Monday , August 2 2021
You are here: Home / আর্টিকেল / পবিত্র লাইলাতিল ক্বাদর এর ফযিলত-মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন কাদরী
পবিত্র লাইলাতিল ক্বাদর এর ফযিলত-মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন কাদরী

পবিত্র লাইলাতিল ক্বাদর এর ফযিলত-মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন কাদরী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ইন্না—আনযালনা-হু ফী-লাইলাতিল ক্বাদর।
অর্থাৎঃ নিশ্চয় আমি সেটা ক্বাদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।
শানে নু্যূলঃ একদা আল্লাহ্‌র হাবিব তাজেদারে কায়েনাত দোজাহানের বাদশাহ ইমামুল আম্বিয়া হুজুর রাসূলুল্লাহ (দঃ) সাহাবা-ই কেরামকে ইরশাদ ফরমালেন, শামসূন ইস্রাঈলী এক হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাস যাবত দিনে রোযা রাখতো, রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করত। তখন একজন সাহাবী আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! (দঃ) আমাদের মধ্যে তার মতো কে-ই বা হতে পারে? কিয়ামতে সেতো আমাদের চেয়ে উত্তম হয়ে যাবে। তখন এ সূরা আল-ক্বাদর অবতীর্ণ হয়েছে। যাতে ইরশাদ হয়েছে, আমি লওহ-ই মাহফুয থেকে প্রথম আসমানের বায়তুল ইযযাত এর দিকে কুরআন শরিফকে ক্বাদর রাতে অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং যে মুসলমান এ রাতে ইবাদত করবে সে হাজার মাসের বেশি ইবাদাতের সাওয়াব লাভ করবে।
এ থেকে কয়েকটা বিষয় জানা যায়ঃ
এক। মহান আল্লাহ পাকের খাস বান্দাদের কাজ আল্লাহরই কাজ হয়ে থাকে। দেখুন! আল-কুরআন নাযিল করা ফিরিশতাদের কাজ। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ ফরমালেন, আমি অবতীর্ণ করেছি।দুই।  যে তারিখে কোন উচ্চমানের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়, ঐ তারিখ রোজ কিয়ামত পর্যন্ত উত্তমই থেকে যায়। শবে ক্বাদর-এ একবার কুরআন পাক এসেছে। কিন্তু এ রাতটি রোজ কিয়ামত পর্যন্ত উৎকৃষ্ট। সুতরাং হুজুর পাক (দঃ) এর বিলাদাত শরিফ বা জন্মদিনের রাত, কিংবা শবে মিরাজ ইত্যাদি সর্বদাই উত্তম।

তিন। দিন অপেক্ষা রাত উত্তম। মিরাজ শরিফ রাতে হয়েছে, আল-কুরআনের অবতরণ, ফিরিশতাদের সৃষ্টি, জান্নাতে বাগান লাগানো, হযরত আদম (আঃ) এঁর শরীল মুবারকের উপকরণাদি সংগ্রহ করে একত্রিত করা শবে ক্বাদরেই হয়েছে। {তাফসীরে-ই আযীযী} দোয়া কবুল হবার মুহুর্তটি রাতের শেষ ভাগেই হয়। কিন্তু দিনে শুধু জুম্মায় হয়ে থাকে।

ওয়ামা—আদরা-কা মা লাইলাতুল ক্বাদর।

অর্থাৎঃ এবং আপনি কি জানেন ক্বাদর রাত্রি কি?

লাইলাতুল ক্বাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহ্‌র।
অর্থাৎঃ ক্বাদরের রাত হাজার মাস থেকে উত্তম।

হে মুসলমান! তুমি কি জানো, শবে ক্বাদর কেমন রাত? সেই রাতের যথাযথ সংজ্ঞা দেওয়া বা প্রশংসা করা শব্দাবলীর মাধ্যমে সম্ভবপর নয়। বেশাখ হুজুর পাক (দঃ) সৃষ্টির শুরু আদি থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই অবগত আছেন।

ক্বাদর এর অর্থ হচ্ছে ‘ইযযাত’ওমা ক্বাদারুল-ল্লাহা হাক্বা ক্বাদরিহি অর্থাৎ মহান আল্লাহ্‌ পাকের মহা সম্মানের যথাযথ মূল্যায়ন মানবজাতি করে নি। অথবা ‘পরিমাণ’ যেমন ইরশাদ হয়েছে ওমা নুনাঝিলুহু ইল্লা বিক্বাদারিম-মা’লুমিন অর্থ তা নির্ধারিত পরিমাণেই অবতীর্ণ করি। অথবা সংকীর্ণ হওয়া যেমন ইরশাদ হয়েছে আম্মা মান ক্বাদারা আলাইহি রিঝকুহু অর্থকিন্তু যার জীবিকা সংকীর্ণ করা হয়েছে।

এ রাতকে শবে ক্বাদর এজন্যই বলা হয় যে, এটা সম্মানিত রাত। অথবা এ রাতে গোটা বছর ঘটিতব্য ঘটনাবলীর ‘তালিকাসমূহ’ ও পরিমাণ নামা ফেরেশতাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। আর সব ধরনের ফেরেশতাকে তাদের কাজের পরিমাণ জানিয়ে দেওয়া হয়। অথবা এ রাতে ফেরেশতাগণ এতো বেশি সংখ্যায় অবতীর্ণ হন যে, গোটা ভূপৃষ্ঠ সংকীর্ণ হয়ে যায়, সংকুলান হয় না।

খুব বেশি সম্ভব, এ রাতটি হলো – ২৭ তম রাত। কেননা, এখানে লাইলাতুল ক্বাদর তিন জায়গায় (তিন বার) ইরশাদ হয়েছে। আর,লাইলাতুল ক্বাদর এর মধ্যে নয়টা বর্ণ আছে। {৯Í৩=২৭}। তাছাড়া এ সূরায় ত্রিশটা শব্দ (পদ) রয়েছে। তন্মধ্যে (ঐ রাত নির্দেশক সর্বনাম ) হিয়া হচ্ছে ২৭তম পদ। হিয়া মানে পূর্ণ ক্বাদর রাত্রি, মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত।

এ রাতটি ঐ হাজার রাত থেকে শর্তহীনভাবে উত্তম, যেগুলোর মধ্যে একটি রাতও ‘শবে ক্বাদর’ নেই। সুতরাং এ আয়াতের বিরুদ্ধে কোন আপত্তি নেই। যেহেতু হুজুর পাক (দঃ) শামসূন ইস্রাঈলীর কাহিনীর মধ্যে হাজার মাসের উল্লেখ করেছিলেন, সেহেতু মহান আল্লাহ পাক ও ঐগুলোর (হাজার মাস) কথাই উল্লেখ করেছেন। শতাব্দী ও বছরসমূহ উল্লেখ করেন নি। এখানে হাজার মাস মানে ‘দীর্ঘকাল’। আরবিতে হাজারের বেশি সংখ্যা নেই। এ কারণে হাজার ইরশাদ হয়েছে।

স্মর্তব্য যে খাইরুন মানে হয় তো ঐ রাতের নৈকট্য ও মহা-মর্যাদা বুঝায়, অথবা এ অর্থই বুঝায় যে, ঐ রাতের ইবাদাত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা বেশি সাওয়াবের কারণ হয়। এ আয়াত থেকে দু’টি বিষয় সম্পর্কে জানা যায়ঃ এক,বুযর্গ জিনিসগুলোর সাথে সম্পর্ক বড়ই উপকারী হয়। কারণ, শবে ক্বাদরের এ ফযিলত কোরআনের সাথে সম্পর্কের কারণেই। ‘আসহাব-ই-কাহাফ’ এর কুকুরও ঐ সব বুযর্গের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে স্থায়ী জীবন ও সম্মান লাভ করেন।

দুই,সমস্ত আসমানী কিতাব অপেক্ষা আল-কুরআন শ্রেষ্ঠ। কেননা, তাওরাত ও ইঞ্জিল অবতরণের তারিখটা এ মহত্ব পায় নি।

তানাযযালুল মালা—-ইকাতু ওয়ার রু-হু ফী-হা বিইযনি।

অর্থাৎঃ এতে ফেরেশতাগণ ও জিব্রাঈল অবতীর্ণ হয়ে থাকে স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক কাজের জন্য।

অর্থাৎঃ শবে ক্বাদরে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত সমস্ত নৈকট্যধন্য ফেরেশতা হয় তো সিদরাহয় অবতীর্ণ হন। অথবা ইবাদাতপরায়ণ অগণিত ফেরেশতা ও রুহুল আমীন হযরত জিব্রাঈল, কিংবা রুহুল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ) অথবা রুহ-ই-মুহাম্মাদী (সাঃ) কিংবা ফেরেশতাদের খাস রুহানী দলসমূহ অথবা ঐ ‘রূহ’ নামক ফেরেশতা, যার অগণিত জিহ্বা রয়েছে, যেগুলো দিয়ে বিভিন্ন ভাষায় আল্লাহ্‌র প্রশংসা করেন, আর এই রাতে সমস্ত মুখ দিয়ে মু’মিনদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন, ভূপৃষ্ঠের উপর, বিশেষ করে, মসজিদগুলোতে ও আবিদ মু’মিনদের ঘরগুলোতে অবতীর্ণ হতে থাকেন। (রূহ ইত্যাদি)। তাও এজন্য যে, আজ সিদাতুল মুন্তাহার পরিবর্তে ভূ-পৃষ্ঠের উপর মুসলমানদের সাথে তারা ইবাদত করবেন এবং মুসলমানদের দোয়ার সাথে ‘আমীন’ বলবেন। তাছাড়া, নেক্কার মু’মিনগণ এসব ফেরেশতার ‘ফয়য’ লাভ করবেন। এমনকি ফেরেশতাগণও রাতের বরকত হাসিল করে থাকেন। (তাফসীর-ই-আযীয) এ আয়াত থেকে কয়েকটা মাসআলা প্রতিমান হয়ঃ

এক,যমীন (পৃথিবী) আসমান অপেক্ষা উত্তম। এ কারণে আল্লাহর নৈকট্যধন্য ফেরেশতাগণ এ রাতে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভের জন্য ভূ-পৃষ্ঠে এসে থাকেন। দেখুন! হযরত জিব্রাঈল (আঃ) দো’আ সমূহ প্রার্থনার জন্য হাযির হতেন। ( কানযুল ঈমান ও নূরুল ইরফান ১৬৬৩ পৃষ্ঠা)

লেখক ও গবেষকঃ মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন কাদরী-  

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!