Tuesday , September 29 2020
Breaking News
You are here: Home / ১৫ আগস্ট সংখ্য‍া ২০২০ / ‘কালান্তর’ : রবীন্দ্র-বীক্ষণ :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল
‘কালান্তর’ : রবীন্দ্র-বীক্ষণ :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

‘কালান্তর’ : রবীন্দ্র-বীক্ষণ :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

প্রবন্ধসাহিত্যে রচয়িতা তথ্য, তত্ত্ব এবং যুক্তির সাহায্যে একটি সিদ্ধান্তে উপস্থিত হন, একটি সত্যের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবন্ধ জ্ঞানের সাহিত্য, বিষয়বস্তুই এখানে প্রধান। ব্যক্তিমন প্রধান হয়ে ওঠে তখনই যখন প্রবন্ধ সাহিত্যের রূপ নেয়। সেখানে তথ্য-তত্ত্ব-যুক্তি-সিদ্ধান্তের সমাবেশকে আচ্ছন্ন করে একটি রসব্যঞ্জনা, ‘বক্তব্যের ওপরেও কিছু ইঙ্গিত’। সেক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর মহিমা ও অনুপম প্রকাশরীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) প্রবন্ধগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর বক্তব্য কেবল বাণীবদ্ধই হয়নি, সৌন্দর্যমণ্ডিত ও রসসমন্বিত। নিছক যুক্তির সূত্র অনুসরণে একটি সম্পূর্ণ প্রবন্ধ রচনা রবীন্দ্রসাহিত্যে সুদুর্লভ। তাঁর প্রবন্ধে বিষয় ও বিষয়ী উভয়ই মুখ্য, অনেক ক্ষেত্রে বিষয়ী বিষয়কে অতিক্রম করেছে। কল্পনার ঐশ্বর্য ও অলঙ্কার প্রাচুর্য রবীন্দ্রগদ্যের প্রধান গুণ। তাঁর চিন্তার ও অনুভূতির মাধ্যম অলঙ্কার। সাহিত্য ইতিহাস প্রণেতা সুকুমার সেন (১৯০১-১৯৯২) উল্লেখ করেছেনÑ ‘রবীন্দ্রনাথের গদ্য রচনার অলঙ্কৃতি বিভূষণভার নয়। তাহা স্বাভাবিক ও সহজাত সৌন্দর্য।’ গবেষক অধীর দে’র বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্যÑ ‘রবীন্দ্রনাথ কবি এবং প্রধানত রোমান্টিক কবিÑএই পরিচয়ের দ্বারাই তিনি সমগ্র বিশ্বে বিশ্রুতকীর্তি হইয়াছেন। কিন্তু রবীন্দ্র-প্রতিভা কেবলমাত্র কাব্যের ক্ষেত্রেই সীমায়িত ছিল না, তাহা সহজ-সুন্দর-রসময় ভঙ্গিতে প্রবাহিত হইয়া বাংলা সাহিত্যের সকল বিভাগই দুর্লভ ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে।’ বস্তু এবং ভাবের সমগ্রতায় যে চৈতন্যময় মানবসত্তা রবীন্দ্রনাথের মৌল উপজীব্য, তার উৎস কেন্দ্রে নিয়ত শক্তি সঞ্চার করেছে, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ ও সভ্যতার অনিঃশেষ বৈচিত্র্যে গতিশীল প্রবাহ-তরঙ্গ। রৈবিক মানবিকতার অভিব্যক্তি কখনো ধনতান্ত্রিক অসাম্যের বিরোধিতায়, কখনো গভীর স্বাদেশিকতায়, কখনো বা সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদ বিরোধী বিশ্বশান্তির আহ্বানে, আবার কখনো ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নারী স্বাধীনতার স্বপক্ষে কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতা ও সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে অথবা সত্য-ন্যয়-কল্যাণের ভিত্তিতে বিশ্বজনীনতার নিশ্চিত আশ্বাসে অগ্রসর। রবীন্দ্রসাহিত্যের অবয়ব বিশেষ করে গান, নাটক, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ চিঠিপত্রে ব্যাপক পরিসরে রবীন্দ্রমানসের এই বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত।
রবীন্দ্রনাথের সার্বভৌম কবি-মনীষাউজ্জ্বল দীপ্তিতে উজ্জ্বল হলেও এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ একটি উচ্চশ্রেণির আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং তাঁর সম্পূর্ণ নবতম ভাব বা শিল্পসৃষ্টির দ্বারা বাংলা প্রবন্ধের বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথের ন্যায় এমন বিরল প্রতিভার মণিকাঞ্চনযোগে অধুনা বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্যে আন্তর্জাতিক গৌরবময় স্তরে উন্নীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী কবি-প্রকৃতি প্রবন্ধ রচনাকালেও সম্পূর্ণভাবে আত্মগোপন করে থাকেনি। তাঁর রোমান্টিক ভাবধর্মী সৃজনকুশলী কবিমন প্রবন্ধকার রবীন্দ্রনাথকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সেজন্য রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ কেবলমাত্র বস্তুধর্মী নীরসতত্ত্ব বা তথ্য বিশ্লেষণই পর্যবসিত হয়নি, তা তাঁর অনুভূতি-স্নিগ্ধ কবিমনের মধুর স্পর্শে এক রসসমৃদ্ধ অভিনব সাহিত্যকর্ম হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রপ্রতিভার অসামান্যতা সৃষ্টির বহুমুখীনতা ও অভিব্যক্তির বৈচিত্র্যের মধ্যে প্রতিভাত। মহাসমুদ্রের বিশালতা ও গভীরতা সমৃদ্ধ রবীন্দ্রসাহিত্যের একটি ধারা তাঁর সুবিশাল প্রবন্ধ সাহিত্য। রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, দর্শন অধ্যাত্মবিষয়ক ও সাহিত্য-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছেন। তাঁর প্রাবন্ধিকসত্তার প্রথম প্রকাশ ১২৮৩ বঙ্গাব্দে মাত্র পনেরো বছর বয়সে গ্রন্থ-সমালোচনামূলক প্রবন্ধ ‘ভুবনমোহিনী প্রতিভা’,‘অবসর সরোজিনী’ ও ‘দুঃখসঙ্গিনী’ রচনায়। এই সত্তার বিকাশ ১৯৪১-এর জন্মদিনের ভাষণ ‘সভ্যতার সংকট’ (১৩৪৮) পর্যন্ত। প্রদীপ্ত মনীষা, অকাট্য যুক্তি, জ্বলন্ত উৎসাহ এবং ভাষার ওপরে রাজকীয় কর্তৃত্ব তাঁর প্রবন্ধের বিশিষ্টতার পরিচায়ক। তাঁর রসরচনার অন্তর্গত ব্যক্তিগত প্রবন্ধ, আত্মকথা, চিঠিপত্র, ডায়েরি ও ভ্রমণ কাহিনি। এই রসরচনাগুলো কবিতার মতোই বিশুদ্ধ রসবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বিষয় অবলম্বন করে প্রবন্ধ লিখেছেন। শিল্প, সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি সকল বিভাগেই তাঁর কীর্তি সমুজ্জ্বল বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইত্যাদি বিষয়ে কবি গুরুর চিন্তা ব্যাপক এবং সকল বিষয়ে তিনি প্রচুর লিখেছেন, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি সম্পর্কেওরয়েছে তাঁর স্বকীয় মৌলিক চিন্তা। এ বিষয়ে আমরা দেখি রবীন্দ্রনাথের ‘আত্মশক্তি’(১৯০৫),‘ভারতবর্ষ’(১৯০৬), ‘রাজাপ্রজা’ (১৯০৮), ‘স্বদেশ’ (১৯০৮), ‘কালান্তর’ (১৯১৪) ও পরিচয় (১৯১৬) প্রভৃতি প্রবন্ধগ্রন্থ বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের পরম সম্পদ।
‘কালান্তর’ রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রবন্ধের সংকলন গ্রন্থ। গ্রন্থমধ্যে সন্নিবেশিত হয়েছে ‘কালান্তর’ (১৩৪০), ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ (১৩২১), ‘লোকহিত’ (১৩২১), ‘লড়াইয়ের মূল’ (১৩২১), ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ (১৩২৪), ‘ছোটো ও বড়ো’ (১৩২৪), ‘স্বাধিকারপ্রমত্তঃ’ (১৩২৪), ‘বাতায়নিকের পত্র’ (১৩২৬), ‘শক্তিপূজা’(১৩২৬), ‘শিক্ষার মিলন’ (১৩২৮), ‘সত্যের আহ্বান’ (১৩২৮), ‘সমস্যা’ (১৩৩০), ‘সমাধান’ (১৩৩০), ‘চরকা’ (১৩৩২), ‘স্বরাজসাধন’ (১৩৩২), ‘শূদ্রধর্ম’ (১৩৩২), ‘রায়তের কথা’ (১৩৩৩), ‘বৃহত্তর ভারত’ (১৩৩৪), ‘হিন্দুমুসলমান’ (১৩২৯), ‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ’ (১৩৩৩), ‘হিন্দুমুসলমান’ (১৩৩৮) ‘রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত’ (১৩৩৬), ‘হিজলী ও চট্টগ্রাম’ (১৩৩৮), ‘প্রচলিত দণ্ডনীতি’ (১৩৪৪), ‘নারী’ (১৩৪৩), ‘কনগ্রেস’ (১৩৪৬), ‘দেশনায়ক’ (১৩৪৫), ‘মহাজাতি-সদন’ (১৩৪৬), ‘নবযুগ’ (১৩৩৯), ‘প্রলয়ের সৃষ্টি’ (১৩৪৪), ‘আরোগ্য’ (১৩৪৭), ও ‘সভ্যতার সংকট’ (১৩৪৮) প্রবন্ধগুলো। এই সংকলনের প্রতিটি প্রবন্ধের রাজনীতিগত বক্তব্য বিষয় ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্বের প্রেক্ষিতে সুষ্ঠু ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে আলোচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত পেশাদারী রাজনীতিবিদ ছিলেন না এবং তাঁর বাচনভঙ্গি ও ভাষাও প্রচলিত রাজনীতির ভাষা হয়নিÑকিন্তু তাঁর রাষ্ট্রনীতি-বিশ্লেষণ প্রায়ক্ষেত্রেই দক্ষ রাষ্ট্রনেতার ন্যায় নির্ভুল ও সত্যনিষ্ঠ হয়েছে। ১৩২১ বঙ্গাব্দ হতে ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম মহাযুদ্ধের সূচনা হতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বকাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ তেইশ বছরের রাজনৈতিক চিন্তাধারার এক সুস্পষ্ট পরিচয় ‘কালান্তরের’ প্রবন্ধগুলোর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি-চিন্তার এক দুর্লভ অভিজ্ঞান হিসেবে সুপরিচিত।
রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘কালান্তর’ এবং এই প্রবন্ধের নামানুসারেই গ্রন্থের নামকরণ হয়েছে। এই প্রবন্ধে মানব ইতিহাসের এক মহালগ্নে বসে কবি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে এক প্রসারিত চেতনার সূত্রে গেঁথে ইতিহাস আলোচনা করে ইংরেজ শাসকদের সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা দিয়েছেন। এখানে কবি ভারতবর্ষে আগত মুসলমান শাসকবর্গ ও ইংরেজ রাজন্যবর্গের ফলাফল নিরূপণ করেছেন। ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে বিবদমান বৃহৎ দুই ধর্ম সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। আলোচিত হয়েছে ব্রিটিশ শাসনের অবসান নিয়ে। এ-প্রবন্ধে লেখক ইউরোপের রিফর্মেশন আন্দোলন, ফরাসী বিপ্লব, আমেরিকার দাসপ্রথা উচ্ছেদ সংগ্রাম, ইটালীর ম্যাটসিনি-গ্যারিবল্ডীর গৌরবময় ঐক্য সাধনের জন্য লড়াই আমাদের কাছে ইউরোপকে মুক্ত ও মহৎ করেছিল। ইউরোপের এই দানই ভারত স্বাধীনতার স্বপ্ন সৃষ্টি করেছিল। এ-প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই ভারতবর্ষের মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। ইংরেজরা দীর্ঘদিন এদেশ শাসন করে এ দেশের মানুষের ওপর শোষণ, নিপীড়ন, অন্যায় অবিচার করে, তাদের সভ্যতার আদর্শকে কলঙ্কিত করেছে। তাই এ-প্রবন্ধে তিনি ভারতবাসীকে ঐক্যে, জ্ঞানবিজ্ঞানে ও সামাজিক সচেতনতার দিকে আহ্বান জানিয়েছেনÑ‘ক্রমে ক্রমে দেখা গেল ইউরোপের বাইরে অনাত্মীয় মণ্ডলে ইউরোপীয় সভ্যতার মশালটি আলো দেখাবার জন্য নয়, আগুন লাগাবার জন্যে।’
‘কালান্তর’ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোর সামগ্রিক বিচারে মানবদরদী রবীন্দ্রনাথের মূর্তিটি প্রতিভাত হয়। এ-গ্রন্থের উপজীব্য বিষয় নির্যাতিত, উৎপীড়িত মানুষ। রবীন্দ্রনাথ মানুষের কবি। কাব্য রচনার প্রত্যুষে ‘তিনি মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার আনন্দ অনুভবের বাসনা জানিয়েছেনÑ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ ‘কালান্তরে’র প্রবন্ধগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার আনন্দ লাগাতে চেয়েছেন। তিনি মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচারের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছেন, তার কারণ অনুসন্ধান করেছেনÑঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ এবং সাম্রাজ্যবাদীর হিংসার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামন্তযুগের বীভৎসতায় দেশের মানুষের কাছে দেশবাসীর লাঞ্ছনা তাঁকে সোচ্চার করেছে। তিনি নির্মমভাবে আক্রমণ করেছেন দেশবাসীর অন্ধ কুসংস্কারকে, শাস্ত্রের প্রতি আনুগত্যের নামে অতীতমুখীনতাকে, অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে অন্যায়কে স্বীকৃতিদানের ধৃষ্টতাকে রক্ষণশীল মনোভাবকে এবং ধর্মের নামে অমানবিকতাকে। ব্যক্তি জাগরণের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় জাগরণ তার পথ অবরুদ্ধ করেছিল জাতীয় চরিত্রের এই বিকৃতি। রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদকে আঘাত করেছেন। গ্রন্থের ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ প্রবন্ধে সে-কারণে উল্লেখ করেছেনÑ‘মানুষের পক্ষে সকলের চেয়ে বড়ো কথাটা এই যে, কর্তৃত্বের অধিকারই মনুষ্যত্বের অধিকার। নানা মন্ত্রে, নানা শ্লোকে, নানা বিধি বিধানে এই কথাটা যে দেশে চাপা পড়িল, বিচারে পাছে এতটুকু ভুল হয় এইজন্য যে দেশে মানুষ আচারে আপনাকে আষ্টে-পিষ্টে বাঁধে, চলিতে গেলে পাছে দূরে গিয়া পড়ে, এইজন্য নিজের পথ নিজেই ভাঙিয়া দেয়, সেই দেশে ধর্মের দোহাই দিয়া মানুষকে নিজের পরে অপরিসীম অশ্রদ্ধা করিতে শেখানো হয় এবং সেই দেশে দাস তৈরী করিবার জন্য সকলের চেয়ে বড়ো কারখানা খোলা হইয়াছে।’ ঋষি কবির জ্ঞানদৃষ্টি, সত্যোপলব্ধি রূপ পেয়েছে প্রবন্ধের মধ্যে।
প্রাবন্ধিক বিশ্বের দরবারে, মানবতার জয়যাত্রায় যোগ দিতে দেশবাসীকে আহ্বান করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতে দেশের মুক্তি, জাতির মুক্তি তখনই ঘটবে যখন দেশের জনগণের মন জেগে উঠবে। তিনি জনগণের শক্তিতে আস্থাশীল। ‘সমাধান’ প্রবন্ধে যে-কারণে রবীন্দ্রনাথ বলেছেনÑ ‘আজকালকার দিনে সেই রাষ্ট্রনীতিকেই শ্রেষ্ঠ বলি যার ভিতর দিয়ে সর্বজনের স্বাধীন শক্তি নিজেকে প্রকাশ করবার উপায় পায়।’ রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমী সভ্যতার প্রতি তাঁর বিশ্বাস হারিয়েছিলেন, কিন্তু মনুষত্বের শক্তির ওপর আস্থা হারাননি। দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে তিনি মানবতার জয় ঘোষণা করেন ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধেÑ ‘কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-এক দিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎমর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি।’বিশিষ্ট লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪-২০০২) বলেছেনÑ ‘এমন অনেক শিল্পীর কথা আমরা জানি যাঁদের হাতের ছোঁয়া লেগে পাষাণ হয়েছে অহল্যার মতো শাপমুক্তা সুন্দরী, কিন্তু যাঁদের নিজেদের জীবনের বেলায় তাঁদের শিল্পিত্ব খাটেনি। সেক্ষেত্রে তাঁরা অবস্থার দাস এবং তাঁদের জীবনের আদর্শও দুর্বল। অথচ শিল্পী নন এমন কোনো কোনো মানুষের জীবন এক-একখানি শিল্পসৃষ্টির মতো সযত্নরচিত সুসঙ্গত, অবান্তরতাবিহীন। রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব এইখানে যে, তিনি তাঁর অপরাপর কাব্যের মতো করে তাঁর জীবনকালকেও ছন্দে মিলে উপমায় ব্যঞ্জনায় কল্পনার প্রসারে ও অনুভূতির গভীরতায় একখানি গীতিকাব্যের ঐক্য দিয়েছেন। সেটি বেশ একটি গোটা জিনিস হয়েছে, ভাঙাভাঙা বা অসম্বন্ধ হয়নি, অন্তর্বিরোধসম্পন্ন বা অসঙ্গতি বহুল হয়নি। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর জীবন। তাঁর অন্যান্য কীর্তি বিস্মৃত হয়ে যাবার পরও তাঁর এই কীর্তিটি জীবিত মানুষের আন্তরিকতম যে-জিজ্ঞাসাÑ‘কেমন ভাবে বাঁচব?’Ñসেই জিজ্ঞাসার একটি সত্য ও নিঃশব্দ উত্তর হয়ে চিরস্মরণীয় হবে।’ রবীন্দ্রনাথ অনুভব করলেন, এ-দেশের সমাজও বদলাচ্ছে, যুগ ধর্মবশত সমাজপদ্ধতি পাল্টাচ্ছে, এ-পরিবর্তন স্বাভাবিক বলেই তিনি বোধ করলেন। তবে ইউরোপের নকলে পরিবর্তন তিনি চান না, ইউরোপের শিক্ষা চান। এ নতুন সমাজপদ্ধতি গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করলেন ১৯১২ সালে, তখন তিনি বিদেশ পরিভ্রমণরত। ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’ (১৩২১) প্রবন্ধে নতুনের পক্ষে, যৌবনের পক্ষে যুক্তি বিস্তার করলেন। প্রচলিত সমাজের নিয়ম রক্ষার বাড়াবাড়িকে আঘাত করে অগ্রসরতার স্বপক্ষে প্রবলভাবে মত দিলেন। সমাজে প্রাণের দরকার, কিন্তু প্রাণের প্রকাশ এদেশে বন্ধ। রবীন্দ্রনাথ যে-কারণে বলেনÑ ‘কিন্তু দেশের নবযৌবনকে তাঁহারা আর নির্বাসিত করিয়া রাখিতে পারিবেন না। তাঁহারা চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া থাকুন, আর বাকী সবাই পথে ঘাটে বাহির হইয়া পড়ুক। সেখানে তারুণ্যের জয় হউক।রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে ইউরোপীয় রাষ্ট্রশক্তির উন্মত্ত বর্বরতা অনাবৃত করেছেন এবং ভারতবর্ষের প্রতিও তার হৃদয়হীন নির্মম আচরণের পরিচয় প্রকাশ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ভারতবাসী বিদেশি শাসনের প্রতি বাহ্যত অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, কিন্তু তা তার সাময়িক উত্তেজনাজাতÑআভ্যন্তরীণ স্থির-সংযত, প্রস্তুতিপূর্ণ সংহত ক্ষমতার কোন প্রতিবাদ বা আন্দোলন নয়। রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন যে স্বদেশের সর্বক্ষেত্রেই অন্ধ-সংস্কার, রক্ষণশীল মনোভাব জাতীয় জীবন ও চরিত্রকে পঙ্গু করে তার অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করেছে। দেশের সমাজ-সংস্কৃতি, সভ্যতা ও শিক্ষাধারার মধ্যে কোনোরূপ বৈচিত্র্য নাইÑএক কৃত্রিম সনাতন সংস্কার-চক্রে আবর্তিত হয়ে দেশের নিগূঢ় প্রাণশক্তির অপমৃত্যু ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘লোকহিত’, ‘ছোটো বড়ো’ প্রভৃতি প্রবন্ধের মাধ্যমে দেশের প্রাণহীন সংস্কারবদ্ধ স্তবির জীবনযাত্রাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন এবং রক্ষণশীলতার নাগপাশমুক্ত এক সহজ সবুজ যৌবনশক্তিকে আবাহন জানিয়েছেন। ‘ছোটো ও বড়ো’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ভারতের রাজনৈতিক আশা-ভরসার কথা আলোচনা করেছেন ইংরেজ চরিত্র বিশ্লেষণ করে। যারা ভারতবর্ষ শাসন করেছেন তারা আসলে বণিকবৃত্তি সম্পন্ন ছোটো ইংরেজ। এই ছোটো ইংরেজরা কোনোদিনই কোনো আদর্শের ধার ধারে না। অথচ এরাই চালায় শাসন কার্য। ইংরেজদের সঙ্গে কখনো এদেশের আন্তরিকতা ঘটেনি। লেখকের মতে ছোটো ইংরেজদের ভয়ে ছোটো হলে চলবে না। দুঃখের শক্তি দিয়ে ভয়কে জয় করতে হবে। কবি আশাবাদীÑ ‘বহু ব্যবধান সত্ত্বেও পূর্ব-পশ্চিমের মিলন অবশ্যম্ভাবী।’ রবীন্দ্রনাথের এই সকল প্রবন্ধে শ্লেষ-বিদ্রুপের অন্তরাণে তাঁর এক গভীর মর্মবেদনার সুরও ধ্বনিত হয়েছে। ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেনÑ ‘দূরের সঙ্গে নিকটের, অনুপস্থিতের সঙ্গে উপস্থিতের সম্বন্ধপথটা সমস্ত দেশের মধ্যে অবাধে বিস্তীর্ণ হইলে তবেই তো দেশের অনুভব-শক্তিটা ব্যাপ্ত হইয়া উঠিবে। মনের চলাচল যতখানি, মানুষ ততখানি বড়ো। মানুষকে শক্তি দিতে হইলে মানুষকে বিস্তৃত করা চাই।’ ‘লোকহিত’ প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের তৎকালীন রাষ্ট্রনৈতিক মনোভাবের প্রতিনিধিত্বের দাবি রাখে। রোমান্টিক কবি পরিবর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তায় কত স্বচ্ছ দৃষ্টি ও যুক্তিবাদী মননের অধিকারী ছিলেন, এই প্রবন্ধটিতে তারই স্বাক্ষর বর্তমান। ক্রমান্বয় যুক্তিচক্র রচনা করে রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের সমাজ ও রাষ্ট্রনেতাগণের লোকহিতৈষণা যে কত মায়াগর্ভ ছিল, তার প্রতি জনসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দরিদ্রকে ভালো না বেসে তার উপকারের মধ্যে যে ধনীর আত্মাভিমানই উগ্রভাবে প্রকাশিত হয়, তাতে যে দীন-দরিদ্র সাধারণ মানবের মানবিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়, সেই প্রতীতি ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এককথায় ‘লোকহিত’ প্রবন্ধটিতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, ইতিবৃত্ত ও শিক্ষানীতির পারস্পরিক তুলনামূলক যুক্তিনির্ভর আলোচনায় লোকহিতের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সুপ্রকাশিত।
সাম্রাজ্যবাদ কবিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল; সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার মূল মর্মকথা হলো আমলারাজতন্ত্রজাত ঘৃণ্য পররাজ্য-লালসা ও বর্বরতম শক্তি অর্জনের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতার স্বরূপ তিনি ‘লড়াইয়ের মূল’ প্রবন্ধে তা উদঘাটন করেছেন। ‘কালান্তর’ গ্রন্থে বিদেশি শাসকদের নিয়ে লিখিত প্রবন্ধ ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’-তেও রয়েছে এর প্রভাব। এ-প্রবন্ধে লেখক শুধু বৃটিশ রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করেননি, তিনি দেশের নানা ত্রুটি বিচ্যুতির কথাও আলোচনা করেছেন। অন্যের অপরাধ ধরার চেয়ে আমাদেরও যে অপরাধ আছে সেগুলোকে নিরন্তর করার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। এ-প্রবন্ধের সূচনায়, কলকাতায় বর্ষা মৌসুমে ট্রামলাইনের প্রয়োজনে রাস্তা খোরাখুরির সমস্যার কথা বলা হয়েছে। চিৎপুর ও চৌরঙ্গীর কর্দমাক্ত রাস্তায় চলতে সবার অসুবিধা হয়, তবুও প্রতিবাদ ওঠে না কারণ; মিউনিসিপ্যালিটি করছে, সবাই মেনে নিচ্ছে। কর্তা ব্যক্তিরা করছেন, মান্যতো করতেই হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন কর্তৃত্ব নিতে হবে আমাদের, তারা বলে তোমরা পারবে না, তোমাদের হাতে কর্তৃত্ব দেয়া যাবে না। রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট কথা বিদেশি শাসকদের সম্পর্কেÑ‘ভুল চুকের সমস্ত আশংকা মানিয়া লইয়াও আমরা আত্মকর্তৃত্ব চাই। আমরা পড়িতে পড়িতে চলিব; দোহাই তোমার আমাদের এই পড়ার দিকেই তাকাইয়া আমাদের চলার দিকে বাঁধা দিও না।’ মূলত নানা উদাহরণ ও উপমা সাজিয়ে রবীন্দ্রনাথ আলোচ্য প্রবন্ধে বিদেশি শাসকদের প্রতি কটাক্ষ করেছেন। বিদেশি শাসকদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনা আর একটি দলিল ‘স্বাধীকার প্রমত্ত’ প্রবন্ধটি। লেখকের চিন্তায় ইংরেজদের উপনিবেশধর্মী আদর্শ, পশিচমী দেশের উগ্রজাতীয়তাবাদী আদর্শের ফলশ্রুতি; ইউরোপীয় সভ্যতার মশালটির কাজ আলো দেখানো নয় শুধু আগুন লাগানো। দেশের সমৃদ্ধি বাড়াতেই তাই প্রয়োজন হয় উপনিবেশ সৃষ্টির এবং নির্বিচারের শাসন। প্রবন্ধের ভাষায়Ñ ‘তাই ভারতের প্রাচীন বাণিজ্য আজ বিধ্বস্ত, চীন বিষে জীর্ণ, পারস্য পদদলিত, তাই কঙ্গোয় য়ূরোপীয় বণিকের দানব লীলা এবং পিকিনে বক্সার যুদ্ধে যূরোপীয়দের বীভৎস নিদারুণতা। ইহার কারণ য়ূরোপীয়রা স্বজাতিকেই সবচেয়ে সত্য বলিয়া মানিতে শিখিয়াছে।’ রবীন্দ্রনাথের ‘বাতায়নিকের পত্র’ একটি বিখ্যাত প্রবন্ধ। এই দীর্ঘ প্রবন্ধটি তাঁর পাঁচটি পত্রের সমষ্টি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ‘সবুজপত্রে’র ১৯১৪) সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীকে (১৮৬৮-১৯৪৬) ক্রমান্বয়ে যে পাঁচটি পত্র লিখেছিলেন, তাই সাহিত্যক্ষেত্রে ‘বাতায়নিকের পত্র’ নামে সুপরিচিত হয়েছে। এই পত্র-প্রবন্ধগুলোকে সমকালীন ভারতবর্ষের তথা সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সমস্যাবলী রবীন্দ্রনাথের মনে যে প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব বিস্তার করেছিল, তারই পরিচয় লাভ করা যায়। রবীন্দ্রনাথ প্রথম বিশ্বযুদ্ধান্তের পটভূমিকায় ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করতে প্রয়াসী হয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রবন্ধটি তারই অধিকতর সুষ্ঠুতম ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ ও মূল্যবান হয়েছে। ইউরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ত্রুটি কোথায়, কি তার পরিণতি, কোথায় তার মীমাংসা বা সমাধান, কোথায় সকল মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তিÑএই সকল বিবিধ প্রশ্নই প্রবন্ধের মুখ্য আলোচ্য বিষয় হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সর্ববিধ সমস্যার এক সামগ্রিক রূপ তাঁর সত্যদ্রষ্টার পূতস্নিগ্ধ বেদীভূমি হতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীর সামরিক ও বাহ্যিক শক্তি সঞ্চয় এবং উপকরণ বা বস্তুগত সম্পদ লাভের জন্য তার অত্যুগ্র লালসা ও প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধাচারণ করেপ্রবন্ধের পাঁচ নম্বর পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেনÑ ‘আমরা নিজেরা সমাজে যে অন্যায়কে আটেঘাটে বিধিবিধানে বেঁধে চিরস্থায়ী করে রেখেছি সেই অন্যায় যখন পলিটিক্সের ক্ষেত্রে অন্যের হাত দিয়ে আমাদের উপর ফিরে আসে, তখন সেটার সম্বন্ধে সর্বতোভাবে আপত্তি করবার জোর আমাদের কোথায়?
‘কালান্তরে’র বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘শিক্ষার মিলন, যেখানে প্রাবন্ধিক বর্তমান বিশ্ববিজ্ঞানের কলাকৌশল অবলম্বন করে সামনে এগিয়ে চলেছে। একথা স্বীকার করতেই হবে, পশ্চিমের দেশগুলো বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে গেছে এবং তারই ফলে তারা সমগ্র বিশ্বে কর্তৃত্ব করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশেও বিদ্যার চর্চা আছে, সে বিদ্যা সেকেলে। আধুনিক যে বিদ্যার জোরে পশ্চিমা দেশগুলো জয়ী হয়েছে সে বিদ্যা একান্তই বৈষয়িক। এই বিদ্যা আমাদের দেশে চালু না হলে আমাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ এ-প্রবন্ধে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ব-পশ্চিমের মিলন নিকেতনরূপে গড়ে তোলার স্বপক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি এ-প্রবন্ধে আরো মনে করেন সত্য লাভের ক্ষেত্রে মিলনের কোনো বাঁধা নেই, শুধু নিজেকে নিয়ে থাকলে চলবে না, অপরকে আপন করে নিতে হবে। তিনি পূর্ব-পশ্চিমের শিক্ষার মিলনে মধ্যেই মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ দেখতে পেয়েছেন। সত্য সাধনার দ্বারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং এই নিয়ন্ত্রণের অধিকার আমরা লাভ করতে পারব যদি আমরা পূর্ব এবং পশ্চিমের বিদ্যাকে সাধনার দ্বারা যুক্ত করতে পারি। প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেনÑ ‘সত্যকে চাই অন্তরে উপলব্ধি করতে এবং সত্যকে চাই বাহিরে প্রকাশ করতেÑ কোন সুবিধার জন্য নয়, সম্মানের জন্য নয়, মানুষের আত্মাকে তার প্রচ্ছন্নতা থেতে মুক্তি দেবার জন্যে। মানুষের সেই প্রকাশ তত্ত্বটি আমাদের শিক্ষার মধ্যে প্রকাশ করতে হবে।’ বহুল আলোচিত প্রবন্ধ ‘স্বরাজসাধনে’ দেখি সুন্দরের সারথী রবীন্দ্রনাথ এ-প্রবন্ধে সমধিক রাজনীতি সচেতন। বাস্তব রাজনীতি বা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তিনি ছিলেন রাজনৈতিক-দার্শনিক স্বাধীনতার উপাসক। পরাধীন ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক শাসনে যেভাবে মার খেয়ে খেয়ে লাঞ্চিত হয়েছিল, মানবচেতনার যে অবমাননা প্রতিদিন তিনি দেখেছিলেন সে অবমাননা থেকে মুক্তিই তাঁর ধর্মসাধনা, রাষ্ট্রচেতনার আকাক্সক্ষা। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে তিনি তাৎক্ষণিক স্বরাজলাভের আশাবাদী ছিলেন না এবং অনিচ্ছুক হাতের দান ভিক্ষারও তিনি পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও বক্তব্য শুধু ঔপনিবেশিকতা, সামাজিক রক্ষণশীলতা ও অনাচারের বিরুদ্ধে সর্বোপরি জাতীয় আন্দোলনের স্বপক্ষে নিজেকে এবং দেশের বিত্তহীন সমাজ বিশেষত কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ও তাদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার প্রভৃতি ক্রিয়াকাণ্ডের পরিকল্পনায় তিনি বলা বাহুল্য নিজস্ব ধ্যান ধারণার শিখায় তাঁর রাজনীতির কক্ষটি আলোকিত করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এ-প্রবন্ধে বলেনÑ ‘আমার নালিশ এই যে, চরকার সঙ্গে স্বরাজকে জড়িত করে স্বরাজ সম্বন্ধে দেশের জনসাধারণের বুদ্ধিকে ঘুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ সুতরাং বোঝা যায় তিনি উগ্র স্বরাজ আন্দোলনের পক্ষপাতী ছিলেন না; মহাত্মা গান্ধিকে রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর থেকে তিনি পৃথকী ভূমিকা পালন করেছেন। মূলত ‘স্বরাজসাধন’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের তথা বাংলাদেশের কৃষকদের জীবনাচরণ, দাবি, আন্দোলন, চরকার সূতা কাটার বিবরণ এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা ঘোষিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন প্রাণবন্ত মানবজীবন কামনা করেছেন। যান্ত্রিকতা বিদেশি সরকার কর্তৃক আরোপিত বলেই যে নিন্দনীয়, তা নয়, দেশের নেতারাও যখন দেশবাসীকে যান্ত্রিকভাবে কাজ করতে আহ্বান করেন, তখনো তিনি তাঁর বিরোধিতা করেন। তিনি মত বৈচিত্র্যকে অবশ্যম্ভাবী বলে দাবি করেছেন, মুক্তবুদ্ধি স্বমতস্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁর ‘সত্যের আহ্বান’, ‘চরকা’ প্রবন্ধে। ‘সত্যের আহ্বানে’ তিনি কামনা করেছেন মৌমাছিতান্ত্রিকতামুক্তি, চিরাভ্যাসের গণ্ডীচ্ছেদন। তিনি দেশকে সৃষ্টি করতে চানÑ ‘দেশে জন্মগ্রহণ করেছি বলেই দেশ আমার, এ হচ্ছে সেইসব প্রাণীর কথা যারা বিশ্বের বাহ্যবাহার সম্বন্ধে পরাসক্ত। কিন্তু যেহেতু মানুষের যথার্থ স্বরূপ হচ্ছে তার আত্মশক্তিসম্পন্ন অন্তরপ্রকৃতিতে এই জন্য যে-দেশকে মানুষ আপনার জ্ঞানে বুদ্ধিতে প্রেমে কর্মে সৃষ্টি করে তোলে সেই দেশই তার স্বদেশ।’ ‘সত্যের আহ্বান’ প্রবন্ধের মতো ‘চরকা’ প্রবন্ধেও মতস্বাতন্ত্র্যের ওপর জোর দিলেন, গান্ধিজির চরকা যে তাঁর মনে দোলা দেয়নি, তার কারণÑ ‘যে-কোন সমাজেই কর্মকাণ্ডকে জ্ঞানকাণ্ডের উপরে বসিয়েছেসেইখানেই মানুষের সকল বিষয়ে পরাভব।’ ‘সমস্যা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, বিদেশী রাজা তিনি পছন্দ করেন না, তবে বিদেশী রাজ্যটি বড় কথা নয়, সমস্যার আসল কথা আমরাই এক নয়, আমাদের নিজের মধ্যে ভেদেও অন্ত নেই। সমাধানে বলেছেন বুদ্ধির জাগরণের কথাÑযা শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব। মোট কথা প্রাণগত অভাবটাই সমস্যা এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেছেনÑ ‘ঐ যে পূর্বেই বলেছি, একদা ইংরেজ-জাতের মধ্যে ভেদেও যে ছিন্নতা ছিল সেটাকে একটা রাষ্ট্রনৈতিক সেলাইয়ের কল দিয়ে তারা পাকা করে জুড়েছে।’
‘কালান্তরে’র ‘রায়তের কথা’য় (১৩৩৩) রবীন্দ্রনাথের ভূমিসংক্রান্ত মনোভাব প্রকাশিত। তিনি প্রমথ চৌধুরীকে প্রশ্ন করেছেনÑ ‘তুমি বলেছ, জমি চাষ করে যে জমি তারই হওয়া উচিত। কেমন করে তা হবে।’ তিনি রায়তদের প্রতি সহানুভূতিশীল, এবং তাদের সম্বন্ধে তাঁর কাছে যে সমস্যা প্রবল তা রায়তদের বিদ্যাবুদ্ধি শক্তি ও ধনহীনতা। তাই তিনি তাদের বুদ্ধি ও অর্থসমৃদ্ধ করার প্রয়োজন বোধ করে বলেনÑ‘আসল কথা যে-মানুষ নিজেকে বাঁচাতে জানে না কোনো আইন তাকে বাঁচাতে পারে না।’ তাঁর ‘বৃহত্তর ভারত’ প্রবন্ধে ভারতের উদারতত্ত্বের কথা বলেছেন। ভারতের বাণী ত্যাগের, দুঃখের, মৈত্রীর, আত্মারÑসৈন্য, অস্ত্র, পীড়নের নয়। রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ভারতের জন্যে তাঁর কাম্য সনাতন সত্য ও গৌরবের। রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে ধর্মকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন। ধর্মই মিলনে বাধা এ-বিশ্বাসে তিনি দৃঢ়। ভারতের মহাজাতি গঠনে ধর্মের বাধাটা তাঁর কাছে দুর্লঙ্ঘ বোধ হলো। তাই ‘বিকৃত’ এ-ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষও প্রচার করলেন। রুশবিপ্লব, ফরাসীবিপ্লব, স্পেনের বিপ্লব, মেক্সিকোর বিদ্রোহের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখালেন, ওই সমস্ত ভূখণ্ডে নবজীবনের আহ্বানে রাষ্ট্রবিপ্লবের সময়ে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। খ্যাতিমান গবেষক হুমায়ুন আজাদ এ-প্রসঙ্গে বলেনÑ ‘তাঁর বিদ্রোহ অবশ্য আদি প্রবর্তকদের মিলনকামী ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। বিকৃত ধর্মের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ, ওই বিকৃতধর্মের স্বরূপ। প্রবন্ধেও এ-চিত্র দেখা যায়Ñ ‘তারপরে সম্প্রদায়ের লোক মহাপুরুষদের বাণীকে সংঘবদ্ধ করে বিকৃত করেছে, সংকীর্ণ করেছে; সেই ধর্ম নিয়ে মানুষকে তারা যেমন ভীষণ মার মেরেছে এমন বিষয় বুদ্ধি দিয়েও নয়;…।’রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রনৈতিক মত কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কবিমনের সামগ্রিক অভিব্যক্তির সঙ্গে তার নিগূঢ় যোগ রয়েছে। কবির আধ্যাত্মিক দৃষ্টি ও তাঁর আদর্শবাদ তাঁর রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাকেও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছে। প্রবন্ধের ভাষায়Ñ ‘যে মানুষ সুদীর্ঘ কাল থেকে চিন্তা করতে করতে লিখেছে তার রচনার ধারাকে ঐতিহাসিকভাবেই দেখা সংগত…বস্তুত সেটাকে অংশে অংশে বিচার করতে গেলে পাওয়া যায় না, সমগ্রভাবে অনুভব করে তবে তাকে পাই। একে অপরের মিলনে কবির প্রবল আনন্দ, সে মিলন দেশে দেশে, ভাষায় ভাষায়; ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে মিলনের সেই বাণী শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কেননা তিনি মনে করেন মিলনই হলো সভ্যতা। তিনি বলেন Ñ‘ইতিহাসে যেখানে মানুষ একত্র হয়েছে অথচ মিলতে পারেনি, পরস্পরকে অবিশ্বাস করেছে, অবজ্ঞা করেছে, পরস্পরের স্বার্থকে মেলায় নিÑ সেখানে মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠতে পারে নি।’রবীন্দ্রনাথ বিদেশি শাসকদের সমাজ-রাষ্ট্রভাবনা, তাদের চিন্তা, সভ্যতা আর ভাষার মিলনকামী ছিলেন চিরদিন। রবীন্দ্রানুরাগী মৈত্রেয়ী দেবী (১৯১৪-১৯৯০) সে-কারণে বলেছেনÑ ‘রবীন্দ্রনাথের স্বদেশচিন্তা তাই কোন গণ্ডীবদ্ধ ভৌগোলিক চিন্তা নয়Ñযেখানেই তিনি দেশের কোনো গঠনমূলক পরিকল্পনা করেছেন, কোনো কর্মোদ্যোগ করেছেন, তার মধ্যে এমন কিছুই নেই যা মানুষে মিলনের পথে বিঘ্ন আনতে পারে। অসহযোগিতার পথ তাঁর নয়Ñসর্বমানবের সহযোগিতাই তাঁর কাম্য। সেই জন্য তাঁর জাতীয়তা সর্বদাই আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে গ্রথিত।’ কিন্তু তাদের প্রতি, তাদের সভ্যতার প্রতি তাঁর অভিযোগও ছিল বিস্তর। বিদেশি শাসকদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার সার্থক প্রতিফলন পাই ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে। সভ্যতা বলতে তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার কথা বলেছেন। যে সভ্যতার ধারক ও বাহকরাই আজ স্বাধীনতা ও মানবতার টুটি চেপে ধরেছে। তারা প্রীতির পরিবর্তে শুরু করেছে গ্রাস করার কারখানা। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কীভাবে নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে খধি ধহফ ড়ৎফবৎমানুষের ওপর চাপায় এবং ভারতবাসীর উন্নতির সমস্ত দ্বার সর্ব্বোতভাবে রুদ্ধ করে তার সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। বিশ্বরাজনীতির পাশাপাশি ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে মধ্যভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নিজের মতো নানাভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি এদেশকে মনে করেছেন সর্বজাতি সমন্বয়ের প্রকৃতক্ষেত্র, বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এখানেই সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন পাশ্চাত্য দেশ থেকে সমৃদ্ধি অর্জন। কিন্তু ইংরেজরা ভারতবর্ষের ওপর যে সাম্রাজ্যবাদী আচরণ করেছেন এবং ভারতবর্ষ ইংরেজদের সভ্য শাসনের পাথর বুকে নিয়ে তলিয়ে পড়ে রইল বিরূপতার নিশ্চলতার মধ্যে। যে-কারণে তিনি দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে লিখেছেনÑ ‘ইংরেজ এই পরজাতীয়ের পৌরুষ দলিত করে দিয়ে তাকে চিরকালের নির্জীব করে রেখেছে।’ ইংরেজরা কেবল ভারতবাসীকে অন্নবস্ত্রের অভাবেই ফেলেনি সে সময়, বরং তাদের মধ্যে আত্মবিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। তাই পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সভ্যতা বলতেই তিনি অস্বীকার করলেন, ইংরেজজাতির ওপর বিশ্বাস হারিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করলেন মানবজাতির বন্ধু ইংরেজ বন্ধুদের ওপর, ইউরোপের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে মানবত্রাণকর্তার আবির্ভাব স্বপ্ন দেখলেন প্রাচ্যের কুটীরে, ত্রাণকর্তা নবমানবের আগমনগীতি গাইলেনÑ ‘ঐ মহামানব আসে, / দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে /…‘জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যূদয়’ / মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।’ তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণ সমাপ্ত হলো শুধূ ভারতের কল্যাণমুক্তিকামনায় নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অবহেলিতদের উত্থানকামনায়।
জীবনসন্ধানী রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত অর্থে রাজনীতি-চর্চার সঙ্গে জড়িয়ে না পড়লেও স্বদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা ও জনগণের বঞ্চনা সম্পর্কে অকপটে, নির্দ্ধিধায় তাঁর বক্তব্য রাখতেন। সেসব বক্তব্যে পেশাদার রাজনীতিবিদরা মাঝে মাঝে ক্ষিপ্ত হতেন এমন দৃষ্টান্তেরও অভাব নেই। রবীন্দ্রনাথও ভারতের মুক্তি চিন্তা করেছেন, ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য আবিষ্কারের এষণা ও সংরক্ষণ, জনগণের আবেগ ও প্রবণতা, ভীরুতা ও শক্তি এসবÑ সবকিছুই তিনি বিবেচনায় এনেছিলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মুক্তিকেই তিনি প্রাধান্য দেন নি। রবীন্দ্রনাথ ‘কালান্তর’ গ্রন্থে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে অতীত ইতিহাসের আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন। সেখানে ইউরোপীয়দের উন্নতি-অগ্রগতি-সভ্যতা এবং একই সঙ্গে বিশেষত ইংরেজদের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা এবং বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর জীবদ্দশায় দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ভারতবর্ষের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, স্বরাজ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম সমস্যা ও সমাধানের পথ প্রভৃতি বিচিত্র বিষয় স্থান পেয়েছে ‘কালান্তর’ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোতে যেমন গভীর মননশীলতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিচয় সুষ্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি তাতে রাষ্ট্রীয় বিবিধ সমস্যানুসারে যুক্তি-বিচারসম্মত সিদ্ধান্ত প্রদত্ত হয়েছে। তাঁর এই শ্রেণির প্রবন্ধের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এই যে, প্রতিপক্ষ মতাদর্শের বিরুদ্ধাচারণ বা সমালোচনা করলেও রবীন্দ্রনাথের রচনা কোথাও সংযম ও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে নাই। যদিও তাঁর বক্তব্য বা আলোচনা বহুল ক্ষেত্রেই ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপে তীব্র বা তীক্ষè হয়ে উঠেছে, কিন্তু তা দ্বারা বিজাতীয় ঘৃণা বা নীচ মনোবৃত্তিসুলভ বিকৃতি বা কুৎসিত ইঙ্গিতের পরিচয় কোথাও প্রকাশ পায়নি। সে-কারণেই গবেষক হায়াৎ মামুদ উল্লেখ করেছেনÑ ‘যেখানে তিনি শিল্পী নন, শুধুই সমাজকর্মী ও দেশচিন্তক এবং মননে ও অনুভবে বিশ্বনাগরিক, সেই স্বল্পচেনা রবীন্দ্রনাথের নিকটেও বাঙালীর বৈদগ্ধঋণ অপরিশোধ্য। কিন্তু সেই প্রসঙ্গটি দৈশিক শিল্পজগতের নয়; তার ক্ষেত্র সভ্যতাবিবর্তনের আলোকে দেশ ও লোক-সাক্ষিক সমাজভাবনা, রাষ্ট্রচিন্তা। এবং সেখানেও যিনি সম্রাট তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে জনৈক দেশপ্রেমী ও বিশ্বমানবিক বাঙালী ভাবুক।’

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!