Saturday , April 10 2021
You are here: Home / রাজশাহী ও রংপুর / সড়কবাতি হেলে পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষ
সড়কবাতি হেলে পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষ

সড়কবাতি হেলে পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষ

রাজশাহী অফিস : রাজশাহীতে উদ্বোধনের মাত্র দেড় মাসের মাথায় সামান্য ঝড়েই দৃষ্টিনন্দন প্রজাপতি সড়কবাতির ৮৬টি খুঁটি হেলে পড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন নেটিজেনরাও। তবে বাতি স্থাপন প্রকল্পের ঠিকাদার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ঝড়ে টিউবওয়েল পর্যন্ত উড়ে যায়। আর এ তো সড়কবাতির খুঁটি! রাজশাহীর বহুল আলোচিত এই ঠিকাদার ‘হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী। তার নাম আশরাফুল হুদা টিটো। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হ্যারোর অপর একটি কাজের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছে। এই কাজটিও ছিল রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক)।
সেই প্রকল্পে রাজশাহী মহানগরীর ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আলোকিত করতে ১৬টি ফ্লাড লাইট বসানো হয়েছিল। ৯ কোটি ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৭ টাকায় কাজটি বাস্তবায়ন করে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন। কাজটি শেষ করার পরই দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। দুদক অভিযান চালিয়ে প্রকল্পের নথিপত্র জব্দও করে। তখন এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে রাসিক।
কিন্তু এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিই রাজশাহী মহানগরীর বিলশিমলা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়কে সড়কবাতি বসানোর কাজ পায়। এরপর মৌসুমের প্রথম ঝড়ে গত রোববার ১৭৪টি খুঁটির মধ্যে অন্তত ৮৬টি হেলে পড়ে এবং উপড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ঠিকাদারী এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছে রাসিক। এদিকে সূত্র বলছে, ১৬টি ফ্লাড লাইট বসানোর কাজে অনিয়মের বিষয়টি এখনও অনুসন্ধান করছে দুদক। ২০১৯ সালের শেষের দিকে ফ্লাড লাইটগুলো বসানো হয়েছিল।
এই প্রকল্পে ছয় কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এ কারণে গত বছরের ৪ অক্টোবর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো: আল-আমিনের নেতৃত্বে একটি টিম নগর ভবনে অভিযান চালায়। অভিযানে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ করে নিয়ে যায় দুদক। এরপর অনুসন্ধান শুরু হয়।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম সোমবার দুপুরে গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগটি এখনও অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত চলছে। দ্রুতই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
তবে স্থাপনের দেড় মাস পরই নতুন সড়কবাতির খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ায় এই কাজে কোন দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে কিনা সেটি তদন্তেরও দাবি উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে চার লেন সড়কটির আইল্যান্ডে চীন থেকে আনা সড়কবাতির ১৭৪টি খুঁটি স্থাপন করা হয়। প্রতিটি খুঁটির সঙ্গে প্রজাপতির মতো ডানায় দুটি করে এলইডি বাতি বসানো হয়। রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক) রেয়াজাত হোসেন রিটু গত রোববার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সড়কবাতির খুঁটিগুলো একটি কংক্রিটের স্তম্ভের ওপর বসানো হয়েছিল। স্তম্ভটি পাঁচ ফুট উচ্চতার। এর মধ্যে সাড়ে তিন ফুট মাটির নিচে আছে। আর দেড় ফুট আছে মাটির উপরে।
তবে সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কংক্রিটের স্তম্ভগুলো কোনক্রমেই পাঁচ ফুট হবে না। এগুলোর উচ্চতা সর্বোচ্চ তিন ফুট। এর অর্ধেক অংশ মাটির নিচে, বাকিটা উপরে। মাটির নিচে কম থাকার কারণেই মাত্র ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটার গতিবেগের ধুলিঝড়ে খুঁটিগুলো উপড়ে পড়ে। রোববার মোট ৮৬টি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত দেখা গেছে। সেদিন সন্ধ্যা থেকে ক্রেন দিয়ে চেপে হেলেপড়া খুঁটিগুলোকে সোজা করার কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। সোমবার দুপুর পর্যন্ত ১৯টি খুঁটি সোজা করা হয়। তবে সবগুলো খুঁটি তুলে কংক্রিটের স্তম্ভটি পুরোটাই মাটির নিচে পুঁতে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। সোমবার সকালে খুঁটিগুলো পরিদর্শনে গিয়ে তিনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটোকে এই নির্দেশনা দেন।
অবশ্য খুঁটিগুলো ভালমত না পোতার বিষয়ে সমালোচনা হয়েছিল আগেই। কাজ চলমান থাকা অবস্থায় প্রবীণ সাংবাদিক আহমেদ সফিউদ্দিন গত ২৮ জানুয়ারি ফেসবুকে দুটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। এর একটি রাজশাহীর, অন্যটি মালয়েশিয়ার। দুটি খুঁটিই একই ধরনের। ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ শিরোনামে আহমেদ সফিউদ্দিন লিখেছিলেন, ‘আমাদের মেয়র সাহেবের ভালো উদ্যোগগুলিতেও খুঁত থেকে যায় রাসিকের প্রকৌশল শাখার কারণে। চমৎকার ডিজাইনের লাইটপোস্ট। তবে সৌন্দর্য নষ্ট করে দিচ্ছে চতুষ্কোন কংক্রিটের বেস যার ভেতর থাকবে ইলেকট্রিক ইউনিট। এটি অনায়াসে নিচু করে আংশিক ডিভাইডারের ভেতরে স্থাপন করা যেত না কি? মালয়েশিয়ার সড়কের ছবিটিতে তাই তো দেখলাম।’
সেই পোস্ট সোমবার আবারও শেয়ার করে আহমেদ সফিউদ্দিন লেখেন, ‘ম্যানুয়াল অনুযায়ী মাটির যতটা গভীরে খুঁটি বসানোর কথা তা করা হয়নি। তখন দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে না বলে প্রতিবাদ করি। দু‘মাসের মাথায় সামান্য ঝড়ে প্রমাণিত হলো রাসিক প্রকৌশল শাখার যোগ্যতা কতটা।’
এ বিষয়ে কথা বলতে সোমবার রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন রিটুকে ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ধরেননি। তাই এ নিয়ে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে খুঁটিগুলো মাটির গভীরে না পোতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী আশরাফুল হুদা টিটো। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, খুঁটিগুলোর নিচের অংশে বাঁশের মতো নান্দনিক কারুকাজ করা আছে। তাই আরও পুঁতে দিলে সেটি আইল্যান্ডে ঢেকে যেত। সুন্দর জিনিসটা দেখানোর জন্য অল্প করে খুঁটি পোতা হয়েছিল। তিনি বলেন, নতুন এই সড়কটার আইল্যান্ডের ভেতর বালু। সে কারণেই বাতাস সহ্য করতে পারেনি খুঁটিগুলো। যে এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়টা গেছে সেই এলাকার খুঁটিগুলো হেলে পড়েছে। আইল্যান্ডে বালুর পরিবর্তে মাটি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। তিনি বলেন, পুরো কংক্রিটটির মোট দৈর্ঘ্য চার ফুট। অথচ রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন রিটুর দাবি, কংক্রিটের উচ্চতা পাঁচ ফুট।
আশরাফুল হুদা টিটো জানান, সোমবার সকালে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন খুঁটিগুলো পরিদর্শন করেছেন। এখন সবগুলো খুঁটিই তোলার পর কংক্রিটের পুরো অংশটিই যেন নতুন করে মাটির নিচে পোতা হয় তিনি সেই নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা কাজ শেষ করবেন। ফ্লাডলাইট স্থাপন এবং প্রজাপতি সড়কবাতির এই কাজে দুর্নীতি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ঠিকাদার টিটো বলেন, এগুলো সমালোচকেরা বলবেন। কারও মুখে তো হাত দেয়া যায় না। আমি কাজ পাই ইজিপির ওপেন টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে। এমন তো নয় যে আমার যোগ্যতা নেই। ঝড়ে টিউবওয়েল পর্যন্ত উড়ে যায়, আর এটা তো সড়কবাতির খুঁটি বলেন তিনি।

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!