Tuesday , October 20 2020
Breaking News
You are here: Home / ধর্ম / নৈতিকতা চর্চার কথা বারবার বলতে হবে
নৈতিকতা চর্চার কথা বারবার বলতে হবে

নৈতিকতা চর্চার কথা বারবার বলতে হবে

মুফতি মাহফুজ আবেদঃ
মানব বলতে তাদের বোঝায় যারা মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী। মানুষ মানব হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, চেষ্টা দ্বারা তাকে মানুষ থেকে মানব হতে হয়। মানুষ মনুষ্যত্ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, মনুষ্যত্ব তাকে অর্জন করতে হয়। মনুষ্যত্ব অর্জন এক অন্তহীন প্রক্রিয়া, তার জন্য জীবনব্যাপী চেষ্টা করতে হয়। যারা জীবনযাপনের মধ্যদিয়ে জীবনব্যাপী মনুষ্যত্ব অর্জনের চেষ্টা করে, তারাই মানব।

ভালো মানুষের বিপরীত মন্দ মানুষ, যাদেরকে অমানুষ বলে অভিহিত করে সমাজ। যারা অমানুষ তারা সবার জন্য বিপজ্জনক। অমানুষ সবার মানবিকীকরণের প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়, ভালো ভালো প্রয়াসকে নস্যাৎ করে দেয়।

লোভ-লালসা, সাময়িক আনন্দ কিংবা কর্ম ব্যস্ততার চাপে পড়ে মানুষ অনেক কিছুই ভুলে যেতে পারে। সবাই যাতে ভুলে না যায়, তাই মাঝে-মধ্যে নীতি-নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। একবার আলোচনা শুরু করলে সবাই না হোক কিছু মানুষের বোধোদয় হতে পারে।

জ্ঞানীরা বলেছেন, একজন খারাপ মানুষের জন্য সমাজের যে ক্ষতি হয়, তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি হয় ভালো ও জ্ঞানী মানুষের নিষ্ক্রিয়তার কারণে। এই সুযোগে মন্দ মানুষগুলো সমাজে নানা তৎপরতা চালিয়ে সমাজকে ক্ষতি করে।

ব্যক্তি সমাজের অংশ এবং সমাজ ব্যক্তি নিয়ে গঠিত। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির সমাজের প্রতি দায়িত্ব আছে এবং সমাজেরও ব্যক্তির প্রতি দায়িত্ব আছে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই কর্তব্য সমাজ গঠন, সমাজ রক্ষা, সমাজের উন্নতি সাধন ও সংস্কার সাধন। অন্যদিকে সামাজিক সংস্থা ও সংগঠনগুলোর কর্তব্য ব্যক্তিকে রক্ষা করা, ব্যক্তির উন্নতিতে সহায়তা করা। ব্যক্তির সমাজবোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতা একটি মৌলিক মানবিক গুণ।

স্নেহ, মমতা, প্রেম, শ্রদ্ধা, ভক্তি, দয়া, ভদ্রতা, সৌজন্য, সৌন্দর্যবোধ, সৌহার্দ্য, সহানুভূতি, সহিষ্ণুতা, ন্যায়বোধ ও ন্যায়নিষ্ঠা, সামঞ্জস্যবোধ, শক্তিসাধন, শ্রমশীলতা, অনুসন্ধিৎসা, স্বাধীন চিন্তাশীলতা, জ্ঞানানুরাগ, প্রগতিশীলতা ইত্যাদি অজস্র মানবিক গুণ আছে- যেগুলোর অনুশীলন মানুষের মানব হয়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য। কোরআনে কারিমে আল্লাহর নিরানব্বই নামের উল্লেখ আছে। দেখা যায়, এ নামগুলোর প্রত্যেকটিই গুণবাচক এবং গুণগুলো মানুষেরই গুণ। ধর্মনির্বিশেষে মানুষের মানব হয়ে ওঠার জন্য এসব গুণের অনুশীলন করতে হয়।

সত্যাসন্ধ হওয়া ও সত্যনিষ্ঠ থাকা একটি মৌলিক মানবিক গুণ। পৃথিবীর সব ধর্মপ্রবর্তক ও আদর্শপ্রসারী মহামানবরা কোনো না কোনোভাবে মানুষকে সত্যাসন্ধ হতে এবং সত্যনিষ্ঠ থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন। সত্যের অনুশীলনও কিছুটা ব্যক্তির আয়ত্ত্বাধীন- অনেকটাই সমাজ ও রাষ্ট্রের আনুকূল্যের ব্যাপার। সামাজিক প্রথা, পদ্ধতি ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান সত্যের প্রতিকূল হলে ব্যক্তি কতটা পারে? সত্যাসন্ধ হওয়ার ও সত্যনিষ্ঠ থাকার জন্য ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার সঙ্গে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও পালন করতে হয়।

ভালো মানুষ হওয়ার জন্য মানবিক গুণাবলির চর্চা অপরিহার্য। জীবনে মানবিক গুণাবলি অর্জন করেই মানুষ ভালো মানুষ হয়। যারা অনেক বেশি মানবিক গুণাবলির অধিকারী হন- তারা ‘মহামানব’ বলে অভিহিত হন।

দুষ্টু ও অমানুষরা যদি সংঘবদ্ধ হয় এবং ক্ষমতা লাভ করে, তাহলে সব মানুষের জন্য মানব হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সে জন্য অমানুষকে দমন করা সমাজে ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষের অমানুষ হয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা অপরিহার্য।

স্বদেশ, স্বজাতি, বিশ্বসম্প্রদায় ও সর্বজনের প্রতি দায়িত্ব পালন আরেকটি মানবিক গুণ। স্বদেশপ্রেম ও স্বজাত্যবোধ অনুশীলনের ক্ষেত্র আর বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও আন্তর্জাতিকতাবোধ অনুশীলনের ক্ষেত্র এক নয়। একটিকে অন্যটির বিরোধী রূপে না গ্রহণ করে গ্রহণ করতে হয় সম্পূরক রূপে।

বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। গবেষণা করে সমস্যার সমাধান বের করে আনতে হবে। না হলে আগামী প্রজন্ম মনুষ্যত্বহীন জড় পদার্থে পরিণত হবে। মনে রাখতে হবে, নৈতিকতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীরা এখন আর আদব-কায়দার ধার ধারে না। বড়দের সম্মান করাটাও যে এ দেশের সংস্কৃতির অংশ তাও তারা ভুলতে বসেছে। এগুলোর অনুশীলন বাড়াতে হবে।

দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে সাধারণত মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়েই আলোচনা হয়। মানবিক গুণাবলি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এ দেশে মানুষের সামনে মানবজীবনের নতুন অর্থ ও তাৎপর্য ফুটে উঠবে। তাতে মানুষ থেকে মানব হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে, দেখা দেবে অমানুষের তৎপরতা বন্ধ করার আগ্রহ।

নানা বাস্তবতার মাঝেও এ কথা স্বীকার করতে হবে, মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এখনও মানুষের মধ্যে মানব হয়ে ওঠার আকাঙ্খা অবশিষ্ট রয়েছে। নানাভাবে সেই আকাঙ্খা অভিব্যক্ত হয়। মানবিক গুণাবলির বিকাশের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে বিকৃত চিন্তা, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানবিক বিপর্যয় তৈরির পথ বন্ধ হবে। সমাজ নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণুতার কবল থেকে রেহাই পাবে।

ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য যেমন এগুলো দরকার, তেমনি ভালো সমাজ ও ভালো রাষ্ট্রের জন্যও। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছুটা পারা যায়, সেটুকু করতে হবে, অনেকটা পারা যায় না- তার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভালো করে তুলতে কাজ করতে হবে।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!