Tuesday , September 29 2020
Breaking News
You are here: Home / মতামত / বিদ্যাসাগর : শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ :: শামিম হোসেন
বিদ্যাসাগর :  শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ :: শামিম হোসেন

বিদ্যাসাগর : শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ :: শামিম হোসেন

শিশুসাহিত্য বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগেরই সৃষ্ট একটি শাখা। কারা শিশু? কাদের জন্যই বা লেখা? আর কারাই বা শিশুসাহিত্যিক? এ নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। সাধারণত ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় রেখে রচিত শিক্ষামূলক অথচ মনোরঞ্জক গল্প, ছড়া কবিতা, উপন্যাস প্রভৃতিকেই শিশুসাহিত্য বলা যায়। ‘শতাব্দীর শিশু–সাহিত্য’ গ্রন্থে খগেন্দ্রনাথ মিত্র নিজস্ব মতামত দিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা বিদ্যালয়ের ছাত্র–ছাত্রীগণের উদ্দেশ্যে রচিত সাহিত্যকেই শিশু–সাহিত্য বলার পক্ষে’। এ বিষয়ে বয়স অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগের পক্ষপাতী কেউ কেউ। শিশু–কিশোর বয়সে যে আনন্দ ও কৌতূহল নিয়ে বিষয়টিকে দেখা হয়, বড় বয়সে সেই বিষয়টি ভাবনার সাম্রাজ্য খুলে দেয়। সব বড়দের ভিতরে যে ছোটবেলা থাকে, সেই ছোটবেলার জন্যই শিশু–সাহিত্যের জন্ম। তাকে কেন্দ্র করেই নির্মাণ; কিন্তু পরিধিটি ক্রমবর্ধমান, যে গ্রহণ করতে পারবে তারই। তাই শিশুসাহিত্য সময় ও স্থানের ভিতর তৈরি হওয়া একটি বহৃমাত্রিক সম্ভাবনা। যা নিজে জেগে থাকে, অন্যকেও জাগিয়ে রাখে।

বাংলাপিডিয়াতে শিশুসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে, এর বিশেষ বক্তব্য, ভাষাগত সারল্য, চিত্র ও বর্ণের সমাবেশ, হরফের হেরফের প্রভৃতি কলাকৌশলগত আঙ্গিক। শিশুসাহিত্যের বিষয়বৈচিত্র্য অফুরন্ত। এতে থাকে কল্পনা ও রোম্যান্স, জ্ঞান-বুদ্ধির উপস্থাপনা, রূপকথা, এ্যাডভেঞ্চার আর ভূত-প্রেতের গল্প। বিশ্ববিখ্যাত রচনাদি, যেমন: হ্যান্স এন্ডারসনের ফেয়ারি টেলস, এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড; ড্যানিয়েল ডিফোর রবিনসন ক্রসো (১৭১৯); জোনাথন সুইফটের গালিভারস ট্রাভেলস (১৭২৬); সারভাস্টিজের ডন কুইকসোট (১৬০৫), ট্রেজার আইল্যাান্ড (১৮৩৩), ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড প্রভৃতি যুগযুগ ধরে সব দেশের শিশুদের আনন্দ দিয়ে আসছে।

১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩০১ বঙ্গাব্দ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মেয়েলি ছড়া’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ শিশুসাহিত্য শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, এর ঠিক পাঁচ বছর পর ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩০৬ বঙ্গাব্দ) যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘খুকুমণির ছড়া’ সংকলনের ভূমিকায় ‘ছড়াসাহিত্য’ ও ‘শিশুসাহিত্য’ শব্দ দু’টি উল্লেখ করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। ১৮১৮ সালে কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত নীতিকথা নামক গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় শিশুসাহিত্যের গোড়াপত্তন হয়। উপদেশমূলক ১৮টি গল্পের সমন্বয়ে প্রণীত এ গ্রন্থটি স্কুলপাঠ্যরূপে ব্যবহূত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটিই প্রথম শিশুপাঠ্য গ্রন্থ।

শিশুসাহিত্যের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখের রচনার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের বোধোদয় (চেম্বারস রচিত ” রুডিমেন্টস অব নলেজ এর অবলম্বনে -১৮৫১) , কথামালা (ঈশপের “ফেবলস”অবলম্বনে-১৮৫৬), চরিতাবলী (১৮৫৬),আখ্যানমঞ্জরী(১৮৬৩), বর্ণপরিচয় (১৮৮৫) কে বাংলা শিশু সাহিত্যের পথিকৃৎ গ্রন্থ বলাই যায়।

বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থ বাংলা বর্ণমালায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।
ডক্টর অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের পূর্বেও ছাপার অক্ষরে এই জাতীয় কিছু কিছু পুস্তিকা বাজারে চলত।” ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে রাধাকান্ত দেব রচিত বাঙ্গালা ‘শিক্ষাগ্রন্থ’ (১৮২১), স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশিত ‘বর্ণমালা’ প্রথম ভাগ (১৮৫৩) ও ‘বর্ণমালা’ দ্বিতীয় ভাগ (১৯৫৪), ক্ষেত্রমোহন দত্ত কর্তৃক তিন ভাগে রচিত ‘শিশুসেবধি’ (১৮৫৪), মদনমোহন তর্কালঙ্কার রচিত ‘শিশুশিক্ষা’
গ্রন্থগুলির নাম করেছেন। তবে এই সব পুস্তিকা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “শোনা যায়, প্যারীচরণ সরকার এবং বিদ্যাসাগর একদা সিদ্ধান্ত করেন যে, দু’জনে ইংরেজি ও বাংলায় বর্ণশিক্ষা বিষয়ক প্রাথমিক পুস্তিকা লিখবেন। তদনুসারে প্যারীচরণ First Book of Reading এবং বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ’ প্রকাশ করেন।” বিহারীলাল সরকারের রচনা থেকে জানা যায় মফস্বলে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় পালকিতে বসে পথেই বর্ণপরিচয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। বিহারীলাল আরও লিখেছেন, “প্রথম প্রকাশে বর্ণপরিচয়ের আদর হয় নাই। ইহাতে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিরাশ হন; কিন্তু ক্রমে ইহার আদর বাড়িতে থাকে।” প্যারীচরণের ইংরেজি গ্রন্থখানিও বাঙালি সমাজে দীর্ঘকালের আদরের বস্তু ছিল। তবে আজকের বিশ্বায়নের যুগে এই গ্রন্থটির শিক্ষামূল্য কিছুই অবশিষ্ট নেই। অথচ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গ্রন্থটি আজও বাঙালি সমাজে শিশুদের বাংলা শিক্ষার প্রথম সহায়ক হয়ে রয়ে গেছে। এরপর আবারও ১২৫ বছরে কেবল স্বরবর্ণমালা থেকে “ঌ” (লি) ও ব্যঞ্জনবর্ণমালা থেকে “অন্তস্থ ব” বাদ গিয়েছে। ফলে বলা যায়, আধুনিক বাংলা বর্ণমালার মূল রূপকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বর্ণপরিচয়ে যে ২০টি পাঠ রয়েছে তাকে বাংলা শিশুসাহিত্যের সূচনাপর্ব বলা যায়। ছোট ছোট বাক্য, তাতে ছবি যেমন তেমনি ছন্দও ফুটে ওঠে। যেমন-
‘পথ ছাড়। জল খাও। হাত ধর। বাড়ী যাও। কথা কয়। জল পড়ে। মেঘ ডাকে। হাত নাড়ে। খেলা করে।’

‘কথামালা’ গ্রন্থটি বিদ্যাসাগর ঈশপের “ফেবলস” অবলম্বনে রচনা করলেও এই গ্রন্থটি শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক এবং শিক্ষনীয় ছিল। পশু-পাখিকে মানুষের মানবীয় গুনাবলী দিয়ে বর্ণনা করে গ্রন্থটিকে শিশুদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এই গ্রন্থের বিখ্যাত কিছু গল্প- বাঘ ও বক, শিকারী কুকুর, দাঁড়কাক ও ময়ূরপুচ্ছ, অশ্ব ও অশ্বপাল, সর্প ও কৃষক, ব্যাঘ্র ও মেষশাবক, কুকুর ও প্রতিবিম্ব, মাছি ও মধুর কলসি, সিংহ ও ইদুর, শৃগাল ও কৃষক, কাক ও জলের কলসি, খরগোশ ও কচ্ছপ, ইঁদুরের পরামর্শ প্রভৃতি আমাদের মনকে এখনো নস্টালজিক করে তোলে। শিশুরা স্বভাবত ছন্দের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হলেও এ বইয়ে সরাসরি ছন্দোবদ্ধ ছড়া বা কবিতা নেই। আমরা আগেই বলেছি, তার গদ্যে ছন্দের আভাস পাওয়া যায়, যা শিশুমনকে আকৃষ্ট করবে। তবুও বলতে হয়, শিশুর জন্য ছড়া ও কবিতার স্বাদ এতে নিশ্চয়ই মিলবে না।

‘আখ্যানমঞ্জরী’ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত একটি শিক্ষামূলক গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থটি তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়। এই গল্পগ্রন্থের বিখ্যাত কিছু গল্প হল, প্রত্যুপকার, মাতৃভক্তি, পিতৃভক্তি, মাতৃস্নেহ, গুরুভক্তি, ধর্মভীরুতা,অপত্যস্নেহ, আতিথেয়তা, দয়াশীলতা। এইগুলো আমাদের সমাজের শিশুদের চিরাচরিত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘আখ্যানমঞ্জরী’ সম্পর্কে বিদ্যাসাগর বলেন, “আখ্যানমঞ্জরী পুস্তকবিশেষের অনুবাদ নহে, কতিপয় ইঙ্গরেজী পুস্তক অবলম্বনপূৰ্ব্বক সঙ্কলিত হইল। যদি আখ্যানগুলি বালকদিগের ভাষাজ্ঞান ও আনুষঙ্গিক নীতিজ্ঞান বিষয়ে কিঞ্চিৎ অংশেও ফলোপধায়ক হয়, তাহা হইলে শ্রম সফল বোধ করিব।”

‘চরিতাবলী’ গ্রন্থটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটি ব্যতিক্রমী রচনা। গ্রন্থটি বিভিন্ন ইংরেজি বইয়ের অনুবাদের সংকলন হলেও তৎকালীন থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানব শিশুর চরিত্র গঠনে এই গ্রন্থ অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থের বিভিন্ন গল্প যেমন- ডুবাল, উইলিয়াম রস্কো, জিরম স্টোন, হন্টর, সিমসন, উইলিয়াম হটন, ওগিলবি, লীডন, জেঙ্কিন্স, উইলিয়াম গিফোর্ড, ডাক্তার এডাম প্রভৃতি গল্প মানব চরিত্রের ভালো-মন্দ দিকগুলো স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলে যা একটা শিশুর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তার গদ্যের এই গুণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
“গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনি-সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া তাহার গতির মধ্যে একটি অনতি লক্ষ্য ছন্দঃস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য এবং সবল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া, বিদ্যাসাগর বাংলাকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন।”

সেই ১৫০ বছর আগেও বিদ্যাসাগর তার শিশুতোষ রচনায় ধর্মীয় অনুষঙ্গ টানেননি। কাহিনীর সঙ্গে ধর্মের ও ধর্ম সংস্কারে সংস্রব নেই, জোর দিয়েছেন তিনি নীতিশিক্ষার ওপর, ভালোমন্দ বুঝে সচ্চরিত্র গঠনের ওপর। সেকালের ধর্মসংস্কারের বাহুল্য, আড়ম্বর ও জবরদস্তির কথা ভাবলে শিশুপাঠ্য গ্রন্থে তার এই ধর্মনিরপেক্ষ মানসের প্রতিফলন দেখে বিস্মিত ও আপ্লুত হতে হয়। তাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম যথার্থ শিল্পীকেই বাংলা শিশুসাহিত্যের পথিকৃৎ বলা যেতেই পারে। শিশুর অক্ষরজ্ঞান, নীতিশিক্ষা, চরিত্র গঠনমূলক এসব শিশুসাহিত্যের মাধ্যমেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন।

[শামিম হোসেন: প্রাবন্ধিক ও প্রভাষক, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি), ঢাকা। ] 

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!