Sunday, November 19, 2017
সংবাদ শিরোনাম
You are here: Home / আন্তর্জাতিক / ভারত কি পাকিস্তান হতে যাচ্ছে?

ভারত কি পাকিস্তান হতে যাচ্ছে?

সেই জিয়াউল হকের আমলে পাকিস্তানে খোলাখুলিভাবে শরিয়াভিত্তিক ইসলামের সঙ্গে রাজনীতিকে মেশানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে বছর তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উৎখাত করে সামরিক আইন জারি করেন। জিয়াউল হক ক্ষমতায় আসার পর এক সকালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের পর্দায় হিজাব পরিহিতা এক সংবাদ পাঠিকাকে দেখা গেল, তিনি রীতিমাফিক ‘খোদা হাফেজ’ না বলে ‘আল্লাহ হাফেজ’ বললেন। যদিও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য ‘খোদা হাফেজ’ বলার চল অনেক দিন ধরেই চলে আসছিল।

‘আল্লাহ হাফেজ’ জিয়াউল হক সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ছিল। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে শরিয়াভিত্তিক কট্টর ইসলামের যাত্রা শুরু হলো। এর আগে পাকিস্তান একধরনের উদার মুসলিম রাষ্ট্র ছিল। তারপর থেকে পাকিস্তানের জনজীবন ধর্মের মধ্যে ডুবতে শুরু করে। আর রাষ্ট্রযন্ত্রও ক্রমেই হাফিজ সাইদের মতো জিহাদিদের হাতে চলে যায়।

ভারতীয়রা পাকিস্তানের এই গোঁড়ামি নিয়ে হাসাহাসি করত। তারা সঠিকভাবেই পাকিস্তানকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র আখ্যা দিত। কারণ, সন্ত্রাস ও সহিংসতা দেশটির দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কেউই এটা আগেভাগে ধারণা করতে পারেনি যে সংঘ পরিবারের নেতৃত্বে ভারতেও ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি মেশানোর মারাত্মক খেলা শুরু হবে।

এই পথে ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৯০-এর দশকে। পিছিয়ে পড়া শ্রেণি ও জাতিগুলোর সরকারি চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির কোটার ওপর মণ্ডল কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ভারতীয় সমাজে বড় সংকট সৃষ্টি হয়। হিন্দু সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোর জন্য এটা ছিল বড় ধরনের আঘাত, যেটা তার বর্ণভিত্তিক সামাজিক কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এই সামাজিক উত্তেজনার মধ্যে দৃশ্যপটে সংঘ পরিবারের আবির্ভাব হয়। এল কে আদভানি তখন রথযাত্রার ঘোষণা দেন। তিনি দেশটিকে মন্দির-মসজিদে বিভক্ত করে ফেলেন। কৌশলটা তেমন জটিল কিছু ছিল না। হিন্দু সমাজের বর্ণবিভাজনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ তৈরি করা হলো। এই লক্ষ্যে একটি শত্রু তৈরি করতে হবে, আর তারা হচ্ছে ‘মুসলমান’, তাদের ভাষায় যারা বাবর কি আওলাদ।

আমরা দেখেছি, ১৯৯০-এর দশকের এই তীব্র হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে বিপুলসংখ্যক মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হলো। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কৌশলের কারণে বিজেপি শুধু শক্তিই অর্জন করেনি, তারা রাতারাতি রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়। কংগ্রেস একরকম উদার হলেও ব্যর্থ হচ্ছিল। মণ্ডল কমিশনের প্রতিবেদন পেশ হওয়ার পর কংগ্রেস ক্রমবর্ধমান হারে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিল, তারা সেটা আমলে নিতে পারেনি।

হিন্দু ক্ষমতাকাঠামো হঠাৎ করেই দেখল, তারা সামাজিকভাবে হুমকির মুখে পড়লেও হিন্দুত্বকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ, বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে যে চ্যালেঞ্জ ছিল, তা বাঁচানোর রক্ষাকবচ। এরপর ভাষাও বদলে যেতে শুরু করল। প্রথমত, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে ‘ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতা’ আখ্যা দিয়ে উপহাস করা হলো। এর মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষদের আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করা হলো। মুসলমান ভোটব্যাংক ও মুসলমানদের আশ্বস্ত করার নীতি—এ জাতীয় ভাষার আমদানি হলো বলা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা ‘মুসলমান শত্রুর’ দ্বারা ঘেরাও হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক হিন্দুত্ব তৈরির লক্ষ্যে এটি ছিল সচেতন এক খেলা।

এগুলো সবই পাকিস্তানের অনুকরণ। জিয়া আহমদিয়াদের পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। এই শক্তিগুলো ভারতে সেই পুরোনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কার্ড খেলতে শুরু করেছে: হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন। ফলে স্বাভাবিকভাবে এই ক্রমবর্ধমান হুমকিকে বশে আনার জন্য একজন রক্ষাকর্তার প্রয়োজন হলো। শুরুর দিকে এই রক্ষাকর্তা ছিলেন আদভানি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্র মোদি নামের এক কট্টরপন্থীর উদয় হলো, যাঁকে হিন্দু হৃদয় সম্রাট আখ্যা দেওয়া হলো। আবার দেখা গেল, পাকিস্তানের ধর্ম-রাজনীতি মিশ্রণের খেলা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংঘ পরিবার বজরঙ্গি দল, হিন্দু সেনা, হিন্দু বাহিনী প্রভৃতি ছায়া দল গঠন করল। হাফিজ সাইদের মতো লোকেরা যেমন পাকিস্তানের, তেমনি আদিত্যনাথের মতো লোকেরা ভারতের। সাইদ যদি ভারতের হুমকি জিইয়ে রেখে থাকেন, তাহলে আদিত্যনাথ গোরক্ষা ও ভালোবাসা জিহাদের নামে হিন্দুদের একত্র করে একই কাজ করছেন। তাঁরা সংখ্যাগুরুদের নতুন রক্ষাকর্তা, যাঁদের কাজ হচ্ছে, এদের মনে এক কাল্পনিক শত্রু জিইয়ে রাখা।

ভারতের মতো আধুনিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মেলানো কৌশল হিসেবে খুবই মারাত্মক। এটা এক পেঁচালো খেলা, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। পাকিস্তান ১৯৭৭ সাল থেকেই ইসলামীকরণের রাজনীতি শুরু করেছে। দেশটির অস্তিত্ব আজ জিহাদিদের ওপর নির্ভর করছে। তারা কখন রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে ফেলার মতো শক্তি অর্জন করবে, আমরা তা জানি না।

হয়তো আদিত্যনাথ একদিন মোদিকে পেছনে ফেলে দেবেন। তিনি হয়তো রাষ্ট্রের মধ্যে আরও বেশি করে  ধর্ম ঢুকিয়ে দেবেন। রাজনীতির সঙ্গে ধর্ম মেলানো হলে কী হয়, আমরা তা জানি।  এখন ভারত কি সেই পথেই হাঁ

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top