Saturday , November 28 2020
You are here: Home / Uncategorized / জগদীশ গুপ্ত যন্ত্রণাহত শুদ্ধতাভিসারী মানুষের রূপকার : ড. তপন কুমার রায়, সহযোগী অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
জগদীশ গুপ্ত যন্ত্রণাহত শুদ্ধতাভিসারী মানুষের রূপকার : ড. তপন কুমার রায়,   সহযোগী অধ্যাপক  বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

জগদীশ গুপ্ত যন্ত্রণাহত শুদ্ধতাভিসারী মানুষের রূপকার : ড. তপন কুমার রায়, সহযোগী অধ্যাপক বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

তিরিশোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যে কল্লোলীয় ভাবধারার অনন্য রূপকার জগদীশ গুপ্ত (১৮৮৬-১৯৫৭)। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালী ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত বালিয়াকান্দী থানার (বর্তমান রাজবাড়ি জেলার অন্তর্গত) খোর্দ্দ মেঘাচামী গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কৈলাসচন্দ্র, মাতা সৌদামিনী। কার্যোপলক্ষ্যে তাঁর পিতা কুষ্টিয়া শহরে বসবাস করতেন। সেখানে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে (বাংলা ২২ আষাঢ় ১২৯২) জগদীশ গুপ্তের জন্ম। তাঁর ডাকনাম ছিল নারায়ণ।
জদগীশ গুপ্তের পিতামহ ছিলেন অবস্থাপন্ন বড় জোতদার। কৈলাসচন্দ্র পিতার কবিরাজি পেশায় নিজেকে না জড়িয়ে স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসায় শুরু করেন এবং নিজের পেশাগত সুবিধার জন্য কুষ্টিয়া এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
একান্নভুক্ত যৌথ পরিবারে জগদীশ গুপ্তের বাল্য-কৈশোর অতিবাহিত হয়। তাঁর ছেলে বেলার অনেক সময় কেটেছে পতিতাপল্লিতে, তাদের সান্নিধ্যে। এ সম্পর্কে তাঁর স্ত্রী চারুবালা জানায় কুষ্টিয়া আমলা পাড়ায় তাদের বাড়ির আশেপাশে অনেক ঘর পতিতা বাস করতো। তারা জগদীশ গুপ্তকে বড় স্নেহ করতো। সেখান থেকেই পরবর্তিতে হয়তো তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন পতিতাদের জীবন নিয়ে গল্প উপন্যাস লেখার। কিংবা ঘটনার গভীরে গিয়ে মানুষের স্বরূপকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করেছিলেন।
তাঁর বিদ্যারম্ভ কুষ্টিয়ার পণ্ডিত রামলাল সাহার পাঠশালায়। তারপর স্থানীয় হাইস্কুলে পড়ার সময় তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায়। সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয় সিটি কলেজিয়েট স্কুলে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি ১৯০৫ সালে ম্যাট্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন রিপন কলেজ। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার পড়াশোনা আর অগ্রসর হয়নি। বছর খানেক পরেই তাঁর কর্মজীবনের সূত্রপাত ঘটে। জগদীশ গুপ্ত বরাবরই ছিলেন স্বল্পভাষি, আত্মমগ্ন, নির্লিপ্ত, প্রচারবিমুখ আর ছিলেন শান্ত, নিরহংকার, সাদামাঠা। নিজেকে তিনি গুটিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন। ছিলেন ‘কল্লোল’ পত্রিকার একজন প্রধান লেখক। নিয়মিত ‘কল্লোলে’ লিখতেন, সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশের সঙ্গে ছিল তাঁর দারুণ সখ্যতা। তবুও তিনি কখনো ‘কল্লোল’ পত্রিকার অফিসে আসেননি। তাঁর সম্পর্কে সম্পাদকের মন্তব্য : ‘লোক-কোলাহলের মধ্যে এসে সাফল্যের সার্টিফিকেট খোঁজেননি’। তিনি জীবনযাপনে ছিলেন আড়ম্বরহীন। তাঁর জীবনের আর্থিক স্বচ্ছলতা ধরা না ছিলেও, অর্থের পেছনে তিনি কখনো ছোটেননি। প্রখর আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ছিলেন। আর এ কারণে ছিলেন জেদি আর একগুয়ে স্বভাবের। আবার তাঁর চরিত্রের মধ্যে কোমল এবং কঠিনের সম্মিলনও ঘটেছিল স্বাভাবিক নিয়মে।
তিনি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর না হতে পারলেও বিশ্বসাহিত্যের পঠন পাঠনে বিস্ময়কর রকম এগিয়ে ছিলেন। তাঁর রচনার মধ্যে যে নির্মোহ তীব্র মন্তব্য, বিদ্রুপ আরো স্পষ্ট করলে ওৎড়হু পাই তা তাঁর নির্মিত সাহিত্যবোধের ফল।
জগদীশ গুপ্ত’র জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শক্তি ছিল অপরিসীম। সমাজকে কিংবা সমাজস্থিত মানুষকে তিনি সামনে থেকে দেখতে অভ্যস্থ ছিলেন না, দেখতেন বিপরীত দিক থেকে। অপ্রকাশিত দিককে খুঁচিয়ে বের করে আনতে তাঁর অনায়াস পারদর্শিতা ছিল। তাঁর সাহিত্যের জগৎও তাই। খালি চোখে এই জগতের সন্ধান মেলে না। তাকে দেখতে হলে লাগে একজোড়া অন্তরচক্ষু। তিনি ব্যক্তিচরিত্রের স্বভাবকে খুলে খুলে ভিতরে প্রবেশ করতে চায়তেন। এই কারণে তাঁর জগৎ আমাদের অভ্যস্থ জগতের বাইরে। অপরিচয়ের আকস্মিক ধাক্কা লাগে সেখানে যেতে। তারপর বিস্ময় জাগায়, তবে সে বিস্ময় অবাস্তবের জন্য নয়, তা রূঢ় ও কদর্য বাস্তবতার কারণেই।
জগদীশ গুপ্ত কোনো জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না। প্রচলিত জনপ্রিয়তার পেছনে তিনি কখনো ধাবিত হননি। বরং তিনি ছিলেন উপেক্ষিত, অনাদৃত আর অবহেলিত। বেঁচে থাকতে সম্মাননা বা স্বীকৃতি তাঁর মেলেনি। আর মৃত্যুর সঙ্গে বিস্মৃত হতে চলেছিলেন। অথচ তিনি কল্লোলের একজন শুধু প্রধান লেখকই নন, কল্লোল যে প্রথাবিরোধী ভাব-ভাষা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার প্রায় সকল বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছিলেন জগদীশ গুপ্ত। তাঁর সাহিত্য সমকালে পাঠক সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়লেও সম্মান কিংবা সমাদর তাঁর সঙ্গে হাঁটেনি। এমনকি সাহিত্য-সমালোচক ইতিহাসকাররা তাঁকে কিনতে পারেননি। তবে আশার কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি ক্রমশ আগ্রহের হয়ে উঠছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জগদীশ গুপ্ত পাঠ্য হয়েছে – ইচ্ছে। তাঁর প্রথম লেখা যৌবনে প্রকাশিত হলেও, তাঁর প্রকৃত সাহিত্য চর্চা শুরু হয় প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে। প্রায় পঞ্চাশ বছরের সাহিত্য জীবনে তাঁর প্রকাশিত-অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যা বলতে গেলে প্রচুর।
তাঁর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ১৬। তবে ১৩টি প্রকাশের নিশ্চিত প্রমাণ মেলে। এগুলো হলো : বিনোদিনী (১৩৩৪), রূপের বাহিরে (১৩৩৬), শ্রীমতি (১৩৩৭), উদয়লেখা (১৩৩৯), উপায়ন (১৩৪১), পাইক শ্রীমিহির প্রামাণিক (?), শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী (১৩৪২), তৃষিত সৃক্কণী (১৯৩৯), মেঘাবৃত অশনি (১৩৫৪), অঞ্জন শলাকা (?), ভূঙ্গার (?) জগদীশ গুপÍর গল্প (১৯৭৭)।
তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা ১৮টি : লঘু-গুরু (১৩৩৮), অসাধু সিদ্ধার্থ (১৩৩৬), তাতল সৈকতে (১৩৩৮), দুলালের দোলা (১৩৩৮), রোমন্থন (১৩৩৮), সুতিনী (১৩৪০), গতিহারা জাহৃবী (১৩৪২), যথাক্রমে (১৩৬০), মহিষী (১৯২৯), নন্দ আর কৃষ্ণা (১৯৪৭), নিষেধের পটভূমিকায় (১৩৫৯), নিদ্রিত কুম্ভকর্ণ (?), দয়ানন্দ মল্লিক ও মল্লিকা (১৯৩৯), রতি ও বিরতি (১৩৪১) প্রভৃতি।
পুরাতন প্রচলিত বিশ্বাসের ভীতকে দারুণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছেন জগদীশ গুপ্ত। সৌন্দর্য কল্যাণ আর সত্যের প্রতি অবিচল থাকতে পারেননি তিনি। ভিন্ন এক জীবনাভিজ্ঞতার কথা শোনান তাঁর গল্প-উপন্যাসের বিরল ভূমিতে। তীব্র অবিশ্বাসের দহনে দাহ করেছেন তাঁর স্রষ্টা সম্পর্কিত ধারণাকে। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টিতে সমাজ-জীবনকে বিশ্লেষিত করেছেন। কারো দেখিয়ে দেওয়া পথে নয়। নিজেই সে পথ আবিষ্কার করে নিয়ে ছিলেন। সে পথ বন্ধুর অথচ খাঁটি।
রবীন্দ্রনাথ-প্রভাত কুমার-শরৎচন্দ্রের যৌথ প্রয়াসের যে সাহিত্যে রুচি গড়ে উঠেছিল তার বিরুদ্ধে জগদীশ গুপ্ত প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিল্পীতভাবে। তাঁর সাহিত্য একটি গোটা সাহিত্য জগতকে রুখে দিয়েছে। সেই করণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে উপেক্ষা করে পারা যায় না। জীবনকে যেভাবে দেখেছেন সেভাবেই অকপট প্রকাশে তিনি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। সেই অচেনা পথে অভিযানে যাওয়া নিশ্চয় অনেকটা সাহসের ব্যাপার। সবাই সেই সাহস দেখাতে পারবে বা একে সমর্থন করবে এমন আশাও নিশ্চয় জগদীশ গুপ্ত করেননি। করেননি বলেই তিনি সাহসী শিল্পীর খেতাবে ভূষিত হতে পেয়েছেন উত্তর প্রজন্মের পাঠকের কাছে।
লঘু-গুরু জগদীশচন্দ্র গুপ্তের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এই উপন্যাসের দুটি প্রধান চরিত্র উত্তম ও টুকী। টুকীর বাবা বিশ্বম্ভর। বিশ্বম্ভরের স্ত্রী হিরণ। হিরণ গর্ভাবস্থায় বিশ্বম্ভরের অসম আচরণে পড়ে গিয়ে টুকীকে জন্ম দিয়ে মারা যায়। টুকী একা একা বড় হতে থাকে। টুকীর বালিকা বয়সে বিশ্বম্ভর উত্তম নামের একজন স্বৈরিণীকে রক্ষিতা হিসেবে আনে। উত্তম টুকীকে সন্তানের স্নেহে বড় করে তোলে। অর্থাৎ একজন মায়ের যে ভূমিকা তাই উত্তম টুকীর ক্ষেত্রে পালন করে। উত্তম টুকীর যাবতীয় কাজ শেখায়। সে সব সময় চায় তার অতীত জীবনের কোনো ছায়া যেন টুকীর উপরে না পড়ে। প্রকৃত পক্ষে টুকীর মা হয়ে উঠতে চেয়েছে উত্তম। কিন্তু সমাজ উত্তমকে সব সময় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে তার অতীত। টুকীর বিয়ের সময়ে উত্তমের অতীত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, দেখা দেয় নানা সমস্যা। শেষে বায়ান্ন বছর বয়সের পরিতোষের সঙ্গে যৌতুকের বিনিময়ে টুকীর বিয়ে হয়। পরিতোষ একজন দুঃচরিত্র-লোভী-অত্যাচারী। তারও সুন্দরী নামে একজন রক্ষিতা আছে। গতযৌবনা সুন্দরী টুকীর মধ্যে নিজের আয়ের উৎস সন্ধান করে। টুকী প্রথমে সম্মত না হলেও এক সময় তাকে আত্মসমর্পণ করতে হয়। উত্তম টুকীকে যে অসম্মানের জীবন থেকে বাঁচাতে সংগ্রাম করেছে সেই জীবনই টুকীকে বরণ করতে হয়।
তাঁর অসাধু সিদ্ধার্থ উপন্যাসে দেখি নটবর (যে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র) সিদ্ধার্থ নামে মৃত এক উজ্জ্বল-চরিত্র ব্যক্তির ছমবেশ ধারণ করে অজয়া নামের একটি সুন্দরী তরুণীর হৃদয় জয় করতে চেয়েছিল। সিদ্ধার্থের সমস্ত পরিচয় সংগ্রহ করে নিজেকে তিলে তিলে তৈরি করেছিল। দুর্ভাগ্য তার ওই ছদ্মবেশ ফেঁসে গেল অজয়া এবং ছদ্মবেশী সিদ্ধার্থের প্রেম যখন বিবাহের মুখোমুখি পৌঁছায় তখন। নটবর নিজে যা নয় কিংবা সে যা হতে পারেনি, তাই হতে চেয়েছিল সিদ্ধার্থের ছদ্মবেশের মধ্যে। আমরা প্রত্যেকেই তো তাই। আমরা একটা কিছু হতে চাই, নিজেকে তাই প্রতিপন্ন করার চলে প্রাণান্ত চেষ্টা। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে আমাদের জীবনে ঘটে অনেক ব্যর্থতার জন্ম। লেখক আমাদের যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চান সিদ্ধার্থের ছদ্মবেশে নটবরের যে ব্যর্থতা তা মূলত তার জীবনেরই ব্যর্থতা। নটবর নিজেকে শুধরে নিয়ে চলতে চাইলেও আমরা দেখবো সমাজ সে সুযোগ তার জন্য রাখে না। প্রচণ্ড নির্মম এক বেপরোয়া রূপ নিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। নটবরের অতীতকে কিছুতেই তার জীবন থেকে মুছতে দেয়নি। তার শুভবোধের উদ্বোধক অজয়াকে জয় করতে দেবে না ঐ সমাজস্থির মানুষ। এটাই যেন তার নিয়তি।
যথাক্রমে উপন্যাসের অন্যতম নারী চরিত্র সাবিত্রী। স্ত্রীর মৃত্যুর পর রামপ্রসাদ ছেলে দীনু ও মেয়ে সাবিত্রীকে নিয়ে কষ্টে দিন যাপন করছিল। হঠাৎ রামপ্রসাদের মৃত্যু দীনু ও সাবিত্রীকে অসহায় করে তোলে। তারা গ্রাম জীবনে শঠতা ও দুর্বিত্ততার মধ্যে বড় হয়ে ওঠে। এর পর সাবিত্রী যখন স্বামীর ঘরে যায় তখনই তার জীবনে নেমে আসে চরম সংকট। প্রথম প্রথম শাশুড়ী বউকে আদর করলেও পরে কথায় কথায় অত্যাচার করে। শিবুর মা এলোকেশী চেয়েছিল ছেলের বউ এক হাতে দক্ষযজ্ঞ সমাধা করবে অথচ মুখে কোন কথায় বলবে না। সাবিত্রীর মুখে কোন কথা নেই অথচ দক্ষযজ্ঞ তাকে দিয়ে সমাধা করার প্রাণপণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রতি পদে পদে সাবিত্রী এভাবে লাঞ্ছনার স্বীকার হয়। সাবিত্রীর স্বামী শিবু নির্বাক দর্শক। সম্পূর্ণ সাবিত্রীর অজ্ঞাতেই তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সাবিত্রী সচেতনভাবে প্রতিবাদ মূর্তি ধারণ করেনি। সাবিত্রী এতদিনে বুঝে নিল এখানে কথার উত্তরে কথা, শক্ত কথার জবাবে আরো শক্ত জবাব দিতে হবে। এভাবে সাবিত্রী চরিত্রে এক আশ্চর্য রূপান্তর ঘটে। যা তাকে অসহায়ত্ব থেকে প্রতিবাদী করে তোলে। জগদীশচন্দ্র গুপ্তের চরিত্ররা প্রায়শই সমাজ বা অদৃষ্ট দ্বারা চালিত হয়। এই চরিত্রগুলির অসহায়তা চোখে পড়লেও প্রতিবাদী নারী চরিত্র বিরল। প্রতিবাদী যে কয়েকটি চরিত্র দেখতে পাওয়া যায় সাবিত্রী তাদের অন্যতম।
মহিষী উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র জ্যোতির্ময়ী। ব্রজকিশোর যৌতুকের লোভে কৌশলে পুত্র অশোককে কালো মেয়ের সাথে বিয়েতে সম্মত করায়। অশোক প্রথমে আপত্তি করলেও পরে সব দিক বিবেচনায় জ্যোতির্ময়ীকে গ্রহণ করে। বিপত্তি ঘটালো ব্রজকিশোরের সঙ্গে কৌশলে যারা অংশ নিয়েছিল। যখন অশোক জানতে পারল ব্রজকিশোর তার সঙ্গে চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। তখন তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল নির্দোষ জ্যোতির্ময়ীর উপর। যদিও অশোক সরাসরি জ্যোতিকে কিছু বলেনি। শুধু যেদিন শুনতে পায় সেদিন মাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে। জ্যোতির্ময়ী অনুমান করে তার গায়ের রঙের জন্যই অশোকের এই প্রতিক্রিয়া। সে ভাবে অশোকের মনের সুখ হলেও চোখের সুখ সে দিতে পারবে না। এখানে জ্যোতির্ময়ীর অসহায়তার চিত্র ফুটে উঠেছে। জ্যোতির চূড়ান্ত অসহায়তা দেখতে পাই যখন অশোক নতুন বউ নন্দের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে করতে বিস্ময়ের ভান করে জ্যোতিকে বলে- ‘অই তুমি আছো এখানেই?’ এই নির্মম প্রশ্নে যত বেদনা ছিল, জ্যোতির প্রত্যেকটি রক্তবিন্দু নিঃশেষে গ্রহণ করে। প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন জ্যোতির্ময়ী ভাগ্যের বিপর্যয় কে মেনে নিয়ে স্বামীগৃহ ত্যাগ করে।
গতিহারা জাহ্নবী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কিশোরী। রাধাবিনোদ বাবুর একমাত্র কন্যা সে। কিশোরীর বিয়ে হয় পিতার বন্ধু-পুত্র অকিঞ্চনের সঙ্গে। কিন্তু কিশোরীর রূপগুণ অকিঞ্চনের হৃদয় জাগাতে পারে না। অবশ্য অকিঞ্চনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিয়ের আসরে বসা কিশোরীর বান্ধবী অপরা। স্বামীর ইতরতা নিয়ে উৎকন্ঠিত কিশোরী পিত্রালয়ে ফিরে আসে। সকলের কথায় কিশোরী আবার শ্বশুরালয়ে ফিরে যায়। কিন্তু অকিঞ্চন আগের মতোই বাগদী পাড়ায় যায়। তাদের সঙ্গে ঠাট্টা-ইয়ার্কিতে মাতে। অকিঞ্চনের বাবা আবার ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আয়োজন করে। অকিঞ্চনও সম্মত, সে কিশোরীকে আনবে বিয়েও করবে। আর সবাই যখন বিমূঢ় তখন জানা গেল একদিকে হাস্যকর অন্যদিকে হৃদয় বিদারক সংবাদ কিশোরী সন্তানসম্ভবা। বিভ্রান্ত কিশোরী ভাবে এই সন্তান সেই অশেষ কলুষজাত। শুভ নয়, স্বার্থক নয়, ঈপ্সিত নয়, তা অবাঞ্চিত এবং বর্জনীয়। এই পরিস্থিতির মধ্যে কিশোরীর চূড়ান্ত অসহায়তা ফুটে উঠে।
সুতিনী উপন্যাসে উঠে এসেছে নারী মনের জটিল মনস্তত্ত্ব। উপন্যাসের নায়িকা রাজবালা জোর করে ছোট বোন মধুমালার সঙ্গে স্বামী দুর্গাপদর বিয়ে দেয়। বিয়ের পর শীর্ণ দুর্গাপদর শরীরে মাংস লাগা দেখে তার ঈর্ষা হয়। তার মনে হয় স্বামীর বিয়ে দিয়ে সে নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে। মধুমালার সন্তান জন্মের পর রাজবালা পঞ্চম বারের মতো সন্তানসম্ভবা হলে তার মনে হয় আগত এই সন্তান দুর্ভাগা। সে প্রত্যাশা করে এই সন্তান যেন মেয়ে হয়, যাতে তাকে এই বাড়িতে থেকে মধুমালার ছেলের অধীনতা স্বীকার করতে না হয়।
নিদ্রিত কুম্ভকর্ণ উপন্যাসেও নারী মনের জটিল মনস্তত্ত্ব উন্মোচিত হয়েছে। স্বামীর কাপুরুষতায় স্তব্ধ হয়ে যায় নায়িকা প্রফুল্ল। তার মনে হয় ঐমতো পরিস্থিতিতে শশধর তাকেও ফেলে পালাতো কিংবা পালাবে।
তাতল সৈকতে উপন্যাসে শরৎ সমাজের বিরূপ বাস্তবতা থেকে পালাতে পারেনি। সে স্বৈরিণী দুর্নাম নিয়ে গ্রাম ছেড়ে রণজিৎকে ছেলে ডেকে আশ্রয় নিয়েছিল তার। কিন্তু ঐ ভিত্তিহীন অতীত তাকে আবার তাড়িত করে। রণজিৎ শরতের চারিত্রিক শুদ্ধিতায় সন্দিহান হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শরৎকে নিয়তির কাছে ধরা দিতেই হলো।
নিষেধের পটভূমিকায় উপন্যাসে মেয়ের প্রতি বাবার অতিরিক্ত আগ্রহ্য ও তাদের উন্মুক্ত আলোচনা মায়ের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সেই সন্দেহ এতটাই তাকে আন্দোলিত করে যে, সে মেয়েকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে বসে- তার বাবা তাকে উপভোগ করেছে কি না। যৌন বিকৃতির অনুপম চিত্র পাওয়া যায় নন্দ আর কৃষ্ণা উপন্যাসে। এই উপন্যাসের মনীন্দ্র এবং তার কথিত স্ত্রী কৃষ্ণা ক্লেদ আর বিকৃত হতাশার এক অন্ধকার জগতে বাস করে। প্রকৃত পক্ষে জগদীশ গুপ্তের চরিত্ররা যৌন বিকৃতির এই ক্লেদাক্ত অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। দয়ানন্দ মল্লিক ও মল্লিকা উপন্যাসেও স্বাধীনচেতনা নারীর জীবনবোধের গভীর প্রকাশ লক্ষযোগ্য। স্বামী, সন্তান অপেক্ষা নিজের আত্মরক্ষায় তার কাছে বড় হয়ে উঠেছে।
জগদীশ গুপ্তের শিল্প প্রতিভা সার্থকতায় পর্যভূষিত হয়েছে ছোটগল্পে। তাঁর ‘বিনোদিনী’ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন: “ছোট গল্পের বিশেষ রূপ ও রস তোমার লেখায় পরিস্ফুট দেখিয়া সুখী হইলাম। বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব আর জীবনবোধের গভীরতায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তার ছোটগল্পগুলো বিশিষ্ট। মানুষের প্রথাগত বিশ্বাস, মূল্যবোধ, সম্পর্কের শৃঙ্খলা তাঁর ছোটগল্পে ছোঁচট খায়। তা আমাদের চির চেনা জগতের বাইরে। আমাদের শুভবোধগুলো যেখানে পিষ্ট হয়। এখানেও আমরা দেখি চরিত্রগুলোর মনোজগতে তিনি বিচরণ করেন স্বচ্ছন্দে। তাঁর গল্পে অদৃষ্ট বা নিয়তির ভূমিকা আমাদের ভাবায়। তার গল্পে বাস্তবতা ও অবাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটে চলে অন্তসলিলার মতো। তিনি বাস্তববাদি শিল্পী কিন্তু তার সাহিত্যের চরিত্ররা বিপন্ন বাস্তবতার কাছে পরাভূত বলেই তারা অদৃষ্টে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তাঁর চোখে জীবনের অসঙ্গতি ও কদর্যতা নানা মাত্রায় ধরা দেয়; কিন্তু তিনি কখনো জীবনবিমুখ নন বরং জীবনকে ভালোবেসেই তিনি যন্ত্রণাহত মানুষের শুদ্ধতাভিসারী জীবনকে সমর্থন করেন, তুলে ধরেন শুদ্ধ পথের প্রতিবন্ধকতা।
তার পাত্রপাত্রীরা উপস্থিত হয়েছে এক নগ্ন অস্তিত্বে। নিরাসক্ত দৃষ্টির অধিকারী বলেই তিনি দেখতে পান মানুষ তার অন্তরে লালন করেছে এক পাশব সত্তা। তবু মানুষ নগণ্য হয়ে যায়নি। যেহেতু চরিত্ররাই তাঁর উদ্দিষ্ট, তাদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্য। চরিত্রগুলোর মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যানের বিষয়ে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন তিনি। নারী সম্বন্ধে যে সম্ভ্রমবোধ এবং আব্রু রচনা করে তাদের অন্য একটি জগতের অধিবাসী করে তোলার যে প্রচেষ্টা এতদিন ছিল তা ভেঙেছেন জগদীশচন্দ্র গুপ্ত। তাঁর নারী চরিত্রগুলোতে দেখি সমাজ ও পুরুষ কর্তৃক তাদের যে অসহায়তা তার বিরুদ্ধ খুব প্রতিবাদী চরিত্র তেমন নেই।
কেবল অল্প-স্বল্প প্রতিবাদ কখনো অবচেতন কখনো সচেতনভাবে বিধৃত হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁর নারী চরিত্র অংকনের সফলতা লক্ষণীয়। অন্যদের ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটা ছিল বুদ্ধিসম্ভব উপলব্ধি, জগদীশ গুপ্তের ক্ষেত্রে সেখানে উপলব্ধিটা জীবনবোধের ফল। জীবনের গূঢ় সমস্যা হিসেবেই তিনি বিষয়গুলোকে শিল্পী হিসেবে ধারণ করেছিলেন’। ‘জগদীশচন্দ্র গুপ্তের কলুষময় জগতে যৌন আনুগত্য নেই, বিবাহিত সম্পর্কের শুচিতা নেই। স্ত্রীর বর্তমানে এই জগতের স্থুলরুচি পুরুষরা দ্বিতীয় বিবাহে হৃষ্ট লোলুপতার পরিচয় দেয় । ধর্ষণ, পরনারী সম্ভোগে তাদের মনে কোনো নৈতিক বা রুচিগত বাধা নেই। তাদের ইতর যৌনক্ষুধার কাছে সম্পর্কজনিত বাধাও বাধা নয়’। এই সমস্ত পুরুষদের কাছে জগদীশচন্দ্র গুপ্তের সৃষ্ট নারীরা তীব্র অসহায়। সেই অসহায়তা থেকে সমাজ ও পুরুষের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ নারী চারিত্রগুলোকে মহিমান্বিত করেছে। জগদীশ গুপ্ত আমাদের দেখাতে চেয়েছেন জীবনের অন্তর্নিহিত শুদ্ধিভবনের শক্তি সর্বদাই পরাস্ত হয়। পাশাপাশি জীবনের শুদ্ধতার পথের যাত্রাকে তিনি ছোট করে দেখেননি। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রখ্যাত সাহিত্য-সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন একমাত্র কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছাড়া জগদীশ গুপ্তের শিল্পস্বভাবের আত্মীয় অর্থাৎ তাঁর চিন্তার সহযাত্রী আর কেউ নেই। জগদীশ গুপ্ত বিশ্বাস করতেন মানুষ তার অতীতের গ্লানিকে মুছে ফেলে জীবনে শুদ্ধতাভিসারী হতে চায়। সেই প্রয়াসশীল মানুষের যন্ত্রণাকে, না পারার ব্যর্থতাকে তিনি সাহিত্যে তুলে আনতে চেয়েছেন। রূঢ় বাস্তবতাকে দেখাতে চেয়েছেন কিন্তু মানুষকে, মানুষের গৌরবকে ম্লান করতে চাননি।
তাঁকে ভুল বশত কোনো কোনো সমালোচক অমানবতন্ত্রী লেখক বলে অবিহিত করতে চেয়েছেন। কোন লেখকই অমানবতন্ত্রী তথা মানব বিদ্বেষী হতে পারে না। এই সময়ে সাহিত্যিকদের চিন্তা চেতনায় বোদলেয়ার এবং দস্তয়েভস্কির অনুপ্রেরণা তাদেরকে এই অশুভ বা মসিলিপ্ত দিক খুঁজতে আগ্রহী করেছে, বলা বাহুল্য এই উদ্যোগের চালিকা শক্তি জবধষরংস এর সন্ধান, আরো সহজ করে বলা যায় প্রতীকবাদী সাহিত্যিকরা শিল্পের মধ্য দিয়ে যখন বিশুদ্ধ সৌন্দর্য লাভ করতে চান, তারা সৌন্দর্যকে নৈতিকতার অনুশাসন থেকে মুক্ত করেছেন অর্থাৎ সুন্দরটি ভালো কি মন্দ এই বিবেচনা নয় তা থেকে যদি শিল্প উদ্রিক্ত হতে পারে তা হলেই তা সুন্দর বলে বিবেচ্য। খুব পরিচিত একটা উদাহরণ আছে- একটা বন্য জন্তুর মৃতদেহ স্বভাবতই মানুষের জুগুপ্সার উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু এই শব দেহটাই যদি কবির কাছে শাশ্বতের বোধ নিয়ে আসে তবে তিনি একে সুন্দর বলেই বিবেচনা করবেন। এখানেই গড়ে ওঠে কুৎসিতের নন্দনতত্ত্ব।
জগদীশ গুপ্তের রচনাকে স্পষ্ট দুটি ভাগে ভাল করা যাবে। প্রথম ধারায় যেখানে অমঙ্গলবোধ, অদৃষ্ট, লিবিডো প্রভৃতিধারা। দ্বিতীয় ধারায় অশরৎচন্দ্রীয় মেজাজে পল্লি জীবনকে দেখা উপস্যাস।
সাধারণত পাঠক শরৎচন্দ্র বা প্রভাতকুমারের যে পল্লি বর্ণনার সঙ্গে পরিচিত, এই বর্ণনা তার তুলনায় নির্মোহ নিরাসক্ত এবং রিয়ালিটির কাছাকাছি। বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যের জন্যও জগদীশ গুপ্তের কৃতিত্ব প্রাপ্য। কারণ আপাত রম্য কাহিনির মধ্য দিয়ে তিনি যেভাবে পল্লির পট উন্মোচন করেছেন তাকে কল্লোল সুলভ বলা যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্ব সুরিও হয়তো বলা যাবে। সমকালে তিনি পাঠক প্রিয়তা না পেলেও তাঁর গুরুত্ব হ্রাস পায় না। আর আমরা এ-ও জানি পাঠক প্রিয়তা সাহিত্যের উৎকর্যতার মানদণ্ড নয়।
জগদীশ গুপ্তের সাহিত্য মনুষ্যত্ব বিনষ্টির উপাচারে আকীর্ণ। সমাজ-ভাবনাও তাঁকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে। তার পরিচয় মেলে পল্লি-ভাবনা কেন্দ্রিক ট্রিলজিতে : দুলালের দোলা, রোমস্থন, যথাক্রমে। শরৎচন্দ্রের প্রতিক্রয়ায় তাঁর এই পল্লি-ভাবনা সঞ্জাত হয়েছে।
অশরৎচন্দ্রীয় মেজাজে পল্লি জীবন তার প্রকৃত স্বরূপে উঠে এসেছে তাঁর ট্রিলজিতে রোমস্থন, যথাক্রমে, দুলালের দোলা উপন্যাসে। শরৎচন্দ্র যেখানে কৌলিন্য বা জাতি প্রথাকে বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দেন, জগদীশ গুপ্ত ব্রাহ্মণদের স্বভাবজাত বিনষ্টি ব্যাখ্যা করলেও সেই অর্থে জাতপাতের অস্পৃশ্যতা তুলে আনেন না। আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পরবর্তী কালে শশী ডাক্তারকে বিচ্ছিন্ন চরিত্র হিসেবে হাজির করেন সেই নাগরিক বৈদগ্ধ বা পল্লির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অসম্ভাব্যতা জগদীশ গুপ্তের নিত্যপদ ডাক্তারের মধ্যে নেই। মানিক নির্মোহ বা নৈব্যক্তিক শিল্পী, অনেকেই জগদীশ গুপ্তের উত্তরাধিকার মানিক বন্দ্যোপাধায়ের মধ্যে লক্ষ করে থাকেন।
কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর জগদীশ গুপ্তের প্রভাব কোনো কোনো সমালোচকের দৃষ্টিতে আসে। কিন্তু বিষয়ের দিক থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক ব্যাপক। যিনি পল্লির পাশাপাশি শহুরে জীবন, রাজনীতি, মনোবিশ্লেষণ অনেক বিষয় উপজীব্য করেন। জগদীশ গুপ্ত সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন না কিন্তু প্রকৃতির নিরিখে পল্লির সামাজিক অবস্থার যে অবনমন তিনি দেখান সেই সুবাদে তাঁর প্রকৃতি চেতনা আলাদা করে চিহিৃত করা যায়। সেই অর্থে জগদীশ গুপ্ত বিশিষ্ট এবং পল্লি বা প্রকৃতি বিষয় বক্তব্যে তাঁর উপন্যাসে রাজনৈতিক বক্তব্য অস্পষ্ট থাকে না।
জগদীশ গুপ্ত প্রচলিত ধারণা এবং বিশ্বাসের প্রতি অনাস্থা স্থাপন করে আপন অভিজ্ঞতা আর নিরাসক্ত জীবনদৃষ্টির বৈভবে বাংলা সাহিত্য জগতে ভিন্নমাত্রা যোজনা করেছেন। মানুষকে তিনি দেখেছেন তার চরিত্রের বহিরাবরণ সারিয়ে। মানুষের বাহ্যমোড়ক ফেলে দিয়ে তাকে উপস্থিত করেছেন সাহিত্যে। তাঁর সাহিত্যের চরিত্রগুলো তাঁরই অভিজ্ঞতার অনুগামী হয়েছে। জগৎ জীবনের একরৈখিক শুভ্রতার চিত্রাঙ্কন জগদীশ গুপ্তের স্বভাব বিরোধী ছিল। তাই তিনি মানুষের নির্মমতা, কাদর্যতা, তার সীমাহীন লালসা, পরশ্রীকাতরা, সংগুপ্ত কদর্যবাসনা যা মানুষকে ক্লান্ত করে, করে ন্যুন, সেই সব বিষয়কেই জগদীশ গুপ্ত সাহিত্যের অনুষঙ্গী করেছেন। সেই সঙ্গে আর্থ-সামাজিক অসঙ্গতি, অমোঘ পরিণতি তথা নিয়তির যে দাসত্ব মানুষ করে চলেছে তা সমান্তরালে উঠে আসে তাঁর কথাসাহিত্যে। আর এসব তুলে আনতে চরিত্রের মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম পথে তাঁকে হাঁটতে হয়েছে। হেঁটেছেন নৈঃসঙ্গের নিরবতা নিয়ে একাকী। তিনি কখনো গল্পকে প্রাধান্য দেননি। চরিত্রই তার প্রথম এবং প্রধান অভিনিবেশ হয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্যের জগৎ আমাদের হতচকিত করে, পাঠক হোঁচট খায় অসঙ্গতির আলপনায়। তাঁর সাহিত্য বুকে ধারণ করে আছে সেই তথাকথিত অসঙ্গতিকে যা জীবন থেকে কিছুতেই খারিজ করা যায় না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কল্লোল যুগ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে যে বিপুল আলোড়ন তুলেছিল, সেই বৈশিষ্ট্যের ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জগদীশ গুপ্ত বাংলা সাহিত্যে চিরজীবী হয়ে থাকবেন।

ঋণ স্বীকার
আবুল আহসান চেীধুরী, জগদীশ গুপ্ত (জীবনী গ্রন্থ) , বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৮। নিরঞ্জন চক্রবর্তী (সম্পাদিত), জগদীশ গুপ্ত রচনাবলী, গ্রন্থালয় প্রায়ভেট লি.,কলকাতা, ১৩৮৫। তপন কুমার রায়, বাংলা সাহিত্য অনুধ্যান, গতিধারা, ঢাকা, ২০১৭

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!