Tuesday , September 29 2020
Breaking News
You are here: Home / ১৫ আগস্ট সংখ্য‍া ২০২০ / ঈশ্বরের বিদ্যার সাগরে নারীর অবগাহন : উম্মে হাজেরা দোলা 
ঈশ্বরের বিদ্যার সাগরে নারীর অবগাহন : উম্মে হাজেরা দোলা 

ঈশ্বরের বিদ্যার সাগরে নারীর অবগাহন : উম্মে হাজেরা দোলা 

”কন্যাপ্যেবং পালনীয় শিক্ষানীয়াতি যত্নতঃ”

অর্থাৎ পুত্রের মতো কন্যাকেও যত্ন করে পালন করতে ও শিক্ষা দিতে হবে।এমন ভাবে মহানির্বাণ তন্ত্রের শ্লোক ব্যবহার করে এদেশের ধর্মভীরু মামুষকে বোঝানোর যে ভার তিনি নিয়ে ছিলেন, তা খুব কম মহাপুরুষের মধ্যেই দেখা যায়।তিনি জানতেন যে শাস্ত্রের চেয়ে মানুষ অনেক বড়। মানবতার এই কান্ডারী হলেন উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ-সংস্কারক ও শিক্ষা প্রসার আন্দোলনের প্রাতঃস্বরনীয় মহাপুরুষ  ইশ্বর চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২০-১৮৯১)।উনিশ শতকী বাংলায় অনেক কৃতী পুরুষ জন্মে ছিলেন,বিভিন্ন ভাবে তাঁদের দান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব কিছুর মূলে ছিলেন দুই অসামন্য পুরুষ। প্রথমে রাজা রামমোহন রায়,পরে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁদের উভয়ের দ্রোহ ছিল সমাজের জাতি-নীতি, আচার ও আচরণের বিরুদ্ধে।…রামমোহন ও বিদ্যাসাগরই আমাদের দেশের আধুনিক মানবতবাদের নাবিক ও প্রবর্তক।'(বিদ্যাসাগর- আহমদ শরীফ। আশ্বিন১৩৯৮)

ব্যাকরণ, কাব্য অলংকার, বেদান্ত, ন্যায়, জ্যোতিষ ও ধর্মশাস্ত্র বিষয়ে পান্ডিত্য দেখিয়ে মাত্র ত্রিশবছর বয়সে ১৮৪১ সালে ‘কলকাতা সংস্কৃত’ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি নিয়ে পাশ করেন।পরে  ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।

রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকে খুব বড় মানুষ বলে কদর করতেন। তিনি বলেন—

‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা।বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। ‘

তিনি আরো বলেন—

‘আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বর চন্দ্রে মতো এমন অখন্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল,আমরা বলিতে পারি না। ‘

আসলেই সমকালীন জরা ও জীর্ণতার বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিক , কর্মীপুরুষ ও নির্মাতা।

ঔপনিবেশিক পরি-কাঠামোয় বিদেশীদের দ্বারা অবদামিত,নিয়ন্ত্রিত ও নিপীড়িত ভারতীয় তথা বাঙালী জাতিরই প্রতিনিধি ছিলেন ইশ্বরচন্দ্র,স্বভাবতই প্রতি পদক্ষেপেই  তাকে বইতে হয়েছে পরাধীনতার গ্লানি। সেখানে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে চর্চা ও রক্ষার বিষয়টি আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। ঔপনিবেশিক শোষণ সংশ্লিষ্ট নানা কারনে সমাজের অধিকাংশই ছিল দারিদ্র্য পীড়িত ও শিক্ষার আলোক বঞ্চিত। স্বভাবতই নানা সংস্কার -কুসংস্কারের মায়াজাল তাদের আবদ্ধ রেখেছিল। এই পিছিয়ে থাকা,অধিকার বঞ্চিত মানুষদের দুরবস্থা দেখে দেশকে মুক্ত করার অঙ্গিকার করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি বলেন-

‘যে ব্যক্তি যে দেশে জন্মগ্রহণ করে, সেই দেশের হিতসাধনে সাধ্যানুসারে সচেষ্ট ও যত্নবান হওয়া তাহার পরম ধর্ম ও তাহার জীবনের সর্বপ্রধান কর্ম।’

ধর্মীয় অন্ধকার বশবর্তী হয়ে মানুষের উপর মানুষের দমন পীড়ন বন্ধ না হলে সমাজের কল্যাণ হতে পারে না কিছুতেই। হিন্দু শাস্ত্রবিদ হয়েও ধর্মকে শিক্ষা ক্ষেত্র  থেকে দূরে সরিয়ে মানবতাকেই বড় করে দেখেছিলেন। তিনি বলেন—

‘ভারত বর্ষীয়  সর্ব সাধারণ লোক বিদ্যানুশীলনের ফলভোগী না হইলে তাহাদিগের চিত্তক্ষেত্র হইতে চিরপ্ররূঢ় কুসংস্কারের সমূলে উন্মূলন হইবে না। ‘

 

বিদ্যাসাগর বাংলা শিক্ষা ব্যবস্তাতে এক নতুন মূল্য বোধের সূচনা ঘটায়।প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নীতিশিক্ষার উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদ্যাসগর মার্জিত বুদ্ধি ও সমাজ কল্যাণ এবং বোধ সমন্বিত এক নতুন শিক্ষা -দর্শ প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। তিনি সব সময় মনুষ্যত্ব বোধের উপরগুরুত্ব আরোপ করেতেন। ১৮৫২খ্রিষ্টাব্দের ১২ই এপ্রিল রচিত ‘Notes on the sanskrit college’শিরোনামের রচনাতে বিদ্যাসাগর সমগ্র শিক্ষা দর্শনের রুপটি সুন্দর ভাবে ফুটে ওঠে।বিদ্যাসাগরের সময় হিন্দু ব্রাহ্মণ সমাজ পতিদের কারণে সমাজ ছিল কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জি, তাই তিনি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন, যে শিক্ষা হবে বিজ্ঞান ভিত্তিক,যে শিক্ষা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখায়।     বিখ্যাত বিদ্যাসাগর গবেষক বিনয় ঘোষ তাঁর “বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ গ্রন্থে লিখেছেন-প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিদ্যার সত্যকারের মিলন তীর্থ করতে চেয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজকে। কেবল সংস্কৃত কলেজ নয়,সারা বাংলাদেশে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলন তীর্থ হোক,এই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কামনা এবং  সবচেয়ে রঙিন স্বপ্ন ছিল। ” ( পৃষ্ঠা-১৮৯)

পুরুষদের শিক্ষার সাথে সাথে  নারীর যাতনাময় জীবনে কঠোর বন্ধন,কঠিন কষ্টকর নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতে বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার পথকে বেছে নিয়েছেন।নারী জাতিকে শিখিত করতে বিদ্যাসাগর শুধু অক্লান্ত পরিশ্রমই করেনি,তাঁর সর্বস্ব পনও করে ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নারীদেরকে শিক্ষায় এক মাত্র আলোর পথ দেখাতে পারে।পারে অবহেলার দ্বার উন্মোচিত করতে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য নারীদের মুক্তি আন্দোলন কিন্তু সর্বপ্রথম পুরুষরাই শুরু করে।  নারীদেরও  শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে পারলে দেশ তথা জাতির কল্যান হবে। একজন পুরুষ শিক্ষিত হলে একজন ব্যাক্তি শিক্ষিত হয়। আর একজন নারী শিক্ষিত হলে গোটা পরিবার শিক্ষিত হয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট(১৭৬৯-১৮২১)  এই সত্য উপলব্ধি করে আগেই বলেছিলেন—

“তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো। ”

বিদ্যাসাগরের আগে ভারতের খ্রিস্টান মিশনারিরাই প্রথম নারী শিক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। শ্রীরামপুরের মিশনারিরাই

এক্ষেত্রে প্রথম। শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট ছাড়াও একাধিক মিশনারীতে নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। সমকালীন সময়ে অনেকেই মনে করতো ঐ সমস্ত বিদ্যালয়ে(মিশনারী বিদ্যালয়) পড়তে গেলে,মিশনারীরা খ্রিস্টান করে দেবে। এই সমস্ত ধর্মভীতি ছাড়া, নারী শিক্ষা সম্পর্কে কিছু কুসংস্কারও সমাজে প্রচলিত ছিল।মেয়েরা স্কুলে গেলে অল্প বয়সে বিধবা  হবে, এ রকম ভ্রান্ত ধারণাও সমাজে প্রচলিত ছিল। এমন কুসংস্কার ও বিধবা বিবাহ নিয়ে তাই বিদ্যাসাগর সমস্ত হিন্দুশাস্ত্র নিখুঁতভাবে পড়লেন এবং পরাশর সংহিতার একটি শ্লোককে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এক্ষেত্রে তিনি কাটা দিয়ে কাটা তোলেন।শ্লোকটি হলো—

“নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।

পঞ্চমস্বাপৎসু নারীনাং পতিরন্যো বিধীয়তে “।

ব্রিটিশ সরকারের আইন সচিব বেথুন সাহেব যখন স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতীয় সমাজ তাঁকে বিভিন্ন ভাবে বাঁধা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই বিদ্যাসাগর ও তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী মদনমোহন তর্কালঙ্কার তাঁকে আন্তরিক ভাবে সহযোগীতা করেন। বিদ্যাসাগর মনে করেন কষ্টে নিমজ্জিত নারী সমাজের মুক্তির একমাত্র উপায় হল শিক্ষা। ১৮৪৯ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগর বেথুন সাহেবের সহযোগীতায় ‘হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়’ নামের বিদ্যালয়টি মাত্র ২১ জন ছাত্রী নিয়ে  পথ চলা শুরু করে। এটি ছিল সে সময়ের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়।বেথুন সাহেবের অনুরোধে  বিদ্যাসাগর বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য অবৈতনিক সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণে কুন্ঠাবোধ করেননি। এই বালিকা বিদ্যালয় চালু হবার প্রথম দিনেই মদনমোহন তর্কালঙ্কার তাঁর দুই কন্যা ভুবন মালা ও কুন্দমালাকে ভর্তি করেছিলেন এবং নিজে বিনা বেতনে পাঠদান করতেন। তাদের জন্য বইও লিখতেন। এই কারণে মদনমোহনকে গ্রামচ্যূত হতে হয়েছিল তৎকালীন ব্রাহ্মণ ও পন্ডিতদের জন্য।এদেশের ধর্মভীরু মানুষদের সচেতন করতে তিনি  যে সময় মেয়েদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার জন্য ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন, সে সময় গাড়ির গায়ে  ‘মহানির্বাণতন্ত্রের’ —’পুত্রের মতো কন্যাকেও যত্ন করে পালন করতে ও শিক্ষা দিতে হবে’

এই শ্লোকটি খোদাই করে দেন। ১৮৫১ সালে বেথুন   সাহেব ‘জনাই’গ্রামে একটি স্কুল পরিদর্শন কালে অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর ও নিউমোনিয়া হয়ে মারা গেলে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

অনেক ভেঙে পরেন।স্কুলকে ঠিকিয়ে রাখতে তিনি সর্ব শক্তি নিয়োগ করেন। বেথুন সাহেবের নামকে যাথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বেথুন বালিকা বিদ্যালয়।’

বেথুন সাহেবের প্রণয়নের পর তাঁর প্রচেষ্টা আরো বৃদ্ধি পেল।     মদনমোহন তর্কালঙ্কারের দুই কন্যা ভুবনমালা ও কুন্দমালারা তো ভর্তি হয়েছেই। ক্রমেই স্বামী বিবেকানন্দের দুই বোন,কেশচন্দ্র সেনের কন্যারা,ঠাকুরবাড়ির স্বর্ণ কুমারী দেবী,তাঁর কন্যা সরলা—সকলেই বেথুন স্কুলের ছাত্রী হলেন। প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলীও এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন।

১৮৫৪ সালে উডের ডেসপ্যাচে স্ত্রীশিক্ষার ওপর

গুরুত্ব দিলে বিদ্যাসাগর বিশেষ আনন্দিত হন। এরপরের বছর ১৮৫৫ সালে বিদ্যাসাগর স্কুল ইন্সপেক্টর নিযুক্ত হয়ে নারী শিক্ষায় জোয়ার আনেন। ১৮৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে তিনি বর্ধমান,হাওড়া,হুগলী, বীরভূম,২৪পরগনা ও মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন। এগুলিতে মোট ১৩,০০ ছাত্রীদের জন্য তিনি ব্যাক্তিগত ভাবে ৩,৪০০  টাকা খরচ করেন। বর্ধমান জেলার জৌগ্রামে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৮৫৭ সালের ৩০-শে মে একটি চিঠিতে তিনি ডিরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশনকে লিখেছেন—

” It is with great pleasur I have the honour

to report that the inhabitants of Jowgong in Burdwan have  at the suggestion of the Headmaster of the model school at that Village established a female school there…….. Having however visited it during this week,I have been led to hope that there is every chance

S of it flourishing within a short time. Not only do thr inhabitants take the liveliest interest in its succes, but the girls themselves appear to prosecute their studies with great delight and attentio…. ”

পরবর্তীকালে বিদ্যা সাগর সরকারের কাছে  ধারাবাহিক তদবির করায় সরকার এই বিদ্যালয় গুলির কিছু আর্থিক ব্যায়ভার বহন করতে রাজী হয়।

এই বিদ্যালয় গুলি ছাড়াও গ্রামাঞ্চলে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর বাংলার বিভিন্ন জেলায় ‘স্ত্রী শিক্ষা বিধায়নী স্মমিলনী’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে গ্রামকে অধিক প্রধান্য দিয়ে ছিলেন। তিনি মনে করতেন গ্রামের মেয়ে বেশি অবহেলি, বঞ্চিত।

ইশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগরের প্রপৌত্র মি.অধিকারী বলেন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিদ্যাসাগর সারা জীবন লড়াই চালিয়েছেন।

নারী শিক্ষায় বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টা আর অসীম ইচ্ছা শক্তির ফলে বাংলার নারীরা মহীরুহের মতো বিস্তার লাভ করে। বালিকা বিদ্যালয় গুলিতে মহিলা শিক্ষিকা নিযুক্তির জন্য মিস মেরি কার্রপেন্টার ১৮৭২ সালে ‘নরমাল স্কুল’ তৈরি করেন।               ১৮৭৮ সালে বিদ্যাসাগরের পৃষ্ঠপোষকতায় বেথুন স্কুল ‘বেথুন কলেজে’ পরিনত হয়। যার প্রথম মহিলা স্নাতক  ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলি ও চন্দ্রমুখী বসু।তিনি তার অন্তিমকাল পর্যন্ত নারী শিক্ষার অগ্রগতি ভীষণ ভাবে চাইতেন। তাই যদি কোন মহিলা উচ্চশিক্ষিত হতেন তিনি অত্যন্ত খুশি হতেন। তার প্রমাণ মেলে যখন শ্রীমতী চন্দ্রমুখী বসু ১৮৮৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পরীক্ষায় পাশ করলেন তখন বিদ্যাসাগর শ্রীমতী চন্দ্রমুখী বসুকে সচিত্র শেক্সপীয়ার গ্রন্থাবলীর একখন্ড উপহার সহ একটি অভিনন্দন পত্র পাঠান।তিনি এই গ্রন্থে স্ব-হস্তে লিখেন—

“To srimati Chadramukhi Basu,The First Bengali Lady who has obtained the Degree of Master of Arts of the calcutta University from her sincere well-wisher Iswar Chandra sarma.

এমনকি নিজের বীর সিংহ গ্রামে মা ভগবতী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৮৯০ সালে গড়ে তোলেন ‘ভগবতী বিদ্যালয়’ এটি ছিল নারী শিক্ষায় বিদ্যাসাগরের সর্বশেষ কর্মপ্রয়াস।

ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল তাঁর স্বাধীন চিন্তায় -শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে।তিনি সমাজের অন্ধকার থেকে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে নারী জাতিকে উদ্ধার করেছেন।তিনি ছিলেন নারী শিক্ষা বিস্তারের পথিকৃৎ।

‘স্ত্রী শিক্ষার সূত্রপাত ও বিস্তারে তাঁর অদান ব্যাপক।শুধু স্ত্রী শিক্ষাই নয়, সমাজের সকল স্তরের মানুষকে বিদ্যাসাগর শিক্ষার আলো দেখাতে চেয়েছিলেন-‘(ড.উত্তম কুমার মুখার্জী)

শিক্ষার ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী। নিজ সময়ের চেয়ে এগিয়ে  চলা  মানুষটির কাছে সমস্ত নারী জাতি ঋণী।শুধু শিক্ষা নয়  বিধবা বিবাহ,বিবাহের বয়স এসব ক্ষেত্রে তিনি নারীদের  হীন অবস্থার  উপর গুরুত্ব আরোপ করে যে কাজ করছেন তা সর্বকালে প্রশংসার দাবিদার। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন-রামকৃষ্ণ এর পর,আমি বিদ্যাসাগরকে অনুসরণকরি।’বাংলার নবজাগরণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।এই মানুষ গড়ার কারিগরের আদর্শকে যদি আমরা সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করতে পারি তবে আমরা প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবো।মাইকেল মধুসূদন  দত্ত তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ কবিতায় চমৎকার ভাবে বিদ্যাসাগরকে তুলে ধরেছেন—

“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।

করুণার সিন্ধু তুমি,সেই জানে মনে,

দীন যে,দীনের বন্ধু!-উজ্জল জগতে

হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে। ”

[উম্মে হাজেরা দোলা: প্রাবন্ধিক ও  শিক্ষক, সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা ]

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!