, এটি স্বাধীনভাবে বাংলায় রূপান্তর। এ রূপান্তর করতে গিয়ে কখনও নাট্যরস ক্ষুণ্ণ হয়নি, বরং শেক্সপীয়রীয় কমেডিয়ান থেকে উৎকর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিদ্যাসাগরের বাঙলার ইতিহাস দ্বিতীয় ভাগ অনূদিত হয় ১৮৩৮ খ্রি.। ম্যাশমানের Out line of the History of Bengal-এর একাদশ থেকে ঊনবিংশ অধ্যায় পর্যন্ত গ্রন্থটি অনুবাদিত। এছাড়াও চেম্বার্সের বায়োগ্রাফী এবং আরও কয়েকটি শিশুপাঠ্য গ্রন্থও তিনি অনুবাদ করেন। এই অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমেই তিনি কথাসাহিত্যের ভাষা ও সৃজনশীল মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টি করে বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন।

[ফয়সাল সজীব: লেখক ও গবেষক ]

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!