Wednesday , September 30 2020
Breaking News
You are here: Home / ১৫ আগস্ট সংখ্য‍া ২০২০ / নজরুলকাব্য : বিদ্রোহের চালচিত্র :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল
নজরুলকাব্য : বিদ্রোহের চালচিত্র :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

নজরুলকাব্য : বিদ্রোহের চালচিত্র :: ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন অনন্য প্রতিভাবান কবির সন্ধান মেলে তাঁদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) শীর্ষস্থানীয় একজন। তিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহী এবং সমাজসচেতন কবি। বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিত্য স্মরণীয় এক নাম। ইংরেজ জাতির যেমন শেক্সপিয়র, গ্যেটে যেমন জার্মানির, হাফিজ যেমন ইরানের, বাঙালির জন্য তেমনি নজরুল।তিনি মূলত বিশুদ্ধ কবি। স্বকালবিদ্ধ যুগন্ধর কবি।বিদ্রোহী সত্তার এক মূর্ত প্রতীক। আবার বিদ্রোহী সত্তার চেয়ে তাঁর প্রতিভা ও শ্রমনিষ্ঠতা প্রকট হয়ে জাগ্রত হয়েছে সাম্যবাদী দৃষ্টিকোণে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। নজরুলজীবনীকার অরুণকুমার বসু (জ. ১৯৩৩) বলেছেনÑ ‘বাংলা কাব্যের ভাবালুতাপ্লাবিত কোমল হৃদয়বৃত্তির চর্চার মধ্যে তিনি এনেছেন একটি বীর্যবান পৌরুষ, সৈনিকসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক চেতনা।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) পর স্বতন্ত্র বিষয়ভাবনা ও নির্মাণকালের দৃষ্টিকোণে বাংলা সাহিত্যে তিনি যথার্থ অর্থে প্রথম মৌলিক কবি। রবীন্দ্র-প্রভাব মুক্ত কবিদের মধ্যে নজরুল নিঃসন্দেহে অনন্য। তাঁর জীবনে আছে অভিমানের সুর দ্রোহের অবতারণা, অপসংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিরহের ব্যঞ্জনা এবং বেদনার বৈভবে প্রেম-প্রকৃতির আর প্রেমিক মানবের উন্মাদনা। প্রখ্যাত শিক্ষক, গবেষক আহমদ শরীফ (১৯২১-২০০০) বলেছেনÑ ‘তিনি বাঙালীকে চমকে দিয়েছিলেন, মাতিয়ে তুলেছিলেন ঠিকই। এবং এও সত্য যে রবীন্দ্রনাথ যে দেশে অর্ধজীবন নিন্দা ও তাচ্ছিল্য পেয়েছেন, নজরুল প্রথম দর্শনেই পেয়েছেন বরণ ডালা। এটি তাঁর প্রথম জয়।’ নজরুল চেতনার দীপ্রতায়, বিষয়বস্তুর নতুনত্বে, কাব্যভঙ্গির মৌলিকতায়, ভাষাশৈলী ও শব্দচয়ন কৌশল এবং ছন্দচাতুর্যের রসমাধুর্যের ক্ষেত্রেও স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন।গবেষক ধ্রবকুমার মুখোপাধ্যায় (জ.১৯৪০) বলেছেনÑ ‘নজরুল ইসলামের কবিতায় আছে বক্তব্যের বলিষ্ঠতা, জীবনের তীব্রতা আর অকপটতাÑ এই ত্রয়ীর উৎস হল জীবনের গভীরে প্রোথিত বিশ্বাস।’ তাঁর কাব্য-প্রতিভা তাঁকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বঙ্গকবির সম্মান ও গৌরব দান করেছে। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ইংরেজি, রুশ, তুর্কি, ফরাসি, জাপানি, ফার্সি ভাষায় আলোচনা ও অনূদিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সমসাময়িক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২),সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৮৯১-১৯৫৪),কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), মুজফফর আহমেদ (১৮৮৯-১৯৭৩), আবুল কালাম শামসুদ্দিন (১৮৯৭-১৯৭৮), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আব্দুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী (জ.১৯১৯), আজহারউদ্দিন খান (জ.?) প্রমুখ ব্যক্তিত্বের কাছে তিনি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। কবি নজরুল একাধারে ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, নাট্যকার, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সংগীত স্রষ্টা, পত্রিকা সম্পাদক, সৈনিক, গায়ক ও অভিনেতা। নানামুখী প্রতিভা দিয়ে বাঙালির জীবনধারাকে তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন।
নজরুল প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর যখন বাংলা সাহিত্যের জগতে আত্মপ্রকাশ করেন তখন পরাধীনতার নিপীড়ন সমগ্র ভারতকে জর্জরিত করে তুলেছিল। পরাধীন ভারতের যুগজীবনের পটভূমিকায় বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল। উপমহাদেশের পরাধীনতার বেদনার বিরুদ্ধে কবির অগ্নিবর্ষী লেখনী মানবমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। কেবলমাত্র দেশের পরাধীনতার বেদনাই তাঁকে বিদ্রোহী করে তোলেনি, মানুষের সর্বপ্রকার লাঞ্ছনা অবমাননা, উৎপীড়ন, অবিচার ও বঞ্চনা প্রভৃতিও তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। এছাড়াও অসাম্য মানুষের ধর্মজীবনের ও সমাজীবনের গ্লানি প্রভৃতিও তাঁকে বিদ্রোহী হতে সহায়তা করেছিল। নজরুলের কাব্য-প্রতিভা বিস্ময়কর। বিচিত্র বিষয়ের উপস্থিতিতে তাঁর কাব্যসমূহের কবিতাগুলো নির্মিত হয়েছিল। বিশেষত উদ্দীপনামূলক কবিতাÑ বিদ্রোহ, বিপ্লব, সাম্যবাদ, ইসলাম, যৌবন, চারিত্র এবং প্রেমের কবিতা আর প্রকৃতি বিষয়ক কবিতার প্রসঙ্গ উজ্জ্বলতর। নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ খ্যাতি অর্জন, সেটা যেমন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার জন্য তেমনি পরাধীনতা, সামাজিক রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, দারিদ্র্যও অসাম্যের বিরুদ্ধে আপোষহীন লেখনী পরিচালনার জন্যেও। তিনি কেবল লেখনী পরিচালনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, সক্রিয়ভাবে প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী ও সংগ্রামশীল রাজনীতি সংগঠন এবং সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন। গবেষক অনীক মাহমুদ এ-কারণে উল্লেখ করেছেনÑ ‘কাজী নজরুল ইসলামের নানাকাব্যে স্বাধীনতার জন্য দুর্মর সংগ্রামী চেতনা এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে ভারতবর্ষের মুক্তির মন্ত্রণা প্রকটিত হয়েছে।’ নজরুলের উদ্দীপনামূলক কবিতায় বিদ্রোহী ও বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২) বহুল আলোচিত গ্রন্থ। এ-কাব্যের প্রতিটি কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে উদ্দীপনা ও বিদ্রোহের সুর। কাব্যের ‘ধূমকেতু’ কবিতায় সে সুর অনুরণিত :
আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু
একথা অনস্বীকার্য যে, কবি নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার মৌল প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত সেই কবিতার উদ্ধৃতি স্মরণযোগ্য :

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবেনা।
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত।

এ ছাড়া ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের অপরাপর কবিতাগুলোর মধ্যে ও বিদ্রোহী সত্তার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে। কবির বিদ্রোহ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, তীব্র ভালোবাসা ও গড়ার জন্যেও প্রবল বিদ্রোহÑ তার প্রভাব আমরা অবলোকন করি ‘অগ্নিবীণা’র প্রলয়োল্লাস, ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ ও ‘কোরবানী’ কবিতার মধ্যেও। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার চরণে দেখি :
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়।
এ-কবিতায় তিনি এক যুগান্তকারী বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন নতুনের জেগে উঠার মধ্য দিয়ে, মানুষের জেগে উঠার ভিতর দিয়ে। ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতাও আছে এই বৈপ্লবিক সুর :
দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব-নাশিনী চণ্ডী-রূপ;
দেখাও মা ঐ কল্যাণকরই
আনিতে পারেকি বিনাশ-স্তুপ!

নজরুলের উদ্দীপনামূলক কবিতায় নজরুলের বিপ্লবী চেতনা প্রসঙ্গে ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩), ‘বিষের বাঁশী (১৯২৪), ‘ভাঙার গান’ (১৯২৪),‘সাম্যবাদী’ (১৯২৫), ‘সর্বহারা’ (১৯২৬),‘ফণি-মনসা’ (১৯২৭), জিঞ্জির (১৯২৮), ‘সন্ধ্যা’ (১৯২৯) ‘প্রলয়শিখা’ (১৯৩০)ও ‘নতুন চাঁদ’ (১৯৪৫)উল্লেখযোগ্য কাব্যভাবনা। নজরুলজীবনের সমগ্রটাই বিদ্রোহে ভরা। কবির অগ্রন্থিত বিখ্যাত কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’Ñ যা রচনার অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে এক বছর তিন সপ্তাহ তিনি কারাবাস করেছিলেন। এ-কবিতায় তিনি বলেছেন :

আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল ?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, Ñ আসবি কখন সর্বনাশী ?
দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তর,
রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে ?

এ-সময় নজরুল তাঁর বিখ্যাত অনুপ্রেরণামূলক কবিতা ‘দোলন চাঁপা’র ‘আজ সৃষ্টির সুখের উল্লাসে’ও রচনা করেন। ‘অগ্নিবীণা’র পর নজরুলের ‘দোলন চাঁপা’ নামক দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। অগ্নিবীণাধারী বিদ্রোহী কবির মর্মলোকে যে প্রেমের পিপাসা অতৃপ্ত অবস্থায় কেঁদে ফিরছিল, তাই এই গ্রন্থে অসামান্য কাব্যপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিদ্রোহী কবির উদ্দীপ্ত আবেগ এখানে একটি নির্দিষ্ট পথের পথিক হলেও তা এমনই উদ্দাম ও দুর্বার যে মাঝে মাঝে তার দিগ্ভ্রান্তি ঘটেছে। ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবি আত্মহারা। বিখ্যাত নজরুল গবেষক রফিকুল ইসলাম এ- প্রসঙ্গে বলেনÑ ‘কবিতাটি ‘কল্লোল’ পত্রিকায় ১৯২৩ খ্রীস্টাব্দের মে সংখ্যায় এবং ‘দোলন-চাঁপা’ কাব্যের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণের মুখবন্ধরূপে সংকলিত হয়েছিল।’ কবিতার উদ্ধৃতি দেয়া যায়:

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।…
নজরুল এ কবিতায় বাঁধনহারা আবেগ ও উচ্ছাসকে শব্দ ও ছন্দোবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন। কবি তাঁর চিত্তের জাগরণকে প্রকৃতি, পুরাণ ও অতি-প্রাকৃতিক চিত্রকল্পে উদ্ভাসিত করেছেন।

‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের মতো ‘বিষের বাঁশী’ গ্রন্থের নামও সংগীত যন্ত্র থেকে নেওয়া, সুরের পরিবর্তে বীণা থেকে অগ্নি এবং বাঁশী থেকে বিষের সৃষ্টি বলেই অভিনব। ‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের পরিকল্পনায় নির্বাচিত কবিতা ও গান নিয়ে ‘বিষের বাঁশী সংকলিত। নজরুল মনে করেন, ‘বিষের বাঁশী’র যে বিষ তা জুগিয়েছেন নিপীড়িতা দেশমাতা আর আমার ওপর বিধাতার সকল রকম আঘাতেরঅত্যাচার। এ-কাব্যের ‘মুক্ত পিঞ্জর’ কবিতায় কবির কারামুক্তির পর যে আবেগানুভূতি, তা ধরা পড়েছে :

হেরিণু অনন্তলোক দাঁড়াল প্রণতি করি মুক্ত-বন্ধ আমার চরণে।
থেমে গেল ক্ষণেকের তরে বিশ্ব প্রণব ওঙ্কার,
শুনিল কোথায় বাজে ছিন্ন সে শৃঙ্খলে কার আহত ঝঙ্কার।

নজরুল জীবনে পত্রিকা সম্পাদনা ও সেখানে লেখা প্রকাশের ভিতরে আমরা তাঁকে নানাভাবে অবলোকন করতে পারি। নজরুলজীবনীকার গোলাম মুরশিদ এ প্রসঙ্গে জানানÑ ‘সাংবাদিকতা এবং রাজনীতিতে তাঁর প্রথম পাঠ মুজফ্ফর আহ্মদের সাহচর্য এবং ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ করার মাধ্যমে। তা ছাড়া, এই পত্রিকায় কাজ করার সময়ে তাঁর পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তার পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছিল।’ ‘নবযুগ’ (১৯২০) পত্রিকার পর্বে নজরুলের বিদ্রোহী ভূমিকার, ‘ধূমকেতু’ (১৯২২) পর্বে বিপ্লবী ভূমিকার এবং পরে ‘লাঙ্গল’ (১৯২৫) পর্বে নজরুলের সাম্যবাদীর ভূমিকায় অর্থাৎ মানুষের মৌলিক সমস্যা সমাধানের সংগ্রামী পরিচয় পাওয়া যায়। সাহিত্য ইতিহাস প্রণেতা সুকুমার সেন (১৯০১-১৯৯২) সে-কারণে বলেনÑ ‘দম্কা-হাওয়ার কবি শুধু অগ্নিবীণা বাজাইয়াই ক্ষান্ত রহিলেন না। তিনি ‘ধূমকেতু’ও ছাড়িলেন। কবিতার ঝঙ্কার যাহাদের কানে কোনদিন পশিবে না তাহারাও ‘ধূমকেতু’র ঝাপটা হইতে রেহাই পাইবে না। ‘ধূমকেতু’ পাক্ষিক পত্রিকা (১৯২২)।’ যার মটো ছিল রবীন্দ্রনাথের এই কয় চরণ :

আয় চলে আয়রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু ;
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন।

এই ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য কবি রাজদ্বারে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ‘নবযুগ’ বা ‘অগ্নিবীণা’ বা ‘বিদ্রোহী’ পর্বে নজরুল পৃথিবীর মৌলিক সমস্যার জন্যে স্রষ্টাকে দায়ী করেছেন, তখন তাঁর বিদ্রোহ ছিল তত্ত্বগত বা রোমান্টিক। ‘ধূমকেতু’ ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ পর্বে তাঁর বিদ্রোহ তত্ত্বগত নয় তখন তা বস্তুগত; তাই তিনি তখন বিপ্লবী, রাজবন্দী, অনশনব্রতী। কিন্তু ১৯২৫ খ্রীস্টাব্দের পর থেকে তিনি আর কেবল স্বদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করেননি, এদেশে বিশের দশকে অসহযোগ, খেলাফত ও স্বরাজ এবং সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার মধ্যে। দেশ ও দেশের রাজনীতি যখন সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় মত্ত নজরুল তখন রুশ দেশে সংগঠিত বলশেভিক বিপ্লবের প্রভাবে ‘শ্রমিক প্রজা স্বরাজ পার্টি’র সঙ্গে যুক্ত এ পর্বে তাঁর মুখপাত্র ‘লাঙ্গল’। বাংলাদেশে শ্রেণিচেতনায় অনুপ্রাণিত অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামের উদ্দেশে প্রকাশ্য সংগঠন ও মুখপত্র প্রকাশ এই প্রথম। নজরুল তাঁর কবিতায় বারবার তরুণদের কথা বলেছেন। তাঁর অনেক কাব্যে ও কবিতায় তরুণদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে বিপ্লবী হবার জন্যে এবং বিপ্লব গড়ে তুলবার জন্য অন্যায়-অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে। ‘ভাঙার গান’ কাব্যের ‘ভাঙার গান’ কবিতায় দেশের বন্ধন মোচনের জন্য তরুণদের প্রতি বিদ্রোহী কবির বিপ্লবাত্মক বাণীর প্রকাশ ঘটেছে। একই সঙ্গে এ কবিতায় কবির দেশাত্মবোধ ও বিদ্রোহীভাব প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার উদ্ধৃতিতে সে চিত্র প্রতিফলিত :

লাথি মার ভাঙ রে তালা
যত সব বন্দীশালায়
আগুন জ্বালা
আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি।

‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থ সুর ও স্বরের দিক দিয়ে ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশী’র সমগোত্রীয়। বইটি স্বাধীনতা-সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা মেদিনীপুরবাসীদের উদ্দেশে নিবেদিত হয়েছিল। এ কাব্যের প্রথম সংস্করণ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এ-কাব্যের মধ্যে নজরুলের বিদ্রোহী রূপই অধিকতর পরিস্ফুট।

সাম্যবাদী চেতনায় নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ এবং ‘সর্বহারা’ কাব্যদুটো উল্লেখযোগ্য। গবেষক অনীক মাহমুদ যে-কারণে বলেনÑ ‘সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-বঞ্চনার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষরা আর্থ-সামাজিক দিক থেকে কিভাবে শোষিত হয়েছে, নজরুলের কবিতায় তার সঠিক চিত্র উদ্ভাসিত। সাম্রাজ্যবাদের দোসর ধনিক-বণিকশ্রেণি শ্রমজীবীদের আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবৃত্তে নানা বাধাবন্ধন আরোপ করে শোষণ করতে থাকে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মত মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয় শ্রমজীবীরা। পক্ষান্তরে শ্রমশোষণের মধ্যদিয়ে বৃদ্ধি পায় ধনীর ঐশ্বর্য। নজরুল গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে গণমানুষের শোষণ-বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে সমাজ-বিপ্লবের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে তাঁর দুটো কাব্য সরাসরি উল্লেখযোগ্যÑ এগুলো হচ্ছে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’।’‘সাম্যবাদী’ কাব্যে ‘কুলি মজুর’ কবিতায় শ্রমিকশ্রেণির বা মেহনতী মানুষের বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হয়েছে।

আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু-পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

অথবা এ-কাব্যের ‘নারী’ কবিতায় নারী জাতির প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে সাম্যবাদী চেতনায়:
সাম্যের গান গাই Ñ
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
‘সর্বহারা’ কাব্যের ‘ফরিয়াদ’ কবিতায় তিনি পৃথিবীতে সকলের সমান অধিকারের কথা বলেছেন। মানুষকে উৎপীড়িত হতে দেখে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন এবং মানুষের লাঞ্ছনায় বেদনাকাতর কবি ভগবানের নিকট নালিশ জানিয়েছেন :
এই ধরণির ধূলি-মাখা তব অসহায় সন্তান
মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও আদি-পিতা ভগবান!

আর ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় স্বীয় কাব্যসৃষ্টির স্বপক্ষে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কবি স্পষ্টতই বলেছেন যে, মানুষকে লাঞ্ছিত ও উৎপীড়িত হতে দেখে তিনি বিদ্রোহী হিসেবে আত্ম-প্রকাশ করেছেন। এ এক অসাধারণ রচনা। তাতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, তিনি বর্তমানের কবি নন, চিরকালের কবি সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। কিিবর মূল ভাবনা হচ্ছে মানবমুক্তির আরাধনাÑ সে মুক্তি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। কালের ইতিহাসে কবির নাম রবে কি রবে কিনা, তাঁর নাম লেখা রবে কিনা, সেটা নিয়ে তিনি মোটেও বিচলিত নন। কবিতার ভাষায় :
বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড়ো বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড়ো কথা বড়ো ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু বড়ো দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিয়ো, বন্ধু যাহারা আছ সুখে!
এভাবে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কাব্য দুটোতে নজরুল মানুষের মৌলিক চাহিদা, মানবিকতা, সমানাধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক মানদণ্ডে নির্ধারিত গণমানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনেও নির্গলিতÑশোষণÑবঞ্চনার প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন। এসব কাব্যে কার্যত তিনি সর্বহারাদের বঞ্চনা ও জাগরণের গান গাইতে গিয়ে বস্তুতপক্ষে শ্রেণিসংগ্রামের দিন গুনেছেন।

‘ফণি-মনসা’ কাব্যগ্রন্থ নজরুলের বিদ্রোহীরূপ এক বিশেষ মূর্তিতে প্রকটিত। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় কবির বিদ্রোহীসত্তা নানা বিষয়বস্তুর মধ্যে আপনাকে প্রকাশ করতে চেয়েছে।প্রথম দিকে কবি গান্ধীজীর (১৮৬৯-১৯৪৮) অসহযোগ আন্দোলনকে (১৯২০-১৯২২) সমর্থন করেছিলেন। আন্দোলনেরঅন্যতম কর্মসূচী চরকার সুতো কেটে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা লাভের চেষ্টাতেও তাঁর আন্তরিক আস্থা ছিল। একাধিক কবিতায় গান্ধীজীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ব্যক্ত হয়েছে। বাঙলায় গান্ধীজীর আগমনে তিনি নতুন জীবন ও জাগরণের সাড়া অনুভব করেছেন ‘বাঙলায়-মহাত্মা’ নামক গানে :

আজ না-চাওয়া পথ দিয়ে কে এলে
ওই কংস-কারার দ্বার ঠেলে।
আজ শব-শ্মশানে শিব নাচে ওই ফুল-ফোটানো পা ফেলে ॥

পরবর্তীকালে অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতায় চরকায় সুতো কাটা ইত্যাদি অহিংস কর্মপদ্ধতির ওপর বিশ্বাস হারিয়ে কবি বিপ্লববাদের দিকে অধিকতর ঝুঁকে পড়েন। তাই ফাল্গুনীকে তিনি আহ্বান করেছেন জাতিকে সশস্ত্র বিপ্লবের দীক্ষা দিতে। অহিংস আন্দোলনের শান্তিবাণীকে তিনি তীব্র শ্লেষের সঙ্গে আক্রমণ করেছেন তাঁর ‘সব্যসাচী’ কবিতায় :

সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, বসে বসে কাল গুনি !
জাগো রে জোয়ান ! বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি !

কাব্যের ‘শ্রমিক মজুর’ কবিতায় শ্রমিক মজুরের মাধ্যমে বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। পার্সি বিশি শেলীর (১৭৯২-১৮২২) কবিতার ভাব অবলম্বনে লেখা ‘জাগর-তূর্য’ কবিতায় শ্রমিকদিগকে সম্বোধন করে তিনি যা লিখেছেন তাতে তাঁর বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে :

ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী !
অলিখিত যত গল্প-কাহিনি তোরা যে নায়ক তারই ॥

‘ফণি-মনসা’র কবিতা সম্পর্কে কেউ কেউ বলেছেন, ‘এগুলো কবিতা নয়। নিছক সাময়িক এবং ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার নিয়েই এগুলো লেখা, এ ছাড়া শিল্প সাধনার দিক থেকে মহত্তর কোনো উদ্দেশ্যই কবির নেই।’ এ প্রসঙ্গে ধ্রবকুমার মুখোপাধ্যায় বলেনÑ ‘কিন্তু তবুও একথা মানতে হবে যে, নজরুল ইসলামের সাময়িকতা অর্থহীন নয়। কেননা, সমাজ এখনও খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। সমাজে তখনও ভেদবুদ্ধি, বৈষম্য, অসাম্য, অবহেলা নৈমিত্তিক সত্য, ফলে সাধারণের কাছে সাময়িকতার জন্যই তাঁর কবিতা এখনও গ্রহণীয় এবং স্বীকৃত সত্য।’

কবির ‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি কবিতা কবিত্বে উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট। নজরুলের ইসলামী ঐতিহ্য বিষয়ক কবিতাবলীতে আধ্যাত্মিক চেতনার চেয়ে মুসলিম জগতের ইতিহাস ও রাজনৈতিক চেতনা অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। সেক্ষেত্রে উদ্দীপনামূলক কবিতার চতুর্থ বা ‘জিঞ্জীর পর্যায়ে এই প্রয়াস সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ‘জিঞ্জীর’ কাব্যে সংকলিত ঐ কবিতার মতো ‘খালেদ’, ‘চিরঞ্জীব’, ‘জগলুল’, ‘আমানুল্লাহ’ ও ‘উমর ফারুক’ প্রভৃতি কবিতায় ইসলামের বা মধ্যপ্রাচ্যের দূর বা নিকট অতীতের রাষ্ট্র বা সেনা-নায়কদের শৌর্যবীর্যময় ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে বর্তমানকে অনুপ্রাণিত করে তোলার অখণ্ড প্রয়াসই লক্ষণীয়। ‘জিঞ্জীর’ ইসলামী ঐতিহ্য বিষয়ক নজরুলের শুধু নয় বাংলা সাহিত্যেরও শ্রেষ্ঠ কাব্য। কাব্যের ‘খালেদ’ কবিতায় আরবের অপরাজেয় মহাবীর খালেদের অপূর্ব শৌর্যময় জীবন বর্ণিত হয়েছে।খালেদ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করার আগে হজরত মোহম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ৬২৯ খ্রীস্টাব্দে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি স্বল্পসংখ্যক মুসলিম সৈন্য নিয়ে রোম সম্রাটের বিশাল সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করায় বীর হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। শোনা যায় যে, শেষে তাঁর উগ্র স্বভাবের দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক তাঁকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারিত করেন। খালেদ উমরের ফরমান পেয়ে সেনাপতির সমস্ত অলংকার খুলে ফেলে বলে উঠেছেন, ‘সত্যের তরে হইব শহীদ, এই জীবনের সাধ।’ এক সময় খালেদ মক্কায় ফিরে এলে উমর তাঁর বুকে লুটিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘আজ হতে তুমি সিপাহ-শালার ইসলাম-জগতের।’ গবেষক মাহবুবা সিদ্দীকি এ-প্রসঙ্গে বলেনÑ ‘‘জিঞ্জীর’ কাব্যগ্রন্থের ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ ও ‘আমানুল্লাহ’ কবিতা দুটিতে নজরুল সমকালীন বিশ্বে মুসলিম জাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে স্বদেশ ও স্বজাতির অধঃপতিত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন আর ‘খালেদ’ ও ‘উমর ফারুক’ কবিতায় ইসলামের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের আলোকে বর্তমানের অবক্ষয়কে নিরীক্ষণ করেছেন।’

নজরুলের ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থ সমর্পিত হয় মাদারিপুরের ‘শান্তি সেনা’র করশতদলে ও বীর সেনানায়কদের শ্রীচরণাম্বুজে। এই কাব্যগ্রন্থটিতেও কবির বিদ্রোহী ও সমাজসচেতন সুরেরই অনুবৃত্তি ঘটেছে। যৌবন বন্দনা, যৌবনের জয়গান নজরুল মানসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর কবিজীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন কবিতায় যৌবনের জয় ঘোষিত হয়েছেÑ যৌবনের পরিচর্যা বিশেষ গৌরব ও মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কাব্যের প্রথম এবং নাম কবিতা ‘সন্ধ্যা’য় দীর্ঘ পরাধীনতার আঁধার সন্ধ্যার রূপকে প্রকাশিত হয়েছে :

সন্ধ্যা কি কাটিবে না?
কত সে জনম ধরিয়া শুধিব এক জনমের দেনা?
কোটি কর ভরি’ কোটি রাঙা হৃদি-জবা লয়ে করি পূজা,
না দিস আশিস্, চণ্ডীর বেশে নেমে আয় দশভুজা!
মোদের পাপের নাহি যদি ক্ষয়, যদি না প্রভাত হয়,
প্রলয়ঙ্করী বেশে আসি কর ভীরুর ভারত লয়!
কবিতায় দেখা যায় ভারতের পরাধীনতার বেদনায় কবি মর্মাহত। তাই তিনি দশভুজাকে আহ্বান করেছেন প্রলয়ঙ্করী বেশে আবির্ভূতা হতে। পরাধীনতার চাইতে মৃত্যুই শ্রেয়। সন্ধ্যা ভারতের স্বাধীনতা-সূর্যহীন সময়ের প্রতীক। ভারতের এতো সন্তান আত্মবলিদান দিয়েছে, তবু কি স্বাধীনতার সূর্য পুনরুদিত হবে না, এ প্রশ্ন রেখেছেন কবি তার কবিতায়। কাব্যের ‘জীবন-বন্দনা’ কবিতায় আবার দেখিএমনই সুর:

গাহি তাহাদের গান
ধরণীর হাতে দিল যারা আনি’ ফসলের ফরমান।
শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দ্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণী নজ্রানা দেয় ডালি ভ’রে ফুলে ফলে।

নজরুল যৌবনের কবি বলে তার অমিত শক্তি ও সর্ববাধামুক্ত গতিতে বিশ্বাসী। তাঁর মতে যৌবনের দুর্বার জয়যাত্রাকে রোধ করার সাধ্য পৃথিবীর কোনো শক্তিরই নেই। কবির ‘প্রলয়-শিখা’র প্রথম সংস্করণ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ লাভ করে ১৯৪৯ খ্রীস্টাব্দে। নজরুল গবেষক সুশীলকুমার গুপ্ত উল্লেখ করেছেনÑ ‘প্রকাশকের নিবেদন থেকে আরো জানা যায় যে ‘প্রলয় শিখা’র মধ্যে বিপ্লবাত্মক অগ্নিগর্ভ কবিতাবলী থাকার জন্যে নজরুল নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে এই গ্রন্থ প্রকাশ করেন অর্থাৎ তিনি নিজেই এর প্রকাশক ও মুদ্রাকর হন। বইটি প্রকাশিত হলেই তদানীন্তন সরকার এইট বাজেয়াপ্ত করেন। শুধু এই নয়। নজরুল এই গ্রন্থ প্রকাশ করার জন্যে রাজদ্রোহের অপরাধে প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এরপর তিনি হাইকোর্টে আপীল করায় জামিন-মুচলেকায় মুক্ত থাকেন। গান্ধী আরউইন চুক্তির পর সরকার পক্ষ আপত্তি না করায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।’ ‘প্রলয় শিখা’ গ্রন্থে প্রলয়, যৌবন, রুদ্র, নারী প্রভৃতি বিষয়ে বিংশ শতাব্দীর ভাবচিন্তার প্রকাশ ছাড়াও সমকালীন দেশ-কাল বিশেষত স্বদেশের সমকালীন রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম ছায়াপাত করেছে। ‘প্রলয় শিখা’র শেষ কবিতা ‘রক্ত-তিলক’ শত্রুর রক্তে রক্তে তিলক পরার জন্যে দিকে দিকে সর্বহারার অভিযান, ঘরের বাঁধন ছিন্ন কওে দলে দলে সন্তানদের বেরিয়ে পড়ার দৃশ্য কল্পিত হয়েছে বিহগী মাতার পক্ষপুটের আড়াল ছিঁড়ে আলোকপিয়াসী শাবকের শূন্যে পক্ষবিস্তারের চিত্রকল্পে। কবিতার ভাষায় :
শত্রু-রক্তে রক্ত-তিলক পরিবে কা’রা?
ভিড় লাগিয়াছেÑছুটে দিকে দিকে সর্বহারা।
কবিতায় শত্রুসংহার করে পরাধীনতার রাত্রি শেষে নতুন মুক্তির প্রভাত আনবার জন্যে গণজাগরণের কথা ব্যক্ত হয়েছে।

কবির ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যে বাংলার জরাগ্রস্ত জীবনে নতুন আনন্দ ও আশার বাণী ধ্বনিত হয়েছে। গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নতুন চাঁদে’র মধ্যে গ্রন্থের মূল সুর ঝঙ্কৃত। কবি এ কবিতায় নতুন যুগকে চাঁদকে স্বাগত জানিয়েছেন :
রবে না লোভ, রবে না ক্ষোভ অহঙ্কার
প্রলয়-পয়োধি এক নায়ে হইব পার।
তেমনি কাব্যের ‘দুর্বার যৌবন’ ও ‘ওঠরে চাষী’কবিতায়ও তাঁর বিদ্রোহী-আত্মার মনোভাব লক্ষণীয়। ‘দুর্বার যৌবন’ কবিতায় আছে যৌবনের দীপ্ত জয়গান আর ‘ওঠরে চাষী’ কবিতায় চাষীর বঞ্চিত জীবনের বেদনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে যাদের দ্বারা চাষী বঞ্চিত হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহী সুর। কবির ভাষায় :
জাগে নাকি শুকনো হাড়ে বজ্র-জ্বালা তোর?
চোখ বুজে তুই দেখবি রে, করবে চুরি চোর?
এ কবিতায় তিনি চাষীদের জাগরণের গান গেয়েছেন। চাষীদের অবস্থা বর্ণনায় তাঁর কবিদৃষ্টির গভীরতা ও তীক্ষèতা পাঠককে মুগ্ধ করে। তিনি চাষীদের আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হতে বলেছেন।

নজরুল কবি। চিরবিদ্রোহী কবি। চিরবিদ্রোহী আত্মা। অন্যায়-অত্যাচার-মিথ্যা-ভণ্ডামি-কলুষতার বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় শক্তির পাশবিকতার বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী, চিরবিদ্রোহী অনন্য সত্তা। তারুণ্যের উচ্ছল সৌন্দর্যে, যৌবনের উদ্বেল উচ্ছ্বাসে, দেশমাতৃকার বন্দনায় কিংবা প্রেমভক্তির অনুরাগে নজরুল বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী সমাজ-অঙ্গনে এক নতুন স্বপ্নের দিশারি, এক নতুন যৌবন-তরঙ্গ, এক বিরল পতাকাবাহী চিরবিদ্রোহী, চির প্রেমিক, বিরহী মানবাত্মার বাণী ও মুরতি। নজরুল গবেষক সুশীলকুমার গুপ্ততাঁর মূল্যায়নে বলেছেনÑ ‘বাংলা সাহিত্যে কবি হিসাবে নজরুল একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন; রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের চরম উৎকর্ষের সময়ে যখন অধিকাংশ কবি তাঁর সর্বব্যাপী প্রতিভার কাছে দ্বিধাহীন চিত্তে আত্মসমর্পণ করে কাব্য-সরস্বতীর আরাধনা করছিলেন, সেই সময় নজরুল তাঁর অগ্নিবীণা হাতে নিয়ে বিদ্রোহীবেশে বাঙলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে আবির্ভূত হলেন।’ নজরুল-সাহিত্য ও জীবন একদিকে শাসক-শোষক-ধর্মীয় ভণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন কশাঘাত, অন্যদিকে চিরবিরহী মানবমনের চিরন্তন প্রেম, বিরহ-বেদনার আকুল আর্তি, ভক্ত-সাধক হৃদয়ের ভক্তিপ্লাবী সুরমূর্ছনা, উৎপীড়নের ক্রন্দনরোলে তাঁর হৃদয়মথিত মানবাত্মার বাণী, সাম্য ও মানবতাবোধের নিরন্তন শুভবোধের আত্ম-নিংড়ানো আকাক্সক্ষার উন্মেষÑ তাঁর কবিতা গানে এক প্রাণময় উচ্ছ্বাসে বাংলা তথা বাঙালিকে, গোটা দেশকে টলিয়ে দিয়েছে, টলিয়ে দিয়েছে বিদেশি শাসকদের লৌহদৃঢ় সিংহাসনও। সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহীইতিহাসের বরপুত্র, যুগপ্রবর্তক, নজরুল যুগের চাহিদা পূরণে সর্বাগ্রে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভা জাতি সত্তার মৌলিক চাহিদার প্রশ্নে জাগ্রত। চেতনায় অগ্নিবীণা জ্বালিয়ে নিজ সত্তার চাহিদা ও অবস্থানকে ভুলুণ্ঠিত করে তিনি জাতির সংকট নিরসনের চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে যতো গবেষণা হয়েছে, ততই বেরিয়ে এসেছে নতুন নতুন ক্ষেত্র ও দর্শন। ফলে তাঁর দর্শন, অধ্যাত্ম বা বোধিসত্তার বহুমাত্রিক রূপটিও এখন অনেক পরিষ্কার। বিখ্যাত কবি, লেখক বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) নজরুল সম্পর্কে বলেছেনÑ ‘বাংলা কাব্যের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের পরে সবচেয়ে বড়ো কবিত্ব-শক্তি নজরুল ইসলামের। তিনি যখন সাহিত্যক্ষেত্রে এলেন তখন সত্যেন্দ্র দত্ত তাঁর খ্যাতির চূড়ায় অধিষ্ঠিত, সে-সময়ে তাঁর প্রভাব বোধহয় রবীন্দ্রনাথের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।’ নজরুল-কাব্যে ভাষা লক্ষণীয় পরিমাণে বেগবান, শাণিত, সংগ্রামমুখর ও বলিষ্ঠ। বাংলা ভাষায় তিনি যে বিশেষ বলিষ্ঠতা সঞ্চার করেছেন তা তাঁর কবিমানসের শক্তিশালী ও সংগ্রামশীল রূপেরই পরিচায়ক। তাঁর পূর্বে ভাষায় ঠিক এ-ধরনের সংগ্রামশীল মূর্তির পরিচয় দেখা যায় না। শব্দপ্রয়োগের বিষয়ে নজরুল দেশিবিদেশি, তৎসমতদ্ভব প্রভৃতি সমস্ত শব্দের ক্ষেত্রেই অবাধ স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন। লেখক বাঁধন সেনগুপ্ত এ-প্রসঙ্গে বলেছেনÑ ‘কাব্যকৃতিতে নজরুল অবশ্য আরবি ফারসি আঙ্গিক বা বিষয়বস্তুকে আত্মস্থ করে নিজস্বতা দান করেছিলেন। বলতে গেলে বাংলা কবিতায় সেই মেজাজটি প্রায় নিজস্ব হয়ে ওঠে নজরুল প্রতিভার কৌলিন্যে।’ তিনিশেলী ও জর্জ গর্ডন বায়রনের (১৭৮৮-১৮২৪) বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন, মানুষের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি ছিল তাঁদের অফুরন্ত। নজরুল-মানসে শেলী ও বায়রনের প্রবল প্রভাব লক্ষণীয়। সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যায় আর অসাম্যের বিরুদ্ধে তিনি একইভাবে বিদ্রোহ করেছেন, অন্যায়ের রূপটি তুলে ধরেছেন। সেখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অসঙ্গতির প্রত্যেকটি দিক তাঁর কবিতায় অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে। মানুষের প্রতি অনুষ্ঠিত লাঞ্ছনা, অবমাননা ও নিপীড়ন লক্ষ্য করে নজরুল যে সকল বিদ্রোহমূলক কবিতা লিখেছেন বাংলা সাহিত্যে সেই জাতীয় কবিতার তিনিই সার্থক সূচনাকারী।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!