Wednesday , September 30 2020
Breaking News
You are here: Home / ১৫ আগস্ট সংখ্য‍া ২০২০ / ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ সময়ের চেয়ে এগিয়ে : সুজন আরিফ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ সময়ের চেয়ে এগিয়ে : সুজন আরিফ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ সময়ের চেয়ে এগিয়ে : সুজন আরিফ

সংস্কারের জাঁতাকলে আজন্মকাল পড়ে থাকা বাঙালিকে আলোর পথের সন্ধান দিয়ে যে ক’জন মহামানব নিজেদের জীবন ও চিন্তাকে অমর করেছেন,তাঁদের মধ্যে মহামতি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) অন্যতম।গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ধন্য ভারতমাতার ঘুমন্ত সন্তানকে জাগিয়ে তুলতে তিনি আজীবন লড়ে গেছেন শিক্ষা, মুক্তি ও প্রগতির লক্ষ্যে। মানবতার সার্বিক মুক্তির জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, আর এই শিক্ষার ক্ষেত্রেই ভারতবর্ষ ছিলো অনেক অনেক পিছিয়ে। তাই বিদ্যাসাগর চেয়েছেন বাঙালির প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো জ্বেলে দিতে। প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হলেও সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই তিনি বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি ছিল তার। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন।বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনিই। তাকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলে অভিহিত করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ, একাধিক পাঠ্যপুস্তক, সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

বাঙলার নবজাগরণের অন্যতম আলোকিত ব্যক্তিত্ব বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন সফল সমাজ সংস্কারক। বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষার প্রচলন, বহুবিবাহ ও বাল্য বিবাহের মতো সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে তার নিরলস সংগ্রাম আজও আমরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি। এই মহান ব্যক্তিত্ব দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘দয়ার সাগর’ নামে। দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত কখনই তার কাছ থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। এমনকি নিজের চরম অর্থসংকটের সময়ও তিনি ঋণ নিয়ে মানুষের উপকার করেছেন।পিতামাতার প্রতি তার ঐকান্তিক ভক্তি ও বজ্রকঠিন চরিত্রবল বাংলায় প্রবাদপ্রতিম। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যাঁর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন প্রাচীন ঋষির প্রজ্ঞা, ইংরেজের কর্মশক্তি ও বাঙালি মায়ের হৃদয়বৃত্তি।

ভারতমাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই আলোকিত সন্তান ১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষাজীবন শেষ করে সেই বছরই ২৯ ডিসেম্বর মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিতের পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৮৪৭ সালে এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় হিন্দি বেতাল পচ্চিসী অবলম্বনে রচিত তার প্রথম গ্রন্থ বেতাল পঞ্চবিংশতি।এখানেই বিদ্যাসাগরের প্রতিভার প্রথম ঝলক দেখা যায়। বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে।এরপর সাহিত্যের যাত্রায় আর থেমে থাকেন নি তিনি। ১৮৪৯ সালে বন্ধু ও হিতৈষীদের সহযোগিতায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের লক্ষ্যে স্থাপন করেন সর্ব্বশুভকরী সভা। সেপ্টেম্বরে উইলিয়াম ও রবার্ট চেম্বার্স রচিত খ্যাতিমান ইংরেজ মনীষীদের জীবনী অবলম্বনে তার লেখা জীবনচরিত গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়। ১৮৫০ সালের আগস্ট মাসে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহযোগিতায় সর্ব্বশুভকরী পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর প্রথম সংখ্যায় বাল্যবিবাহের দোষ নামে একটি বাংলা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। । এপ্রিল মাসে রুডিমেন্টস অফ নলেজ অবলম্বনে তার রচিত বোধোদয় পুস্তকটি প্রকাশিত হয়। আমৃত্য মানবতাবাদী বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বগ্রহণ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করেন।পূর্বতন রীতি বদলে ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাড়াও কায়স্থদের সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়নের সুযোগ করে দেন। এভাবে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষালাভের সুযোগ সকল বর্ণের মানুষের জন্য খুলে দেন মহামতি বিদ্যাসাগর।

বাংলায় নারীজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর। সংস্কৃত শাস্ত্রের বিরাট পণ্ডিত হয়েও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি গ্রহণে কোনোরকম দ্বিধা প্রকাশ করেননি। সমকালের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে থাকা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।তিনি উপলব্ধি করেন যে, নারীজাতির উন্নতি না ঘটলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ড্রিংকওয়াটার বিটন উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যাসাগসর ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সম্পাদক। এটি বর্তমানে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য তিনি একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় স্ত্রীশিক্ষা বিধায়নী সম্মেলনী প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিজ গ্রাম বীরসিংহে ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি। হিন্দু বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ, তাদের প্রতি পরিবারবর্গের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল তাকে। এই বিধবাদের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার আন্দোলন সফলও হয়েছিল। ১৮৫৬ সালে সরকার বিধবা বিবাহ আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেন। তবে শুধু আইন প্রণয়নেই ক্ষান্ত থাকেননি বিদ্যাসাগর। তার উদ্যোগে একাধিক বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। তার পুত্রও( নারায়ণচন্দ্র) এক ভাগ্যহীনা বিধবাকে বিবাহ করেন। এজন্য সেযুগের রক্ষণশীল সমাজ ও সমাজপতিদের কঠোর বিদ্রুপ ও অপমানও সহ্য করতে হয় তাকে। বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিবাহের মতো একটি কুপ্রথাকে নির্মূল করতেও আজীবন সংগ্রাম করেন বিদ্যাসাগর। প্রচার করেন বাল্যবিবাহ রোধের সপক্ষেও। এর সঙ্গে সঙ্গে নারীশিক্ষার প্রচারেও যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
অনিয়মের বেড়াজাল ভেঙে দিতে সদা তৎপর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ বিরোধী পণ্ডিতদের প্রতিবাদের উত্তরে ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনামের আড়ালে রচনা করেন “অতি অল্প হইল” এবং “আবার অতি অল্প হইল ” নামে দু-খানি পুস্তক। ১৬ আগস্ট মাইকেল মধুসূদনের নাটক শর্মিষ্ঠা অভিনয়ের মাধ্যমে উদ্বোধন হয় বেঙ্গল থিয়েটারের। বিদ্যাসাগর এই থিয়েটারের ম্যানেজিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।

শুধু সমাজ সংস্কারকই নয় একজন সফল সাহিত্যশিল্পী হিসেবেও বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলি হলো- বর্ণপরিচয় , কথামালা, বোধোদয়, আখ্যানমঞ্জরী ব্যাকরণ কৌমুদী, বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (২ খণ্ডে), বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (২ খণ্ডে), অতি অল্প হইল(১৮৭৩), আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩), ব্রজবিলাশ(১৮৮৪) ইত্যাদি। এছাড়া বাংলা ভাষার পঠনপাঠন তথা ব্যাকরণগত সংস্কারেও বিদ্যাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে মনে করা হয়, বাংলার প্রথম সার্থক গদ্যকার। যদিও তত্ত্বগত ভাবে বাংলা গদ্যের জনক তিনি নন। কারণ বাংলা সাহিত্যে তার পূর্বেই গদ্যরচনা হয়েছিল। কিন্তু সেই গদ্য ছিল শিল্পগুণবিবর্জিত নীরস এবং অনেক ক্ষেত্রেই অসংলগ্ন। বিদ্যাসাগর সর্বপ্রথম কল্পনা ও স্বকীয় পাণ্ডিত্যের মিশেলে একটি গদ্যভাষার জন্ম দেন,যা ছিল সরস ও গতিশীল। এই অর্থে তিনি ছিলেন বাংলা গদ্যের নব জন্মদাতা। যেমন,১৮৫৪ সালে শকুন্তলা ও ১৮৬০ সালে সীতার বনবাস গ্রন্থে তার সেই বিশিষ্ট গদ্যশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায় :

“শকুন্তলার অধরে নবপল্লবশোভার সম্পূর্ণ আবির্ভাব ; বাহুযুগল কোমল বিটপের বিচিত্র শোভায় বিভূষিত ; আর, নব যৌবন, বিকশিত কুসুমরাশির ন্যায়, সর্বাঙ্গ ব্যাপীয়া রহিয়াছে। (শকুন্তলা, প্রথম পরিচ্ছেদ)”“লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্য! এই সেই জনস্থানমধ্যবর্তী প্রস্রবণ গিরি। এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমান জলধরমণ্ডলীর যোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলংকৃত ; অধিত্যকা প্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বিবিধ বনপাদপসমূহে আচ্ছন্ন থাকাতে, সতত স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয় ; পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী তরঙ্গবিস্তার করিয়া প্রবলবেগে গমন করিতেছে। (সীতার বনবাস, প্রথম পরিচ্ছেদ, আলেখ্যদর্শন)”

এই চিত্ররূপময়, কাব্যিক ও অলংকার বহুল গদ্যভাষার পাশাপাশি প্রয়োজন বোধে বিদ্যাসাগরকে লৌকিক ভাষার আদর্শে দ্রুতগামী ও শ্লেষাত্মক গদ্যরচনা করতেও দেখা যায়। জীবনের শেষ পর্বে রচিত ব্রজবিলাস তার একটি উদাহরণ:

“এই কয় প্রশ্নের উত্তর পাইলেই, বিদ্যারত্ন ও কপিরত্ন, উভয় খুড় মহাশয়ের সঙ্গে, নানা রঙ্গে, হুড়হুড়ি ও গুঁতোগুঁতি আরম্ভ করিব। প্রশ্নের উত্তর পাইলে, হাঙ্গাম ও ফেসাৎ উপস্থিত করিবেক, এমন স্থলে উত্তর না দেওয়াই ভাল, এই ভাবিয়া, চালাকি করিয়া, লেজ গুটাইয়া, বসিয়া থাকিলে আমি ছাড়িব না। (ব্রজবিলাস)”

মানবহিতৈষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জীবনভর সাহিত্য সাধনায় এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাঙালিকে প্রগতি ও উন্নতির দিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছেন।তাইতো বাঙালি জাতির শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মুক্তির বিকাশে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

[সুজন আরিফ: লেখক, গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ]

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!