Saturday , November 28 2020
You are here: Home / মতামত / করোনাকালে টিকা কর্মসূচি : মাহমুদুল করিম চঞ্চল
করোনাকালে টিকা কর্মসূচি : মাহমুদুল করিম চঞ্চল

করোনাকালে টিকা কর্মসূচি : মাহমুদুল করিম চঞ্চল


কোভিড ১৯ নামের অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি বিশ্ব। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। করোনাকালে বয়স্ক মানুষের পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, নতুন মা ও নবজাতকরা রূঢ় বাস্তবতার মুখে পড়েছে। ভাইরাস থেকে বাঁচতে নিজেকে সুরক্ষার সাথে সাথে চিকিৎসক, নিয়মিত চেকআপ, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নবজাতকের টিকাসহ জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। করোনা চিকিৎসার বেসামাল পরিস্থিতিতে মা ও শিশুর জরুরি চাহিদার কথা চাপা পড়তে বসেছে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল- ইউনিসেফের প্রতিবেদন বলছে, কোভিড ১৯ মহামারী শুরুর পর আনুমানিক নয় মাসের মধ্যে ১১ কোটি ৬০ লাখ শিশু জন্ম নেবে। এর মধ্যে বাংলাদেশে আনুমানিক ২৪ লাখ শিশুর জন্ম হবে। অনেক নবজাতকের টিকা দেয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির কারনে মা-বাবা নবজাতককে নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে যেতে সাহস করছেন না। লকডাউন বা চলাচলে নিষেধাজ্ঞার কারনে আবার অনেক টিকাদান কেন্দ্র চালু রাখা যাচ্ছে না। অথচ শিশুর জীবন রক্ষাকারী টিকা দেয়া জরুরি। মূলতঃ বাড়ির বাইরে গেলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়, স্বাস্থ্যকর্মীরা মহামারী নিয়ন্ত্রণ কাজে ব্যস্ত থাকা এবং টিকা সরবরাহে সমস্যার কারনে গোটা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ আশঙ্কা জানিয়ে বলেছে, করোনাকালে মা ও শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন অতিরিক্ত ছয় হাজার শিশুর মৃত্যু হতে পারে।
গত একশো বছরে টিকার কারণে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। ১৯৬০ সালে শুরু হয় হামের টিকা দেয়া। মামস ও রুবেলাকে ঠেকিয়েছে টিকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টিকা দেয়ার কারনে হাম ৮০ শতাংশ কমেছে। কয়েক দশক আগেও পোলিও ছিল মারাত্মক ব্যাধি। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও এখন জানে কবে, কখন বাচ্চাকে কোন টিকা দিতে হবে। তারা এও জানে, সময়মতো টিকা না নিলে শিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরিতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তবে ভাইরাসটির কারণে শিশুদের অন্য রোগের টিকা খাওয়ানো কার্যক্রম থমকে পড়েছে বিশ্বজুড়েই। পরিসংখ্যান বলছে, অন্ততঃ ৬৮টি দেশে শিশুদের টিকা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এসব দেশে থাকা এক বছরের কম বয়সের প্রায় আট কোটি শিশুর জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে। কিছু দেশে টিকাদান কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় তিন কোটি ৪৮ লাখ ও আফ্রিকায় দুই কোটি ২৯ লাখ শিশুকে টিকা দেয়া যায়নি। এতে নেপাল ও কম্বোডিয়ায় হাম, ইথিওপিয়ায় হাম, কলেরা ও হলুদ জ¦রের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। করোনাকালে প্রতিরোধযোগ্য রোগে বিশ্বে লাখ লাখ শিশু মারা যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে। আগে জন্মের পরপর বহু অজানা রোগে শিশুরা মারা যেতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ আর বাংলাদেশ সরকার টিকা কার্যক্রম চালিয়ে সে দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। সরকারি হিসেবে গত ২৪ বছরে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে ৭৩ শতাংশ। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি- ইপিআই’র আওতায় শিশুরা পোলিও, ধনুষ্টঙ্কার, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস-বি, হাম, রুবেলা ও এক ধরনের নিউমোনিয়ার প্রতিষেধক পেয়ে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য এসব টিকা নিশ্চিত করতে ছুটে চলেন মাইলের পর মাইল। দেশের ৩৭ লাখ শিশু এই টিকার আওতাভুক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও শিশুকে নিয়মিত টিকা দিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মা-বাবাদের আগ্রহ কমেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন চলছে। ওইসব এলাকায় শিশুরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না আসায় টিকা দেয়া উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের টিকা দেয়ার জন্য পরিস্থিতি ভালো হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কোভিড ১৯ বাস্তবতায় টিকাদান কর্মসূচি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২০ সালের শুরুতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে টিকাদানে লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কোভিড ১৯ সংকটের মুখে নয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী তিন কোটি ৪০ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকা দেয়ার লক্ষ্য অর্জনের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে টিকাদান ব্যবস্থার উন্নতি না হলে হাম ও অন্যান্য অসুখ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাদান বিভাগের প্রধান কেট ও’ব্রায়েন বিভিন্ন রোগ গর্জন দিয়ে আবার ফিরে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সরকারগুলো এখনই পদক্ষেপ নেয় তবে বিপর্যয় অনেকটাই সামাল দেয়া যাবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কোভিড ১৯ মহামারীর মধ্যেও নিয়মিত টিকা প্রদান নিয়ে নির্দেশনা জারি করেছে।
ইউনিসেফ বলছে, যতক্ষণ পর্যন্ত সামনের সারিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীরা যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, বিশেষ করে তাদের হাত ধুচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত টিকাদান থেকে বিরত থাকার কোন কারণ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে মা-বাবাদের উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমরা শিশুকে টিকা দেয়ার কাজটা চালিয়ে নিতে পারি।

মাহমুদুল করিম চঞ্চল, সিনিয়র সাংবাদিক

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!