Saturday , February 27 2021
You are here: Home / চট্টগ্রাম ও সিলেট / রামগতির চরগজারিয়ায় খোকন বাহিনীর অত্যাচারে তিন চরের মানুষ অতিষ্ঠ  
রামগতির চরগজারিয়ায় খোকন বাহিনীর অত্যাচারে তিন চরের মানুষ অতিষ্ঠ  

রামগতির চরগজারিয়ায় খোকন বাহিনীর অত্যাচারে তিন চরের মানুষ অতিষ্ঠ  

আমানত উল্যাহ,রামগতি (লক্ষ্মীপুর) : লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার দুর্গম চরগজারিয়া,বয়ারচর ও চরআব্দুল্লাহ।মেঘনার বুকে জেগে উঠা বিশাল এই তিনটি চরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা দস্যুবাহিনী।তার মধ্যে খোকন বাহিনী এখন এক ভয়াবহ আতংকের নাম।রাজনৈতিক সেল্টারেই গড়ে উঠে খোকন বাহিনীর মত এক দানব বাহিনীর শাসন।খোকন ওরফে”আল মামুন” প্রকাশ খোকন ডাকাত। নাম ছোট,বয়সও কম। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতি,অপহরণ,চাঁদাবাজি,নারী নির্যাতন,চরের জমি দখল ও বিক্রিসহ অভিযোগের ফিরিস্তি অনেক লম্বা।চার জেলায় তাঁর অপকর্মের সঙ্গী তিন ভাইসহ প্রায় দুইশ জনের মত।সবার হাতে রয়েছে অবৈধ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নির্যাতনের স্টিমরোলার।খোকনের চোখরাঙানিতে আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া।চরের জমি রক্ষায় খোকনকে একসময় মদদ দেওয়ার অভিযোগ ছিল সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন,চরআব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন মন্জু,চরআলগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন লিটন চৌধুরী,ও চরআলগী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক শাহেদ আলী মনু সহ রামগতির ক্ষমতাশীন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে।বর্তমানে এমপি মামুন ক্ষমতায় না থাকায় খোকন অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে।অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন কোন চোর ডাকাতের সাথে আমার সম্পর্ক নেই।মদদদাতা সাহেদ আলী মনু বলেন,আমি সব সময় খোকনের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে ছিলাম।খোকনকে সার্বিক সেল্টার দিয়েছেন সাবেক এমপি মামুন ও চরআলগী ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন লিটন চৌধুরী।
অভিযোগ রয়েছে মুলত থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেই নিরবে চালাচ্ছে খোকন তার শাসন।সুত্র জানায়,মৌলভীরচর,চরগজারিয়ার মাঝের চর ও তেলিরচর মিলে প্রায় ৫ হাজার কানী খাস জমিকে ঘিরে এই বাহিনীর উত্থান।খোকনের বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রায় ৭/৮ টি মামলা চলমান রয়েছে।গত ২০ জানুয়ারী বুধবার বিকেলে খোকনকে চরজব্বরের ভুইঁয়ারহাট এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ।আটকের একদিন পর আবার পরের দিন ২১ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার দুপুর ২ টার দিকে তাকে ছেড়ে দেন বলে জানযায়।এ পর্যন্ত খোকন বাহিনীর হাতে প্রায় ১১টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ।খোকনের পরিবারেই ৩০ জনের মত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। সুত্র জানায়,এইসব চরগুলোতে খোকনের এলাকাভিত্তিক বাহিনী রয়েছে।তার মধ্যে চরগজারিয়ার নেতৃত্বে আজিম ও মতিন মেম্বার। মৌলভীরচরে খোকন-ফখরুল দুই ভাই, কাদির-মেহরাজ-আরজু ওরফে আরজুন্নাহ ও হেলাল।টাংকি বাজারে জমির মেম্বার ও জহির।তেগাছিয়া এলাকায় ফরিদ মেম্বার।আলেকজান্ডারে বাবুল-সোহেল ও মন্জু চেয়ারম্যানের ভাই বাবুল। এছাড়া উপজেলা প্রশাসন-থানা পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সাথে সমন্নয়ের দায়িত্বে রয়েছে খোকনের বড় ভাই জমির মেম্বার।তবে এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবী করেন জমির মেম্বার।সুত্র জানায়,বাবা ইসমাইল মাঝির চার ছেলের মধ্যে খোকন দ্বিতীয়। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর
সুবর্ণচরের ভূঁইয়ারহাটে।কিন্তু কয়েক বছর ধরে খোকন ঘাঁটি পেতেছেন লক্ষ্মীপুরের
রামগতি উপজেলার দুর্গম চরগজারিয়া এলাকায়। এখান থেকেই রামগতি,নোয়াখালীর হাতিয়া ও
সুবর্ণচর, ভোলার মনপুরা ও তজুমদ্দিন এবং চট্টগ্রামের সনদ্বীপ উপজেলার মেঘনানদী
এলাকায় অনেকটা নিরবে চলছে খোকনের ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অপহরণের রাজত্ব। তার প্রধান আয়ের উৎসহ উপজেলার সবকটি মাছ ঘাট থেকে চাঁদা কালেকশন ও চরের খাস জমি দখল ও বিক্রি করা থেকে।বিশেষ করে রামগতির চরআবদুল্লাহ ইউনিয়নে ডাকাতি,অপহরণ,চাঁদাবাজি,চরের জমি
দখল ও বিক্রি এখন নিয়মিত ঘটনা। এসবই খোকন  ও চরআব্দুল্লার বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন মন্জু ও তাদের দুইশ অনুসারী মিলে করে বলে সূত্র জানায়। খোকন ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি)সহ প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী কয়েকজন ব্যক্তি। বর্তমানে খোকনের এই সব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সহযোগীতায় রয়েছে চরআব্দুল্লার চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন মন্জু।বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার রামগতি উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপিত হয়। এরপর পেরিয়ে গেছে বছরের পর বছর। কিন্তু সুফল মিলছে না কোন কিছুরই।খোকন নিরবে চালিয়ে যাচ্ছে সবধরনের অপকর্ম।এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে এসব এলাকার হাজারো মানুষ।খোকনের হুমকিতে চরআবদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো.বেল্লাল হোসেনসহ আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। সাবেক এই চেয়ারম্যান স্বপরিবারে থাকেন রামগতি উপজেলা সদর আলেকজান্ডারে।অভিযোগ রয়েছে খোকনের নেতৃত্বে এই সব চরে নতুন-নতুন গডফাদার সৃষ্টি করে একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখেন।খোকনের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে আওয়ামীলীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছাড়া।মেরে পেলার ভয়ে কেউ এই সব চরে যাচ্ছেনা।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোকনের অন্তত দুইশ জন অনুসারী রয়েছে।তাদের মধ্যে তার ভাই জমির মাঝি, ফখরুল ইসলাম ফখরা,অনুসারী ওয়াজ উদ্দিন, ফখরুল,মফিজ,আজিম,আবদুর রব মাঝি, ইউছুফ, মিরাজ,সাদ্দাম,রিয়াজ, আবু তাহের, মতিন,আরজু ওরফে আরজুন্নাহ, মনির, মাকসুদ, ছোট রিয়াজ, আবুল খায়ের, ভুট্টু, নাছির,সেলিম, মিজান,জাকের, জসিম, আলমগীর, ইব্রাহিম, হুমায়ুন প্রমুখ। তাদের দিয়েই চাঁদাবাজি, অপহরণ, নারী নির্যাতন, ডাকাতি,জমি দখল ও বিক্রি করা হয়।এদের প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর,নোয়াখালী ও ভোলার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের কাছে বিপুলসখ্যক দেশীয় অস্ত্র,অত্যাধুনিক ওয়ান শ্যুটার প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ রয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী। নিজেদের অবস্থান জানান দিতে প্রায়ই তারা দলবদ্ধভাবে প্রকাশ্যে চরে ও নদীতে মহড়া দেয়।চরআবদুল্লাহ ইউনিয়নবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রামগতির চরগজারিয়া,তেলিরচর, ঘাষিয়ার চর, দক্ষিণ ঘাষিয়ার চর ও মেঘনার বুকে জেগে ওঠা মাঝের চর,আব্দুল্লারচরে প্রায় এক হাজার একর সরকারি জমি রয়েছে।এসব চরের বেশির ভাগই খোকন ও তাঁর অনুসারীদের দখলে। চরগুলোতে কৃষকদের গরু ও মহিষ অবাধ বিচরণ করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।টাকা নিয়ে এলাকাভিত্তিক ‘ইজারা’দেন খোকন। চরআবদুল্লাহর ২ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ অংশের ১০০ একর জমি ইজারা বাবদ তিন লাখ, দক্ষিণ তেলির চরের ৩০০ একর (প্রতি একর তেরো শ) জমি থেকে তিন লাখ ৯ হাজার, দক্ষিণ ঘাষিয়ার চরের আবদুল মান্নানের কাছ থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন খোকন। চরগজারিয়া ও তেলির চরে কৃষকরা জমি চাষ করতে গেলে সাতটি পাওয়ার টিলার (ট্রাক্টর) থেকে ৭০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা সহ নানা অপরাধের গডফাদার তিনি।চরআবদুল্লাহ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন বাবুল, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব, ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি মিলন বেপারীসহ আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মী খোকনের হুমকিতে এলাকাছাড়া।এছাড়া চরগজারিয়া ছাত্রলীগের তৎকালীন  সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামকে হত্যা করেন খোকন বাহিনী। খোকন ও তাঁর লোকজনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগের সভাপতি মহিজল, যুবলীগ সভাপতি মিলন বেপারী, ইউপি সদস্য মিল্লাত হোসেন, আবদুল খালেক, আবুল হাসেম, এলাকার আবদুল হান্নান, সুমন হোসেন ও চরগজারিয়া গ্রামের শেখ ফরিদসহ প্রায় দুইশ থেকে আড়াইশ লোক কয়েক বছর ধরে এলাকাছাড়া।
এবিষয়ে অভিযুক্ত খোকনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।তবে তার বড় ভাই জমির মেম্বার এসব অভিযোগ সঠিক নয় দাবী করে বলেন,আমরা ব্যবসা বাণিজ্য করে চলি।এসবের সাথে এখন আমরা জড়িত নই।একটি কুচক্রী মহল আমাদেরকে সামাজিক ও মানষিক হয়রানি করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।
চরআব্দুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন মন্জু বলেন,আমি আওয়ামীলীগের চেয়ারম্যান।কোন চোর ডাকাতের সাথে আমার সম্পর্ক নেই।
রামগতি থানার (ওসি) সোলাইমান বলেন,
খোকন এখন অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।রাজনৈতিক মদদের কারণেই খোকন চরে জমি দখল,বিক্রি ও চাঁদাবাজি করেন।চরের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সজাগ রয়েছে।
রামগতির ইউএনও আবদুল মোমিন বলেন, চরাঞ্চল ও নদীতে মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কোন ধরনের অরাজকতা বরদাস্ত করা হবেনা বলে জানান তিনি।
সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,কোন চোর ডাকাতের সাথে আমার কখনোই সম্পর্ক ছিলোনা।রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে একটি চক্র আমাকে অপরাধীদের মদদ দেওয়ার অপবাদ দিচ্ছে। যা মোটেও সঠিক নয়।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!