Saturday , February 27 2021
You are here: Home / অন্যান্য / গড়াই থেকে সুন্দরবন : প্রবাহিত জলে দেখি স্বপ্ন
গড়াই থেকে সুন্দরবন : প্রবাহিত জলে দেখি স্বপ্ন

গড়াই থেকে সুন্দরবন : প্রবাহিত জলে দেখি স্বপ্ন

ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল (প্রাবন্ধিক, কবি, বহুগ্রন্থ প্রণেতা, নদী বিষয়ক গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।) : গড়াই বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন। গড়াই থেকে পাওয়া মিঠাপানি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রেখে বৃহৎ অঞ্চলের মানুষের উন্নত জীবিকার পথ দেখাবে। গবেষকদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এ সত্য সরকারি উদ্যোগের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আশার কথা হলো সম্প্রতি নদনদীকে জীবন্তসত্বা বলে রায় দিয়েছে বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্ট। এর ফলে অবৈধভাবে নদী দখল ও দূষণ ফৌজদারী অপরাধের আওতাভুক্ত প্রচলিত হত্যা মামলার মতই কার্যকর। বর্তমান সরকার সমগ্র দেশে নদনদী রক্ষার জোরালো ভূমিকা রাখছে। বেআইনী দখল ও দূষণ থেকে নদীকে রক্ষা করতে প্রায়ই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে, অবৈধ প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ চলছে। নদীর সীমানা নির্ধারণে চলছে আন্তরিক প্রচেষ্টা। যার ফলে মানুষের মধ্যেও নদনদী রক্ষার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। এরকম অবস্থায় গড়াই নদীকে তার আগের রূপে ফিরে আনতে পারলে বাঁচবে এ অঞ্চলের নদনদী, কৃষিসমাজ ব্যবস্থা, সুন্দরবনসহ নদীনির্ভর মানবসমাজ।
আমাদের দেশের নদীমালা আমাদের গৌরব। এই নদী আমাদের আবাসভূমি গড়ে তুলেছে, জনপদ সৃষ্টি করেছে, খাদ্য জুগিয়েছে, স্বাস্থ্য সম্পদে আমাদেরকে পূর্ণ করেছে। তাই বাংলাদেশের নদ-নদীর ইতিহাস এদেশেরই জনগোষ্ঠীরই ইতিহাস। আমরা জানি যে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের শতকরা ৭১.৪ ভাগই নদী-সমুদ্রের জল আর শতকরা ২৮.৬ভাগ স্থল। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডটি আবার সর্বশ্রেষ্ঠ। নদী মাতা যার, তার নাম বাংলাদেশ। নদীমাতৃক বাংলাদেশ। বিখ্যাত লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কবিতায় বলেছেন, ‘তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?’ আমরা এখানে বাংলাদেশের তেরশত নদীর প্রসঙ্গ পাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে আমাদের কতটা নদী বেঁচে আছে। কেমন আছে আমাদের নদীরা? নদ-নদীই বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের কোনো অংশকেই নদ-নদী বাদ দিয়ে কল্পনাই করা যায় না। আর বাংলাদেশের মনের ছবি এখানকার কবিরা চিরদিনই নদ-নদীকে অবলম্বন করেই ফুটিয়ে তুলেছেন। ছড়ায়, গানে, কিংবদন্তীতে, কাব্যে, মহাকাব্যে বাংলাদেশের রূপ যে নানাভাবে নদ-নদীর ছবি দিয়ে আঁকা, তা কারও অবিদিত নেই। এখানকার সাধারণ মানুষের মনের জাগরণই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যানুভূতির প্রকাশ ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে’ ফুটে উঠেছে। তাইতো রবীন্দ্রনাথ নদী নিয়ে বলেছেন, ‘পদ্মার বুকে নৌকা ভাসিয়ে যে বাংলাদেশকে দেখেনি, সে এ দেশ দেখেনি।’ প্রাচীন কাব্যে মনসার ভাসান অথবা চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যযাত্রা নদীপথের ছবিই তুলে ধরে বাঙালির মনে। সুতরাং বাংলাদেশকে চিনতে হলে এর নদ-নদীর সঙ্গে সম্যক পরিচয় থাকা আমাদের দরকার।
বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ছোটবড় নানা ধরনের নদী এমনভাবে প্রবাহিত হয়েছে যে, কেউ কেউ বলেন, অসংখ্য শিরা-উপশিরা-ধমনী যেমন মানবদেহে প্রবাহিত হয়ে মানুষটাকে সচল করে রাখে, তেমনি বাংলাদেশের নদীগুলিও দেশটাকে সজীব রেখে চিরসবুজের দেশে পরিণত করে রেখেছে। পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস দেখতে গেলে যেমন দেখা যায় বিভিন্ন বিখ্যাত নদীতীরে ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠেছে মানুষের বাসস্থান, নগর, বন্দর, সভ্যতা, তেমনি বাংলাদেশের হাটবাজার, বন্দর এবং বর্তমান শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের বিকাশ ক্রমান্বয়ে ঘটে চলেছে। শুধু তাই নয়, প্রবাহিত নদীগুলো যেমন একদিকে দেশের ভূ-প্রকৃতি, আবহাওয়া, জলবায়ু ইত্যাদিতে প্রভাব ফেলছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রভাব ফেলছে মানুষের আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশেও। এসব প্রসঙ্গ আমাদের প্রিয় নদী গড়াইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাস্তবিকই বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূ-ভাগই নদ-নদীর দ্বারাই গঠিত। অর্থাৎ প্রবাহ বাহিত পলিমাটির স্তরে স্তরে অবক্ষেপণই এই ভূ-ভাগকে সমুদ্র থেকে গেঁথে তুলেছে। উত্তরে হিমালয়ের কোল থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সুন্দরবন অঞ্চল পর্যন্ত নল পুঁতে দেখা গিয়েছে, দু’তিন হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত শুধুই স্তরে স্তরে বালুকা আর নানা শ্রেণির মৃত্তিকা পরপর সাজানো রয়েছে নিচে আদিম প্রস্তরের ভিত্তির ওপর। এই স্তরীভূত বালি আর মাটিগুলি যে নদ-নদী প্রবাহে বাহিত হয়েই এসেছে আর যুগ যুগ ধরে সমুদ্রগর্ভে জমা হয়ে ক্রমে বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চলকে সৃষ্টি করেছে, তা বুঝতে মোটেই কষ্ট হয় না। নদী প্রসঙ্গে আলোচনায় দেখা যায়, গঙ্গা-পদ্মাই বাংলাদেশের প্রধান মেরুদণ্ড। বাংলাদেশের মাঝখান দিয়ে উত্তর-পশ্চিম থেকে পূর্ব-দক্ষিণে এবং ক্রমশ দক্ষিণে গঙ্গা বা পদ্মা প্রবাহিত হচ্ছে, আর অন্য প্রায় সমস্ত নদীগুলো এই গঙ্গা বা পদ্মার হয় উপনদী অথবা শাখা নদী। শুধু পশ্চিমবঙ্গের সুবর্ণরেখা এবং বাংলাদেশের কর্ণফুলী নদী স্বাধীনভাবে সমুদ্রে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের ছোটনাগপুর উপত্যকার উৎস থেকে উৎপন্ন নদ-নদীগুলো গঙ্গার শাখা ভাগীরথী-হুগলী নদীতে এসে মিশেছে। এইরূপে, মোটের মাথায়, প্রধানত গঙ্গা নদীকেই অবলম্বন করে বাংলার সমস্ত নদ-নদী প্রবাহিত হচ্ছে।
গঙ্গা-পদ্মাকে মেরুদণ্ড করে যেসব নদ-নদী বাংলাদেশে প্রবাহিত, বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নানা শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। ভূগোলবিদ্যায় এসব নদ-নদীকে প্রধানত দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয় : ১) উপনদী ২) শাখানদী। এই হিসাবে উত্তরবঙ্গের সমস্ত নদী গঙ্গা-পদ্মার উপনদী। মানচিত্রে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পরপর সাজানো হিমালয় এইসব প্রধান উপনদীর নাম : মহানন্দা, পুনর্ভবা, আত্রাই, যমুনা-নাগর সংযুক্ত হয়ে বরাল নদী এবং করতোয়া। মহানন্দা-পুনর্ভবা ছাড়া অপর নদীগুলো ব্রহ্মপুত্র নদে পড়ে গঙ্গাপ্রবাহে মিলিত হয়েছে। তেমনি দার্জিলিং-জলপাইগুড়ির খ্যাতনামা নদী তিস্তা বা ত্রিস্রোতাও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র তার বিশালতার জন্যে স্বতন্ত্র নদ হিসেবেই পরিচিতÑ কিন্তু তাকে গঙ্গা-পদ্মার উপনদীরূপে গণ্য করতে দোষ নেই। ব্রহ্মপুত্র বর্তমানে যে খাতে প্রবাহিত হচ্ছে তার স্থানীয় নাম আবার যমুনা। এই যমুনা আবার পূর্বোল্লেখিত দিনাজপুর জেলায় প্রবাহিত আত্রাই-এর সহযোগী যমুনা থেকে পৃথক নদী। ঢাকা জেলায় ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন খাত লক্ষ্যা বা শীতলক্ষ্যা নামে পরিচিত। মেঘনা ও গোমতী নদী পূর্বাঞ্চলের পাহাড় থেকে নির্গত হয়ে পদ্মায় মিশেছে।
বাংলাদেশের উত্তর দিকে হিমালয় পর্বত আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। পূর্ব দিকে খাসিয়া, জয়ন্তিয়া, ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের পাহাড় ঘেরা অঞ্চল। আর পশ্চিম সীমান্তে খরস্রোতা গঙ্গা (পদ্মা) মহানন্দা, রাজমহলের পাহাড়, বীরভূম, সাঁওতাল পরগণা ও ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলরাজি। এ-সকল সীমারেখার মধ্য দিয়ে বহু নদী বিধৌত বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ ও সমতলভূমি। বাংলাদেশের নদীগুলো এদেশের নদীকেন্দ্রিক মানবসমাজ তথা সমগ্র বাংলাদেশের আর্থিক জীবনকে বিশিষ্টতা দান করেছে। বাংলাদেশের ভাঙাগড়া, সভ্যতা-সংস্কৃতি-সাহিত্যের সঙ্গে গঙ্গা (পদ্মা) নদীর সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। এ-নদীকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের রহস্যের শেষ নেই। বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশে পদ্মা নামে পরিচিত। নদী একই, নাম ভিন্ন। মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহীর কাছে মাথাভাঙ্গা নদী যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে গঙ্গা নদী বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারপর গঙ্গা নাম নিয়েছে পদ্মা। এরপর পদ্মা পূর্বদিকে প্রবাহিত হওয়ার প্রথমে গোয়ালন্দের কাছে যমুনায় মিশেছে। পরে চাঁদপুরের (কুমিল্লা) কাছে মেঘনার সঙ্গে মিশে গিয়ে মেঘনা নাম ধারণ করে অবশেষে নিজেকে বিলীন করেছে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশিতে। রাজশাহী জেলার কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত নদীর নাম প্রাচীন সাহিত্য ও মানচিত্রে গঙ্গা নামেই পরিচিত। মুসলমান ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ, ভূগোলবেত্তা জোয়া দা বারোস এবং গ্যাসটালদির অংকিত মানচিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড় নগর গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে দেখা যায় গঙ্গা নদী গৌড় নগর হতে ২৫ মাইল দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে পড়েছে। ভূগোলবিদ ফান ডেন ব্রোক এর মানচিত্র থেকে এই পরিবর্তনের আরো নির্দেশ পাওয়া যায়। বর্তমানে পদ্মা নদী নামে পরিচিত গঙ্গা নদীর পূর্ব প্রবাহ অতীতে বেশ কয়েকবার তার গতিপথ পরিবর্তন করেছিল। ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের (মৃ. ১৬০৩) বর্ণনা হতে জানা যায় যে, ‘বারকাবাদ সরকারের (রাজশাহী জেলা, বগুড়া জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং মালদহ জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশ) কাজীর হাটার নিকট গঙ্গা নদী দুইটি স্রোতে প্রবাহে বিভক্ত হইতো একটি স্রোত প্রবাহ পূর্বদিকে প্রবাহিত হইয়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিকট সাগরে মিলিত হইতো।’ তাহলে বোঝা যায় পদ্মা নদী নামে পরিচিত গঙ্গা নদীর অতীত প্রবাহ ভিন্ন পথে চলতে চলতে ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। গঙ্গা প্রবাহ রামপুর বোয়ালিয়া (রাজশাহী শহর) পাশে রেখে সামনে প্রবাহিত হয়ে চলনবিলের (পাবনা) মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বর্তমান ধলেশ্বরী ও বুড়ীগঙ্গা নদীদুটির গতিপথে প্রবাহিত হয়ে যেতো। ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গা নদী ফিরিঙ্গি বাজারের নিকট মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হতো।
বুড়িগঙ্গা নদী যে গঙ্গা নদীর প্রবাহে জন্ম তা তার নামে বোঝা যায়। বাংলাদেশের দুটি বিখ্যাত শহর বন্দর নগরকে কেন্দ্র করে যে গঙ্গা প্রবাহিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটুকু নিঃসঙ্কচিত্তে বলা যায় যে, গঙ্গা নদী প্রবাহে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বর্তমান বাংলাদেশের জীবন যাত্রার অন্যতম নগরী ও রাজধানী গড়ে উঠেছিল। এবং পরবর্তীতে গঙ্গা (পদ্মা) বিভিন্ন রূপ ধারণ করে বাংলাদেশের অসংখ্য শহর-বন্দর-নগর গড়ে তুলতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছে। এ-প্রসঙ্গে ইংরেজ পর্যটক র্যারলফ ফিচ (১৫৫০-১৬১১) এর ভ্রমণবৃত্তান্তে জানা যায় তৎকালীন সময়ে ‘তিনি শ্রীপুর হইতে গঙ্গা নদী পথে সন্দ¡ীপ ও পেটো গ্রান্ডি বা চট্টগ্রাম বন্দর হইয়া পেগু যান।’ গঙ্গা (পদ্মা) নদীর মোট দৈর্ঘ্য ২৫২৮ কিলোমিটার। পশ্চিমে ভাগীরথী-হুগলী, উত্তরে আর পূর্বে পদ্মা-মেঘনা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এই ত্রিভুজাকৃতি ভূ-খণ্ডই গঙ্গার ব-দ্বীপ। আয়তনে পৃথিবীতে এত বড় ব-দ্বীপ আর দেখা যায় না। গঙ্গা অববাহিকার আয়তন প্রায় ৯,০৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার। তন্মধ্যে- ৩১০০ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশে অবস্থিত। পদ্মা নদীর পানি সারা বাংলাদেশের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জায়গায় সেচকাজের জন্যে ব্যবহৃত হয়। এ-নদীর পানি দ্বারা শুস্ক মৌসুমে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর এবং যশোহর অঞ্চলের কৃষিকাজে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করে এ-অঞ্চলের মানবসমাজের জন্যে তথা বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারার নিকট গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কুষ্টিয়া এবং যশোহর জেলার প্রায় ১,৪১,৭০০ হেক্টর জমিতে সেচ ও কৃষি সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পদ্মার উপনদী হল মহানন্দা, ট্যাঙ্গন ও পূনর্ভবা। আর শাখা নদী গুলো হচ্ছে- ইছামতি, গড়াই, মধুমতি, কুমার, বলেশ্বর, হরিণঘাটা, অর্পণগাছিয়া, আড়িয়ালখাঁ নদ, গজারিয়া, নরনিয়া, কাতলি, আতাই, আঠারবাঁকী, ব্যাং, নওভাঙ্গা, চন্দনা, বাণকাণা, কালীগঙ্গা, মুজুদখালি, মারুফ, চিত্রা, মালুয়ার খাল, মাথাভাঙ্গা, সালকী, ইছামতী, যমুনা, ফটকী, বারাসিয়া, ভৈরব, হরিহর, কালিন্দী প্রভৃতি নদী।
তাহলে দেখা যাচ্ছে সুপ্রাচীনকাল থেকেই পদ্মা নদীর উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। গঙ্গার প্রধান ধারা প্রাচীন গৌড় নগরীর প্রায় ত্রিশ মাইল দক্ষিণে বিভক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী আর বাংলাদেশে পদ্মা নামে প্রবাহিত। পদ্মার বিচিত্র গতি পরিবর্তনের ফলে এ জেলার আয়তন একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। চলার পথে এই নদী অসংখ্য শাখা, প্রশাখা, খাল, কোল ইত্যাদি রেখে গেছে। একদা পদ্মা ছিল কুষ্টিয়ার প্রাণ। এ জেলাসহ বাংলাদেশের সাতটি জেলার মানুষ পদ্মার জলধারার ওপর নির্ভরশীল। কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবাহী পদ্মা নদী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। ভাগীরথী ও যমুনার মধ্যবর্তী গঙ্গার নিম্নখাতই পদ্মা নদী। হিমালয় পর্বতমালার নন্দদেবী গিরি থেকে উদ্ভূত গঙ্গা নদী ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পূর্বে দুই ধারায় বিভক্ত হয়। এক শাখা ভাগীরথী নামে ভারতের হুগলীর পাশ দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব মুখে গোয়ালন্দ পর্যন্ত প্রায় ২,২০৫.৭০ কিলোমিটার (প্রায় ১,৩৭০ মাইল) প্রবাহিত হওয়ার পর যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অনুমান করা হয় যে, আদিতে গঙ্গা নদী ভাগীরথীর খাতে প্রবাহিত হতো। এ নদী বারবার গতি পরিবর্তন করে ক্রমশ পূর্বদিকে সরে যায়। পদ্মা নদী রাজশাহী জেলার শিবগঞ্জের দক্ষিণ পাশ দিয়ে পূর্ব মুখে চারঘাট অতিক্রম করার পর কুষ্টিয়া ও রাজশাহী জেলার মধ্যবর্তী সীমান্ত বরাবর কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর, ভেড়ামারা, ঘোড়ামারা, তালবাড়িয়া, চোয়াপাড়া, রামনগর, পীরপুর, বল্লভপুর প্রভৃতি স্থান পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। বর্তমান কুষ্টিয়া সদর উপজেলার চর ভবানীপুর থেকে পাবনা জেলার হেমায়েতপুর পর্যন্ত এর প্রস্থ প্রায় ১১.২ কিলোমিটার (৭ মাইল) এবং ভেড়ামারা থানার হার্ডিঞ্জ সেতুর নিকটে নদীর গভীরতা প্রায় ৩৬.৭ মিটার (১২০ ফুট) এর প্রস্থ প্রায় ২.২ কিলোমিটার (৭৫০০ ফুট)। অপর পক্ষে মিরপুর থানার রানাখড়িয়া ও পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানা রূপপুরের মধ্যস্থলে নদীর সর্বনিম্ন গভীরতা প্রায় ১৮.২ মিটার (৬০ ফুট)। বর্ষাকালে স্রোতের প্রখরতার জন্য ভেড়ামারা উপজেলার রায়টা থেকে কুষ্টিয়া সদরের চরভবানীপুর পর্যন্ত প্রায় ৪৮.০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) নদীর পাড় ভেঙ্গে থাকে। নদীর পাড় রক্ষার জন্য এখানে মাটির বাঁধ দেয়া হয়েছে। বর্ষাকালে পার্বত্যাঞ্চল থেকে বিশাল জলরাশি পদ্মার খাত দিয়ে প্রবলবেগে নিম্ন দিকে ধাবিত হয়ে যমুনা ও মেঘনা নদীর জলরাশির সঙ্গে মিলিত হয়। ১৯৭৪ সালে ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ সমাপ্তির পর প্রত্যেক খরা মৌসুমে গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহকে ভাগীরথী খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদ্মা নদীর পানি বিপুল পরিমাণে হ্রাস পায়। তখন পদ্মার বিশাল বুক জুড়ে বালিয়াড়ি আর চর সৃষ্টি হয়। এ সময় নদীর মধ্যভাগে কেবলমাত্র একটি অগভীর ক্ষীণ ধারা দেখা যায়। বৎসরের অধিকাংশ সময় সচল প্রবাহের অভাবে প্রতি বৎসরই ভরাট প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এ ছাড়াও এর প্রভাবে উত্তরবঙ্গে পানির সংকট দেখা দেয়, দক্ষিণবঙ্গে নদীগুলোতে সামুদ্রিক লোনা পানি প্রবেশ করে এবং পদ্মা নদীতে ইলিশ মাছের প্রজনন বিঘ্নিত হয়। অপরপক্ষে পাহাড়ী ঢল ও বন্যার পানির বিপজ্জনক চাপের প্রতিক্রিয়া ঠেকানোর জন্য ভারতের ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বিশাল জলরাশি বের করে দেয়ায় বাংলাদেশে পদ্মার উভয় তীরের বিরাট এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে প্রতি বৎসরই বহু ঘর বাড়ি, জানমাল এবং ফসল বিনষ্ট হয়ে যায়।
কুষ্টিয়া পদ্মা প্রবাহচুম্বিত জেলা। এ জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা (কুষ্টিয়া, কুমারখালী, মিরপুর, গাংনী, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, দামুরহুদা, জীবননগর প্রভৃতি এলাকার বিভিন্ন স্থান) জুড়ে বিস্তৃত পুরাতন প্লাবনভূমি বা গঙ্গার পুরাতন বদ্বীপ অঞ্চল। সমতল কিংবা সামান্য ঢালু, ব্যাপক ডাঙ্গা জমি, কিছুটা আঁকা বাঁকা ভরাট নদীখাত ও বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলসহ সমস্ত এলাকাটি প্রায় সমতল থেকে কিছুটা বন্ধুর। কতিপয় অপ্রশস্ত ডাঙ্গা ও ভরাট নদীখাতের কাছাকাছি অবস্থানের ফলে কোনো কোনো এলাকার জমি বেশ অসমতল ও ছোট বড় কিছু বাঁওড় নিয়ে গঠিত। ডাঙ্গা জমির নিচের অংশ, ভরাট নদীখাত ও বিল জমি বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে ১ থেকে ৬ বা ৭ মাস পর্যন্ত ডোবা থাকে। বিলের গভীরতম অংশ শুকনো মৌসুমেরও অধিকাংশ সময় ভেজা কিংবা ডুবে থাকে। এই এলাকা মেহেরপুর, গাংনী, দামুরহুদা, চুয়াডাঙ্গা, মিরপুর, কুষ্টিয়া, কুমারখালী, খোকশা বিভিন্ন স্থান) মূলত পুরাতন প্লাবনভূমিরই অংশ। আঠার শতকের শেষভাগে ব্রহ্মপুত্র নদের মূলস্রোত বর্তমান যমুনাখাতে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের উজানে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়। তখন সাময়িকভাবে পদ্মার উজান খাতে আকস্মিক জলাবদ্ধতা ঘটে। ফলে পদ্মার ডান তীরের শাখা নদীগুলো দিয়ে প্রবল বেগে পানি নেমে দু’কূল ছাপানো বন্যা ঘটায়। ছোট্ট গড়াই নদী তখন বেশ চওড়া ও গভীর হয়ে কুমারকে অতিক্রম করে দক্ষিণাভিমুখী হয়। এ সময় ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার, গড়াই ইত্যাদি নদীগুলির কাছাকাছি পুরাতন প্লাবনভূমির ওপর প্রচুর নতুন পলি পড়ে। এলাকাটির জমির অবস্থা অনেকাংশে নতুন প্লাবনভূমির মতো। এসব অঞ্চল প্রকৃতপক্ষে অনাবৃত পুরোনো পলিরই অংশ।
এই যে গঙ্গা-পদ্মা প্রবাহ আর তার ইতিহাস, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে শ্রেষ্ঠ এক শাখা নদী গড়াই। গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবেত্তা টলেমী (খৃষ্টপূর্ব ৯০Ñখৃষ্টপূর্ব ১৬৮) আন্তঃগাঙ্গেয় ভারতবর্ষের নকশায় তদানীন্তন গঙ্গা প্রবাহের সাগর সঙ্গমে পাঁচটি মুখের উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে কম্বরী খাঁন নামক মুখটি প্রকৃতপক্ষে গড়াই নদী বলে কেউ কেউ মনে করেন। রামায়ণে গঙ্গার যে সাতটি ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তন্মধ্যে হলুদিনী ও আড়িয়াল খাঁ বলে অনুমিত হয়। গড়াই হলো এ অঞ্চলের লাইফ লাইন নদী। এ নদীর নতুন ডাঙ্গায় পদ্মা নদীর দুপাশের ৩ থেকে ৭ কিলোমিটার পর্যন্ত চওড়া চরাঞ্চল (দৌলতপুর, ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া ও কুমারখালীর বিভিন্ন স্থান) নিয়ে সক্রিয় প্লাবনভূমি গঠিত। উঁচুনিচু ডাঙ্গা, নিচু ভরাট নদীখাত এবং মজা ও সচল নদীর সমাবেশে এলাকাটি সব মিলিয়ে বেশ অসমতল। এখানে শুকনো মৌসুমে নদীর পানি এলাকার পরিমাণ ১৭ শতাংশ মাত্র। বর্ষাকালে অধিকাংশ এলাকাই প্রায় ৩ থেকে ৫ মাস পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে। নদীর তীরে ডাঙ্গা ও নতুন চর পড়া এই দুই-ই এখানকার অব্যাহত প্রক্রিয়া। গঙ্গা বা কোনো বৃহৎ জলমগ্ন স্থান থেকে জেগে ওঠা এ অঞ্চল একদা অসংখ্য বেগবতী দূরন্ত নদ-নদী আকীর্ণ ছিল। নদী বিধৌত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের এই নদীগুলোর অসংখ্যবার গতিপথ পরিবর্তন ও ভাঙ্গাগড়ার জন্য এ জেলার ভূপ্রকৃতির ও নদনদীর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, কুমার, ভৈরব প্রভৃতি নদীর যাত্রাপথ থেকে এই ক্রম-পরিবর্তনের পরিচয় পাওয়া যায়। পূর্বের গতিশীল বিশালকায় প্রমত্তা নদীগুলো সাম্প্রতিককালে প্রাণহীন নির্জীব ক্ষীণ স্রোতধারায় পর্যবসিত। এ জেলার নদীগুলোর পূর্ব ঐতিহ্য আজ লুপ্তপ্রায় ও মরণোন্মুখ। এমন পরিস্থিতির ভিতরে গড়াই হলো এই অঞ্চলের সমস্ত শাখা নদীর পানির প্রধান উৎসমুখ। গড়াই নদীটি কুষ্টিয়া জেলার উত্তরে হার্ডিঞ্জ সেতুর ১৯ কিলোমিটার ভাটিতে তালবাড়িয়া নামক স্থানে উৎপত্তি হয়েছে। গড়াই নদীর তীরে কুষ্টিয়া শহর বাঁধ ও কুমারখালী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। গড়াই সংস্কারের অভাবে ক্রমশ মৃতপ্রায় নদীতে পরিণত হচ্ছে। এ নদী সম্পর্কে আরো যা জানা যায় তাহলো, কুষ্টিয়া সদরের উত্তরে মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়ার পূর্ব পাশে পদ্মা নদী থেকে গড়াই নদীর উৎপত্তি হয়েছে। অতপর এ নদী কোতোয়ালী, কুষ্টিয়া সদর, জয়নাবাদ, কাশিমপুর, সাওতা, চাপড়া, কুমারখালী, খোকশা প্রভৃতি স্থানের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে অগ্রসর হয়ে কুষ্টিয়া সীমানা অতিক্রম করেছে। একসময় এই গড়াই নদী দিয়েই গঙ্গার প্রধান ধারা প্রবাহিত হতো। নদীটি কুষ্টিয়া জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গণেশপুর নামক স্থানে ঝিনাইদহ জেলায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে চাদর নামক গ্রাম দিয়ে রাজবাড়ী জেলায় প্রবেশ করেছে। পদ্মার শাখা গড়াই নদী রাজবাড়ি জেলার দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর ঝিনাইদহ জেলা-রাজবাড়ী জেলা, মাগুরা জেলা-রাজবাড়ী জেলা এবং মাগুরা জেলা-ফরিদপুর জেলার সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নদী নামে নড়াইল ও বাগেরহাট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এখানে উৎপত্তির পর কুষ্টিয়ার হাটশহরিপুর ইউনিয়নের ভিতর দিয়ে তার প্রবাহপথে গমন করেছে। নদীটি প্রবাহপথে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে মধুমতি নদীতে পতিত হয়েছে। গড়াই প্রসঙ্গে আরো যা জানা যাচ্ছেÑ গড়াই হলো কুষ্টিয়ার বৃহত্তম নদী। এটি আবার কুষ্টিয়ার আপন নদী। আগে গড়াইয়ের উৎস মুখ শিলাইদহের নিকটে কুঠিবাড়ির পাশে ছিল বলে জানা যায়। পদ্মা নদী উত্তর দিকে সরে যাওয়ায় তালবাড়িয়া থেকে কুষ্টিয়া শহরস্থ কুঠিবাড়ির মসজিদ পর্যন্ত বড় কোল (মরাখাত) ফেলে যায়। ডাকদহ নদীর মুখ থেকে এই কোল দিয়ে পদ্মার স্রোত প্রবাহিত হয়ে গড়াইয়ের নতুন মুখের সৃষ্টি হয়। কোল ভেঙ্গে গড়াই তৈরি হওয়ার সময় দুই পাড় ভেঙ্গে যায়। তখন এর অবস্থা এতো শোচনীয় হয়ে যায় যে নদীতে হেঁটে পার হওয়া সম্ভব হয়। গড়াইয়ের বুকে এখন বিরাট বিরাট চর। গড়াই নদী-মধুমতি নদীর গতিপথ আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ। গড়াই নামে ৮৯ কিলোমিটার মতান্তরে ৮৬ কিলোমিটার এবং মধুমতি নামে ১৩৭ কিলোমিটার এবং বলেশ্বর নামে ১৪৬ কিলোমিটার অর্থাৎ নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ৩৭২ কিলোমিটার। গড়াই নদীর বহু শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তন্মধ্যেÑ কুমার, কালীগঙ্গা, ডাকুয়া, বুড়ি গড়াই, বুড়িশাল ইত্যাদি। জেলার অনেক ছোট ছোট নদী ডাকুরি, ছিমলা, কাজলা, হেউটিয়া, রাধানগর, ছয়ঘরিয়া, মরা গড়াই, ভাইমারা, ছোট ও ধড়কা নদী আজ কালের গর্ভে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। গড়াই নদী নবগঙ্গা, চিত্রা, কপোতাক্ষ সাতক্ষীরার যমুনা, গোলঘেসিয়া, এলেংখালী, আঠারোবাঁকি প্রভৃতি নদী সংস্পর্শে এসেছে। আমরা দেখতে পাই গড়াই, মধুমতি, বলেশ্বর ও হরিণঘাটাÑ এই চারটি নদীর মূল নদী হচ্ছে গড়াই। স্থানভেদে এর বিভিন্ন নাম হয়েছে। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার অন্যতম শাখা নদী। বাংলাদেশের দক্ষিণ দিকে এই নদী বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার সীমানা চিহ্নিত করেছে। গড়াই এখানে বলেশ্বর ও হরিণঘাটা নামে পরিচিত। এক সময় পদ্মার প্রধান ধারা এই পথে প্রবাহিত হতো। গড়াই নদী তার পথচলায় বারাসিয়া নদীকে সঙ্গে পেয়েছে। এই বারাসিয়া পরে মধুমতি নাম ধারণ করেছে। বারাসিয়ার তীরে ফরিদপুরে ভূষণা বিখ্যাত স্থান। ভূষণায় বাংলার বার ভূঁইয়ার প্রতাপাদিত্য রাজত্ব করতেন। বারাশিয়া, কুমার, চন্দনা গড়াইয়ের উপনদী। নদীটি কুষ্টিয়ার অদূরে পদ্মা থেকে বের হয়ে দক্ষিণে যশোর ও ফরিদপুর জেলার সীমান্ত দিয়ে খুলনা জেলায় প্রবিষ্ট ও বরিশাল জেলার সীমানা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত। এক সময় গড়াই দিয়ে গঙ্গার প্রধান ধারা বয়ে যেত। রবীন্দ্রনাথ যে নদীকে গৌরী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। গড়াই বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী।
ঐতিহাসিক দিক থেকে গড়াই খুব পুরোনো নদী। এ নদীর ইতিহাসে দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে শুকনো মৌসুমে গড়াই নদীর উৎস মুখ শুকিয়ে যায়। পরবর্তী বছরে স্বেচ্ছাশ্রম ও ড্রেজারের মাধ্যমে উৎসমুখ গভীরভাবে খননের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর অধিকাংশ গতিপথেই গড়াই এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর উৎপত্তিস্থল হতে কামারখালী পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে নৌকা ও অন্যান্য ছোট নৌযান চলাচল করতে পারে, কিন্তু শুকনো মৌসুমে এই অংশ অনাব্য হয়ে পড়ে। কামারখালী হতে নিম্নাঞ্চল মোটামুটি নাব্য থাকে। প্রায় সারাবছর নৌ-চলাচল সম্ভব হয়। এই নদীতে গড়াই রেলওয়ে ব্রীজ, কামারখালী, ভাটিয়াপাড়া, আঠার বাঁকী, নাজিরপুর এবং রায়েন্দাতে পানি সমতল উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। গড়াই রেলওয়ে সেতুতে সর্বোচ্চ ১৩.৬৫ (১৯৮৮) মিটার এবং সর্বনিম্ন ৩.০৩ মিটার পানি সমতল পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে গড়াই রেলওয়ে সেতু এবং কামারখালীতে পানি প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। সর্বোচ্চ ৭৯৩২ ঘন মিটার প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহ লক্ষ্য করা গেছে। উৎস মুখ শুকিয়ে যাবার ফলে কোনো কোনো সময় প্রবাহ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। উৎস মুখ হতে বড়দিয়া পর্যন্ত এর গড় প্রস্থ ৪৫০ মিটার। এর পরে নদীটির বিস্তার বাড়তে থাকে এবং নিম্নাঞ্চলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় গড়ে তিন কিলোমিটার।
গড়াই অন্যতম দীর্ঘ নদীও বটে। এর অববাহিকাও বিস্তীর্ণ। কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে এইসব এলাকার সেচ, কৃষির উন্নতি এই নদীর ওপরেই নির্ভরশীল। গড়াই গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের প্রধান সেচ খাল। কুষ্টিয়া জেলার চাপড়া নামক স্থানে হতে মাগুরা জেলার নাকোল পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য গড়াই নদীর প্রায় সমান্তরালভাবে খনন করে সেচ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। গড়াই প্রবল ভাঙ্গনপ্রবন নদী। এর ভাঙ্গনের ফলে এক সময় কুষ্টিয়ার বিখ্যাত রেনউইক কারখানা, গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প অফিস এবং কুষ্টিয়া শহরের বাণিজ্যিক এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাছাড়া কুমারখালী বন্দর এবং জানিপুর বাজারও ভাঙনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড উপযুক্ত গ্রোয়েন নির্মাণের মাধ্যমে উল্লিখিত শহর বন্দর সমূহ রক্ষা করার ব্যবস্থা করে। এক সময় কামারখালী হতে মোহনা পর্যন্ত এই নদীতে জোয়ার-ভাটা হতো। কিন্তু এখন আর সে জোয়ারভাঁটা খেলে না। গড়াইয়ের পাড় ঘেঁষে কুষ্টিয়া, কুমারখালী, জানিপুর, নাকোল, ছেউড়িয়া, গণেশপুর, কাতলাগাড়ী, খুলুমবাড়ি, লাঙ্গলবন্দ, শাচিলাপুর, নাকোল, লোহাগড়া, পাংশা, বালিয়াকান্দি, বোয়ালমারী, কাশিয়ানী, ভাটিয়াপাড়া, নাজিরপুর, কচুয়া, পিরোজপুর, স্মরণখোলা, মঠবাড়িয়া, পাথরঘাটা এবং মোড়লগঞ্জ প্রভৃতি নদীতীরের নামকরা জায়গা। এসব জায়গায় এক সময় নদী দিয়ে যাতায়াত করা হতো। গড়ে উঠতো নদীবন্দর। নিয়মিত এসব স্থানে নদীকেন্দ্রিক হাটবাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জমে উঠত হরেক রকম বিকিকিনি। নদীপাড়ে গড়ে উঠত ছোট ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান। সেগুলো এখন কালের ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মা-গড়াই রবীন্দ্র-স্মৃতি বিজড়িত নদী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কুষ্টিয়া শহর হতেপ্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে এখানকার নদী তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত। বাউল সম্রাট লালন শাহ-এর মাজার এই নদী তীরে ছেউড়িয়া গ্রামে অবস্থিত। মহাত্মা সাঁইজীর জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অসাধারণ। তাঁর বহু গানে, ভাবনায়, দর্শনে, চেতনায় রয়েছে নদী অনুষঙ্গ। সাঁইজীর দীর্ঘজীবনে কুষ্টিয়ার তিনটি নদীর প্রভাব বিশেষভাবে স্মরণীয়Ñপদ্মা-গড়াই-কালি নদী। তৎকালীন সময়ে তাঁর আখড়া বাড়িতে শিষ্য, সেবক, সেবাদাসীদের আগমন ঘটতো এইসব নদীপথেই। লালনের গান নদী ব্যতিরেকে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট লেখক, বিষাদ-সিন্ধুর অমর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন-এর স্মৃতিধন্য নদী গড়াই। বাংলার বিখ্যাত লেখক রায় বাহাদুর জলধর সেন-এর বাড়ি এখানকার নদী তীরবর্তী কুমারখালীতে অবস্থিত। নদীর গতি পরিবর্তনের ফলে তাঁর বাড়িটির অংশবিশেষ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ , গ্রামবার্তা সহায়িকার প্রকাশক, লেখক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতির সঙ্গেও আছে এ নদী। আবার গড়াই যেখানে উৎপত্তি লাভ করেছে তারই পাশের গ্রাম হরিপুরে জন্ম নিয়েছিলেন দক্ষিণবঙ্গের বিখ্যাত কবি আজিজুর রহমান। এর বাইরেও আরো বিখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সংস্কৃতানুরাগী, রাজনীতিবিদসহ বিদগ্ধ পণ্ডিতমনীষীরা এই নদীপাড়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
আমরা গঙ্গা-পদ্মার সুদীর্ঘ ইতিহাসের ভিতর দিয়ে গড়াই নদীর ইতিহাস মোটামুটি তুলে ধরায় সচেষ্ট হয়েছি। যখন এ নদীর চিত্র আমরা তুলে ধরছি তখন সে নদীর দুঃখের দিন চলছে, ধুঁকছে নদী, পানিবিহীন সময় বইছে তার বুকে। গড়াইয়ের বুকে এখন মরণখরা, বেদনার বালুচর। এখন এ নদীকে বাঁচাতে হলে পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের নদীসমূহকে বাঁচাতে হলে, মানবসমাজকে বাঁচাতে হলে, গড়াইকে বাঁচাতে হবে, সারাবছর এর প্রবাহ ধরে রাখতে হবে। নইলে নানাভাবে শুরু হবে এ অঞ্চলে মরুকরণ আর ধীরে ধীরে লবণাক্ত পানি পদ্মার দিকে ধেয়ে আসবে। এসব অঞ্চলের মাটি ক্রমশ লবণাক্ত হতে শুরু করবে। এসব আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে সর্বাগ্রে তাই প্রয়োজন গড়াই-এর উৎপত্তি স্থলে ব্যাপক সংস্কার কার্য পরিচালনা করা অর্থাৎ নিয়মিত খনন কার্যের মাধ্যমে নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখা। পাউবো সূত্রে আমরা জানি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুন্দরবনসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গড়াই খনন প্রকল্প হাতে নেয়। ১৯৯৮ সালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই নদী খনন করা হয়। খননের পর আবার পলি পড়ে। সুফল না মেলায় ২০০৯ সালে পুনরায় শুরু হয় দ্বিতীয় দফার কাজ। এ দফায় প্রকল্প ব্যয় ৯ শত ৪২ কোটি টাকা। ২০১০-২০১১ অর্থবছর থেকে চার বছর মেয়াদি বৃহত্তর আকারের খনন করতে ‘গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প-২’ প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪২ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রকল্পটি বছরখানেক আগে শেষ হয়। সারা বছর মিঠাপানির প্রবাহ সচল রাখতে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও দৃশ্যত তেমন কোনো ফল মিলছে না। কিন্তু এতো টাকা ব্যয়ের পরেও গড়াই ফিরে পায় না তার আপন রূপ আর প্রবাহের আসল ঠিকানা। গড়াই নদী তৃতীয় দফা খননের জন্য ৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। চার বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে ৩৭ কিলোমিটার নদী খনন ও ৭ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। সচেতন মহল জানেন যে, গড়াই নদীর মিঠা পানির প্রবাহ বাড়লে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে কমবে নোনা পানির আগ্রাসন। যা এই অঞ্চলের মানবজীবনে বসবাস ও কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।
গড়াই নদীর প্রবাহের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে সুন্দরবনের আর এখানকার জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রধান নদীপ্রবাহও গড়াই। নানা গবেষণায় দেখা গেছে সমস্ত সুন্দরবন অঞ্চল এক সময়ে বিশেষ সমৃদ্ধশালী জনপদ ছিল। এখানকার মাটির ভিতর থেকে এখনো অনেক প্রাচীন নিদর্শনাদি পাওয়ার আশাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ব্রিটিশ ভূগোলবিদ, নৌপ্রকৌশলী, ঐতিহাসিক মেজর জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)-এর মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে মগদের অত্যাচারে সুন্দরবন জনশূন্য অরণ্যে পরিণত হয়। বিশিষ্ট গবেষক, অধ্যাপক নলিনীকান্ত ভট্টশালীও এ বিষয়ে জানিছেনÑ ষোড়শ শতাব্দীতে সমস্ত সুন্দরবন এলাকায় মাটি ধসে বসে যায় আর সেই সঙ্গে ওখানকার জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাস্তবিক সুন্দরবনে ভূপ্রোথিত অট্টালিকা ও বৃহৎ বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। প্রবল ঘূর্ণিবার্তা ও সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস সুন্দরবনের বসতি অঞ্চল ধ্বংস করে দিয়েছে, এ কথাও অনেক সুধী মনে করেন। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের আশ্বিনে ঝড়ের সময়ে বাকেরগঞ্জ ও নোয়াখালি জেলায় প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মরেছিল বলে অনেকে মনে করেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জৈষ্ঠ্যের ঝড় ও প্লাবনের ধ্বংসলীলাও বাকেরগঞ্জ ও নোয়াখালির যথেষ্ট ক্ষতি করেছিল। ১৯৪২-এর আশ্বিনে মেদিনীপুর জেলার সমুদ্রোপকূল অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাসের ইতিহাসও সকলের জানা আছে। কিন্তু ভূগোলশাস্ত্রবিদ টমাস ওলডহ্যামের মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছিল, সুন্দরবন অঞ্চলের জনশূন্য হয়ে যাবার প্রধান কারণ, ক্রমশ সেখানকার পানীয় জল সরবরাহের অবনতি। মোহনায় নদীগুলির (বিশেষত সুন্দরবনের মধ্যে ও পশ্চিমাংশে) জলে সমুদ্রের জোয়ারের প্রাবাল্যই ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে ও জল লবণাক্ত হয়ে গিয়েছে। সুন্দরবনের পূর্বাংশে নদীর ওপর দিক থেকে প্রচুর পরিমাণে মিঠা জল সরবরাহের ফলে এখনো সেরূপ অবস্থা আসেনি। যেখানে পানীয় জল নেই, সেখানে মানুষের বসতি থাকতে পারে না। উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা গড়াই নদীর গুরুত্বকে সহজেই অনুধাবন করতে পারি। অর্থাৎ গড়াই বাঁচলে, বাঁচবে সুন্দরবন, বাঁচব আমরা। গড়াইয়ের প্রবাহিত জল ব্যাতিরেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানবসমাজের বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে, একথা নতুন নয়, যদিও নতুন করে বলতে হচ্ছে আবার আমাদের।
গড়াই নদীকে বাঁচানোর পাশাপাশি মজা নদী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনাসমূহকেও হাতে নিতে হবে স্থানীয় প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের। নদী উপত্যকা পরিকল্পনার মাধ্যমে মজা-নদীর পুনরুদ্ধার একটা প্রধান কাজ। আড়াআড়ি উঁচু বাঁধের আড়ালে পানি সঞ্চিত করে সারাবছর নিয়মিত প্রবাহে নদীর মজে আসা শাখা-প্রশাখাগুলোতে প্রবাহিত করতে পারলে, তাদের পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। অবশ্য সেই সঙ্গে আরো কাজ করারও প্রয়োজন পড়ে নিয়মিত, তাহলো নদীখনন। খননের মাধ্যমে নদ-নদীর মধ্যভাগ গভীরতর করে কৃত্রিম উপায়ে দু’ধারে পলি ফেলে উন্নত কৃষিজ পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, নানা রকম বৃক্ষ, ফলমূল দিয়ে সবুজ পৃথিবী বিনির্মাণ করা যায়। গড়াই নদী পরিকল্পনায় আমরা সে নদীর পানিকে শহরে ও শিল্পে উপযুক্ত পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে পারি। আমাদের শহরে যেখানে অনেক মানুষের ঘনবসতি, সেখানে পানির চাহিদাও অনেক। এক্ষেত্রে গড়াই নদীর পরিচ্ছন্ন পানি হতে পারে এই শহরের অন্যতম সহায়ক প্রাকৃতিক উপাদান। আমরা জানি রাস্তায় ধূলি নিবারণের কাজ থেকে পিচ দেয়া অথবা সিমেন্টের রাস্তা ধোয়ার কাজ, ড্রেন ধোয়ার কাজ, পার্কে-বাগানে জল দেয়া, মোটরযান ধোয়া, বাসগৃহ ধোয়ামোছা এবং অগ্নি-নির্বাপণের জন্য শহরে প্রচুর পানি সরবরাহ ও মজুতেরও প্রয়োজন। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ও পশুর নিত্য স্নান, তাদের রন্ধন কার্য আর সেই রন্ধনের কাজেও দরকার প্রচুর পানির। পানির প্রয়োজন নেই কোনখানে। পানি বিনা মানবসমাজের জীবন অচল। গড়াই নদীতে সারাবছর প্রবাহ থাকলে সেখানে সন্তরণ, জলক্রীড়া, নৌকাচালানো, বাইচ খেলা প্রভৃতি ব্যায়াম ও আমোদ-আহ্লাদের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই গড়ে তোলা সম্ভব। নদী-উপত্যকা পরিকল্পনার মাধ্যমে বৃহদায়তন কৃত্রিম হৃদ সৃষ্টি ও যে ক্ষেত্রে নদীর খাতে পানি প্রবাহের উন্নতি হয়, সেইসব ক্ষেত্রে যে মৎস্য চাষের নতুন নতুন বৃহৎ আবাদ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে নদীগুলোতে মাছের পোনা ছাড়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে পোনা ছাড়ার মৌসুমগুলোতে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে মাছের পোনাটির দাম আজ একটাকা তার একবছর পর দাম হবে একহাজার টাকা। নদীর মৎস্য প্রকল্পসমূহ জেলেদের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হলে নদীকেন্দ্রিক জেলে সম্প্রদায় তাদের পেশাটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে। গড়ে উঠবে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। নতুন করে বেঁচে উঠবে নদীপাড়ের মানবজীবন।
গড়াই থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত সকল নদীর ধারাপ্রবাহ সৃষ্টি করতে পারলে নদীর দুপাড় জুড়ে সৃষ্টি হবে সবুজ বনায়ন, বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূলের অনন্য ক্ষেত্রসমূহ। নদীতে পানি থাকলে লক্ষ লক্ষ একর অনাবাদী জমিকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। কেননা পানিই হলো ফসল ফলানোর প্রথম প্রধান উপাদান। এ বিষয়ে নদীপাড়ের জেলাগুলোর প্রশাসনের আন্তরিকতা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। গড়াই থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত ব্যাপক এক পর্যটন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ। নদীর এরকম পানিপ্রবাহিত পরিবেশ বজায় থাকলে গড়াই নদী থেকে যাত্রা করে এক সময় নদীবিহার করে সুন্দরবন এমনকি বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে যাওয়া যাবে। নদীপথে গমন করতে করতে যতগুলি জেলা, থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম, অঞ্চল পড়বে, সেই স্থানসমূহের বিশেষ বিশেষ বিষয়গুলি নদীপাড়ে নানা স্থাপনা ও ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যমে নদীকূলকে দৃষ্টিনন্দন ও সৌন্দর্যপূর্ণভাবে সাজিয়ে তোলা সম্ভব হবে। আর এর ভিতর দিয়ে এক সুদৃঢ় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। যাতে করে পর্যটন শিল্প লাভবান হবার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন নদীসমূহের নাব্যতা ও নিয়মিত খনন কার্য যত্ন সহকারে পরিচালনা করা। নদীর আর এক নাম জীবন। গড়াই নদী দক্ষিণাঞ্চলের মানবসমাজের জীবন। গড়াই নদীর সংস্পর্শে রয়েছে এ অঞ্চলের তাবৎ নদী। সর্বাগ্রে জীবন ফেরাতে হবে এই নদীর। গড়াই তার বুকের ভিতর ফিরে পাক রূপালি স্রোতধারা। নদীপ্রবাহে জেগে উঠুক নদীতীরবর্তী মানুষের সারল্যে ভরা অনিন্দ্যসুন্দর জীবন। গড়াই প্রবাহের তীরে তীরে জেগে উঠুক বাঙালি জাতির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, দুলে উঠুক বাতাসে প্রতিদিন সবুজ শস্যের শ্যামলিমা, বেঁচে থাকুক জীববৈচিত্র্য। বেঁচে থাকুক আমাদের অবারিত অক্সিজেন সুন্দরবন। গড়ে উঠুক সজীব, সচল নদীর কিনারে কিনারে অপরূপ বাংলা আর মানুষের ঐতিহ্যিক বসতি। গড়াই প্রবাহের ভিতর দিয়ে কর্মময়, কর্মচঞ্চল দিন ফিরে আসুক গ্রাম, শহর, নগর আর বন্দরে।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!