Tuesday , August 9 2022
You are here: Home / শিক্ষার খবর / রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পে নষ্টনীড় : ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল
রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পে নষ্টনীড় : ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পে নষ্টনীড় : ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল

সেই সময়সুখী দাম্পত্যের দুটো গল্পকথা আমাদের সমাজে হরহামেশাই উদাহরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো- তাহলো, রাম-সীতা, কালকেতু-ফুল্লরা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) ‘ইন্দিরা’ (১৮৯৩) উপন্যাসের সুভাষিণী-রমণবাবু বা ‘বিষবৃক্ষ’ (১৮৭৩) উপন্যাসের কমলমণি-শীশচন্দ্রের বা তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের (১৮৪৫-১৮৯১) ‘স্বর্ণলতা’র (১৮৭৪) সরলা-বিধুভূষণের দাম্পত্যসুখের চিত্রের কথাও আমরা আলোচনা করে থাকি। ‘স্বর্ণলতা’ উপন্যাসে প্রথম গ্রামের গরিব ভদ্র বাঙালির সাংসারিক সুখদুঃখের অনুজ্জ্বল জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। এরপাশে বিভিন্ন কবিগানে এবং রামনিধি গুপ্তের (১৭৪১-১৮৩৪) টপ্পায় স্বামী উপেক্ষিতা স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস, দুঃখ-এর কথাও পাওয়া যায়। তা সামাজিক জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। উল্লেখ্য যে, রামনিধি গুপ্ত বাংলা টপ্পা গানের রুচিশীল সংস্কারক। বাংলায় তিনিই প্রথম ইংরেজি জানা অভিজ্ঞ কবিয়াল। তাঁর প্রেম সম্পর্কিত একটি গীতিপদের উল্লেখ করা যায় :
‘প্রেমে কি সুখ হ’ত।
আমি যারে ভাল বাসি,
সে যদি ভালবাসিত।
কিংশুক শোভিত ঘ্রাণে,
কেতকী কণ্টক বিনে
ফল হ’ত চন্দন
ইক্ষুতে ফল ফলিত।’
একটা সময় ছিল বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, অসমবিবাহ নারীর দুঃখের কারণ। স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে সন্দিগ্ধতা দাম্পত্যসম্পর্ক নষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। যতই বিংশ শতাব্দী এগিয়ে আসে শিক্ষা ও রুচিগত বৈষম্য গড়ে, সামাজিক জাড্য এবং ব্যক্তির চিন্তাগত অগ্রগতি নানা সংঘাত তৈরি করে যার পরিচয় আমরা সমাজে, গল্পে, উপন্যাসে পেয়েছি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কেবল নিজেদের আর্থিক প্রলোভনই নয়, সমগ্র বিবাহব্যবস্থার মধ্যেই বোধহয় লোভ বস্তুটা সে যুগে খুব প্রাধান্য পেত এবং সঙ্গে সমানুপাতিক হারে উপেক্ষিত হতো স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকটি। এটা বোধহয় বিংশ শতাব্দীতেও ঘটে। আনন্দচন্দ্র সেনগুপ্ত (?) তাঁর ‘গৃহিণীর কর্তব্য’ গ্রন্থে পতির সুখ সন্তোষের জন্য কি কি করতে হবে তার কোনো তালিকা আমরা পাই না। ফলে নারীর মর্যাদা সমাজে পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি, নারীর পতি বা পরনির্ভরতাও কাটেনি, সে এখনো ভোগের সামগ্রী মাত্র। এমনকি চাকরি করতে যাওয়া স্বামীর অসন্তোষ আনছে তা নিয়ে অনেক গল্প উপন্যাস হয়েছে। একটা সময় ছিল নষ্ট দাম্পত্য ভাগ্যের বিধান ভেবে নারী সংসারেই থাকত।
বিবাহ যেখানে একজন নারীপুরুষের জীবনে বহু দিবসরজনীর অপেক্ষার এক সুন্দর সমাপ্তি; কিন্তু তা আজ হয়ে উঠেছে নানা হিসেবনিকেশ ও চিন্তার বিষয়। বিবাহে মানবমানবীর অনিচ্ছার ফলও পড়েছে প্রেম, ভালোবাসার ক্ষেত্রে। যেহেতু প্রেম শেষে বিবাহের প্রসঙ্গ ক্রমশ কমে আসছে সে কারণে তারা আর প্রেমের বাঁধনে জড়াতে চাইছে না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে এখন তাই ভালোবাসার দিন। এটাতো অস্বীকার করবার কোনো উপায়ই আজ আর নেই যে, প্রেম-ভালোবাসা এখন পরিণত হয়েছে প্রতারণার প্রথম ফাঁদ হিসেবে। এটা মানবজাতির জন্যে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে উপনীত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবী আধুনিকতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে; পৃথিবীটা আজ হাতের মুঠোয়, এখন চাইলেই নিজের ঘরটাকে পৃথিবী বানিয়ে ফেলা যায়। জীবন যেমন আমাদের কাছে সহজ হয়ে উঠেছে; তেমনি প্রেম ও সহজতর বিষয়ে আজ পরিণতি লাভ করছে। মানবমানবীর ঘর বাঁধবার আগে এতো দরকষাকষি; তারপর রইলোতো দিন বাকি। বিবাহের পর একটা বিশাল পরীক্ষার ভিতর, ধৈর্যের ভিতর দিয়ে জীবন অতিবাহিত হয়। সংসার শুরুর আগে আর সংসার সৃষ্টির পর দুয়ের এক প্রবল ব্যবধান। মূলত সংসার গড়ে উঠবার পরই শুরু হয় জীবনের মূল বিচরণভূমি। শুধু ঘরকরা বা বাজার করে রান্না করে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়বার মধ্যেই জীবন তখন সীমাবদ্ধ থাকে না। জীবনে নতুন অতিথির আগমন ঘটে; তাদেরকেও দিতে হয় জীবনের মূল্যবান সময় ভাগ করে, মানুষ করে গড়েপিঠে তুলতে হয়, আবার তাদেরকেও নিজেদের মতো করেই সংসারে পাঠাতে হয়। এক এক বিচিত্র লীলারহস্য, সৃষ্টির এক ধারাবাহিক পদ্ধতি। আর এই ধারাবাহিক পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখার মধ্যেই রয়েছে সংসারের সাফল্য। অনেকে আবার এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে সংসারী হতে চাননিÑ চিরকুমার, চিরকুমারী হয়ে থাকতে চাইছেন, থেকেছেনও অনেকেই, তা বিরল নয়। জীবনে বিবাহ, সংসার, দাম্পত্য এক জটিল ও কঠিনতর সময়ের মধ্যে পরিচালিত সুখদুঃখের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত বিচিত্র সময়যাত্রার মধ্যে অবগাহন। বিবাহ শুধু বিবাহ নয় এর মধ্যে রয়েছে নানাবিধ অধ্যায়। সেক্ষেত্রে সুকঠিন, সুখীসুন্দর দাম্পত্য এক আলোচিত বিষয়। ‘বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ এক পুরুষ এবং এক নারীর এক তৃতীয়ের উপস্থিতি দাম্পত্য সঙ্কটের এই চেনা ছকের বাইরে যে আরও লক্ষ কোটি কারণ রয়েছে, তার অসংখ্য ছবি রয়েছে বাংলা ছোটোগল্পে।’ সেক্ষেত্রে রবীন্দ্র-ছোটোগল্পে এই দাম্পত্যজীবন অন্বেষণই আমাদের মূল লক্ষ্য।
রবীন্দ্রনাথের ‘দেনাপওনা’ (১২৯৮) গল্প পণ-প্রথার কুফল নিরীহ নারীর জীবন কী বিষময় করে তোলে তারই সকরুণ চিত্র। গল্পে সার্থকভাবে দেখান হয়েছে একদিকে নিরুপমার অবহেলায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দৃশ্য, অন্যদিকে তার শ্বশুর রায় বাহাদুর সাহেবের নিছক নাম-খ্যাতির জন্য অকাতরে অপব্যয়ের কাহিনি; একদিকে পিতার কন্যাপ্রীতি, অন্যদিকে শাশুড়ীর বধূ-নির্যাতন। রামসুন্দরেরা অতি আদরের নিরুপমা শাশুড়ীর কাছে সেই চিরন্তন বাঙালি বধূ মাত্র যার মূল্য পণের টাকার হিসেবে। পণ্যের তখন এমনিই প্রতাপ যে, সেটা ঠিকমতো পরিশোধ করতে না পারার জন্য রামসুন্দর তার কন্যাকে চোখে দেখার হুকুমটি পর্যন্ত সব সময় পেত না, তাঁকে ‘কন্যার দর্শন সেও অতি সসংকোচে ভিক্ষা চাহিতে হয় এবং সময় বিশেষে নিরাশ হইলে দ্বিতীয় কথাটি কহিবার মুখ থাকে না।’ যেন কন্যার উপর পিতার স্বাভাবিক অধিকার  ‘পণ্যের টাকার পরিবর্তে বন্ধক রাখিতে হইয়াছে।’ এহেন নিরুপমার অসুখ হলে সেটা সকলের চোখে পড়ল যেদিন সন্ধ্যার সময় শ্বাস উপস্থিত হলো এবং ‘সেইদিন প্রথম ডাক্তার দেখিল। মৃত্যুর পর কিন্তু নিরুপমার অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে খুবই ধুমধাম হলো, কেননা সে ছিল বাড়ির বড়ো বৌ। গল্পে রায়বাহাদুরের কাছে নিরুপমার জীবন বাঁচানোর চেয়ে নিজের নাম বাঁচানোর সার্থকতা অনেক বেশি। এই রায়বাহাদুরের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগীয় সামন্তশ্রেণির চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। জীবন্ত মানুষ এদের প্রয়োজন কেবল শোষণের জন্য। আত্মতোষণের জন্য, বাইরের জাঁক জমক ঘটা করে জাহির করার জন্য এরা অকাতরে অর্থ ব্যয় করে, কিন্তু মানুষের জন্য পয়সা ব্যয় এদের কাছে অপব্যয়। মানুষের কোনোই মূল্য নেই এদের কাছে। এখানে রায়বাহাদুরের কাছেও জীবিত মানুষ অপেক্ষা চিতায় চাপানো শব অনেক বেশি মূল্য বহন করেছে। গবেষক সুকুমার সেন (১৯০১-১৯৯২) সে কারণে বলেছেন, ‘বিবাহের পণ লইয়া স্বার্থপর বরপক্ষের সহিত স্নেহমুগ্ধ অবিবেচক পিতার সংঘর্ষ ‘দেনাপাওনা’র কাহিনীকে অত্যন্ত করুণ করিয়াছে। নিরুপমা ‘দেনাপাওনা’য় পণের নির্যাতন ভোগ করেছে বটে, কিন্তু ঘর ছেড়ে যায়নি। আধুনিককালে ভদ্র বাঙালির ঘরের এই নির্মম হৃদয়হীনতার পরিচয় সাহিত্যে এই প্রথম।’ রবীন্দ্রনাথের ‘মধ্যবর্তিনী’ (১৩০০) গল্পের নায়িকা হরসুন্দরী। নায়ক তার স্বামী নিবারণ। সপত্নীর আগমনে হরসুন্দরীর অন্তর্জ্বালা। দ্বিতীয়ার মৃত্যুতে স্বামী স্ত্রীর পূর্ব জীবনে প্রত্যাবর্তন, কিন্তু পুনর্মিলন ঘটল না। গল্পে যেখানে আমরা দেখতে পাই শৈলবালার প্রতি আকর্ষণের কারণে নিবারণ ও হরসুন্দরীর মধ্যে ব্যবধান ঘটে যায় ‘দেখিল, সেই তো তাহার সমস্ত সংসার একাকিনী অধিকার করিয়া তাহার জীবনের সমস্ত সুখদুঃখের স্মৃতিমন্দিরের মাঝখানে বসিয়া আছে  তবু মধ্যে একটা বিচ্ছেদ।’ স্বামী স্ত্রীর শয়নের মধ্যে একটি মৃতবালিকার অস্তিত্ব তাদের মানসিক ব্যবধান ঘটিয়ে দেয় নিষ্ঠুর ছুরি’র মতো। বাঁধাজীবনে অভ্যস্ত দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না। কঠিন পীড়ার পর হরসুন্দরীর আরোগ্য লাভ, স্বামীসঙ্গ ‘সবকিছু মিলে তার মনে এক প্রবল আবেগের জন্ম এবং সন্তানলাভার্থে প্রাচীনপন্থী সমাজে এটা বিশেষ কিছু ঘটনা নয় এবং যথারীতি দুবার আপত্তির পর নিবারণের দ্বিতীয় বিবাহ হয়। আট বছর যে শয্যায় স্বামীর পাশে হরসুন্দরী শুয়েছিল, সাতাশ বছর পরে সে শয্যা ত্যাগ করে সে অন্য ঘরেশুতে যায়। দুঃখে বেদনায় হরসুন্দরীর চোখে জল এলো। হরসুন্দরীর কাছে এ এক নতুন সৃষ্ট বেদনা। তার উপলব্ধি হলো ‘এই নারীজীবন বড়ো দারিদ্র্যেই কাটিয়াছে। সে কেবল হাট বাজার পানমসলা তরিতরকারির ঝঞ্ঝাট লইয়াই সাতাশটা অমূল্য বৎসর দাসীবৃত্তি করিয়া কাটাইল।’
বাংলা গল্পের সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথের অন্যতম গল্প ‘স্ত্রীর পত্রে’র (১৩২১)। নারীজীবনের সার্থকতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ধারণার শেষতম পরিচয়স্থল ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্প। তিনি একসময় বিশ্বাস করতেন, নারীজীবনের চরম সার্থকতা মাতৃত্বে। বর্তমান শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত এ বিশ্বাস বজায় ছিল। তারপর এলো দুই নারী তত্ত্ব। নারীর দুই রূপ ‘প্রেয়সী ও জননী’ তিনি দেখতে চেয়েছেন। প্রথমটার উদাহরণ ‘গোরা’ (১৯১০) উপন্যাসের আনন্দময়ীবা ‘রাসমণির ছেলে’ গল্পের রাসমণি। দ্বিতীয়টার উদাহরণ বলাকা’র (১৯১৬) ‘দুই নারী’ কবিতা বা ‘দুই বোন’ (১৯৩৩) উপন্যাসের ঊর্মিলা ও শর্মিলা। তারপর এলো নারীত্বের তত্ত্ব ‘যে তত্ত্বের ব্যক্তিরূপ ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পের মৃণাল, ‘পয়লা নম্বরে’র অনিলা, ‘যোগাযোগ’ (১৯২৯) উপন্যাসের কুমুদিনী, ‘ল্যাবরেটরি’ (১৩৪৭) গল্পের সোহিনী। সমাজ, শাস্ত্র ও পুরুষের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এইসব নারীচরিত্রে দেখা যায়। ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪-১৯২২) পত্রিকায় ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্প প্রকাশিত হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ‘স্ত্রীর পত্র’ আসলে নারীর পত্র। পনের বছরের পত্নীজীবনের অভিজ্ঞতা শেষে মৃণালের উপলব্ধি ‘মনুষ্যত্বের চরম বিকাশ পত্নীত্বে নয়, নারীত্বে। পত্নীত্ব নারীত্বের অংশমাত্র, পূর্ণতা নয়, আর পূর্ণতার সাধনাই জীবনের লক্ষ্য। পুরুষশাসিত, অন্ধ আচার-নিয়ন্ত্রিত জীবন থেকে মুক্তিলাভের সাধনাকে এ গল্পে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই গল্পকে এক কথায় বলা যায়’ যৌবনের আহ্বান, নারীর মূল্যবোধ ও ব্যক্তির বিদ্রোহের গল্পরূপ।গল্পের শেষে দেখা যায় মৃণাল স্বেচ্ছায় চরণতলের আশ্রয় ছিন্নতা ঘোষণা করে পুরী চলে গেছে, আত্মহত্যা করেনি বিন্দুর মতো। সেখানে তার উপলব্ধির একটা আধ্যাত্মিক আশ্রয় রবীন্দ্রনা রচনা করে দেন  ‘আজ বাইরে এসে দেখি, আমার গৌরব রাখবার আর জায়গা নেই। আমার এই অনাদৃত রূপ যাঁর চোখে ভালো লেগেছে, সেই সুন্দর সমস্ত আকাশ দিয়ে আমাকে চেয়ে দেখছেন।’
অপরপক্ষে ‘পয়লা নম্বর’ (১৩২৪)-এর গল্পের অনিলা আধ্যাত্মিক আশ্রয় পায়নি বটে কিন্তু আকৃষ্ট হয়েছে সিতাংশুমৌলির প্রতি, সিতাংশুমৌলির পঁচিশখানি চিঠি আবিষ্কৃত হয়েছে যদিও অনিলা পয়লা নম্বরে সিতাংশুর কাছে গিয়ে ওঠেনি। ‘তোমার দুঃখই তোমার অন্তর্যামীর আসন’ এই রাবীন্দ্রিক সহিষ্ণুতার দীক্ষা গ্রহণের উপযুক্ততা ক’জন মেয়েরই বা ছিল বা থাকে। শেষোক্ত দুটি গল্পেই নষ্টদাম্পত্য থেকে ইউটোপিয়ার জগতে মুক্তি, যা রুচি শোভন, বিষাদমুখর, সমাজ তা নিয়ে চেঁচামেচি করে না, করবে না। কারণ, ‘স্ত্রী একটা সজীব পদার্থ’ মাত্র। ‘ভারতী’ এবং কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকরা পতিতা, সমাজ নিষিদ্ধ প্রেম বা যৌন চেতনা নিয়ে একটা রোমান্টিক মনোভাবশত হৈ চৈ তুলতে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু দাম্পত্য সমস্যা বা নষ্ট দাম্পত্য তাঁদের কাছে অতটা গুরুত্ব পায়নি। এটা ঠিকই প্রেমের যে শান্ত স্নিগ্ধ সৌরভ হৃদয়ের গভীরে সঞ্চারিত হয় বা প্রেমের যে অতীন্দ্রিয়া মহিমা তার বিরোধিতা ছিল কল্লোল চেতনায়। তবে ছিল বিবাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং বিবাহব্যতিরিক্ত আকর্ষণ বিস্তারে আগ্রহ। অনেক দুঃখে সেই মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল, তার দুপাশে ছিল মাথা ঠুকবার দুই দেয়াল। একপাশে নিজের স্বামী, আর একপাশে সিতাংশুমৌলি। জীবনের চোরাগলিতে কোনো দেয়ালের আঁচড়ই সে লাগতে দেয়নি প্রাণের গায়ে। তার মুক্তি আকাশচারী বিহঙ্গমের।
বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়পূরুষ ও অলোকসামান্য প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁকে নিয়ে সাহিত্য জগতে বিস্ময়ের সীমা নেই। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনার সমালোচনার যেন শেষই হয় না। রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর এক অনবদ্য সৃষ্টি ছোটোগল্প নিয়ে নতুন নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের (১৮৯১-১৯২৯) একটি বিখ্যাত গল্প ‘নষ্টনীড়’ (১৩০৮)। এই গল্পটিকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নতুন করে খোঁজার চেষ্টা চলছে। বেশ কিছুকাল আগে পশ্চিমবঙ্গের লেখক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের (?) ‘কবি ও কবিপত্নী’ (দেশ, ৪মে ২০০৩) শিরোনামের একটি লেখাকে কেন্দ্র করে সেইসময় তুমুল সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ‘নষ্টনীড়’ গল্পটিকে আধুনিক অনেক লেখক, গবেষক, প্রাবন্ধিকেরা রবীন্দ্রনাথের জীবনের ফটোকপি বলে মনে করেন। এর বিপক্ষেও যে মত নেই তা নয়। আমরা যারা এ গল্পটি পড়েছি, বা এখনো যারা পড়িনি, তারা পড়ে দেখলে দেখতে পাবেন, রবীন্দ্রনাথের জীবনের সবচেয়ে পরমপ্রিয় সঙ্গী মৃণালিনী দেবী (১২৮০-১৩০৯ বঙ্গাব্দ) অথবা কাদম্বরী দেবীকে (১৮৫৯-১৮৮৪) ঘিরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মনের অজান্তেই গল্পটি রচনা করে ফেলেছিলেন। গল্পের মধ্য দিয়ে যে জীবনের ঘটনাবলীকে অতি সুক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা যায়, ‘নষ্টনীড়’ গল্পটি তারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহন করে বৈকী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দোষারোপ করা বা সন্দেহ করা নয়, তাঁর প্রতি কোন অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনও নয়, আর এমন মানুষকে অসম্মান করে বাংলা সাহিত্যে সেরকম মানুষের খোঁজ পাওয়া ভার। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সত্য কথা যেটি, তাহলো রবীন্দ্রনাথকে জানতে হলে, তাঁকে ভালোবাসতে হলে, উপলব্ধি করতে হলে, তাঁর সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে হলে, তাঁর সম্পর্কে সত্যটিকেই আমাদের মেনে নিতে হয়।
‘নষ্টনীড়’ (১৩০৯) রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প। কেউ কেউ এই গল্পটির সঙ্গে রবীন্দ্র-জীবনকে মেলাতে চান। ‘নষ্টনীড়ে’র কাহিনি সত্য কিনা তার যেমন জ্বলন্ত কোন প্রমাণ ও উদাহরণ আমাদের হাতে নেই; তেমনিভাবে রবীন্দ্র-জীবন প্রবাহে ঘটনাবলী বিশ্লেষণে তাঁর সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করা যায় তাও যে মিথ্যা তাই বা প্রমাণ করা যায় কীভাবে? তাছাড়া তাঁর রেখে যাওয়া সমুদ্র সমান সাহিত্যের এরকম অনেক ঘটনা, এসব কিছু জানার প্রেরণা হিসেবেও কাজ করে থাকে। শুধু মনের উপলব্ধি দিয়েই তাঁকে জানা যায় না, তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যের মধ্যেও আমাদের অবগাহন করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত গল্প সম্ভাবত ‘নষ্টনীড়’ই। গল্পটি নিয়ে এর আগে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। গল্পের মাঝে প্রায় সকলেই তাঁর জীবনের পরম প্রিয় অধ্যায়ের গন্ধ খুঁজে পান। এর আগে মনে করা হতো ‘নষ্টনীড়’ গল্পে ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনি সম্ভবত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কাদম্বরী দেবী-রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে। অর্থাৎ গল্পটির ভুপতির ভূমিকায় যিনি আছেন তিনি রবীন্দ্র ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ (১৮৪৯-১৯২৫), চারুলতার ভূমিকায় রবীন্দ্র বউদী কাদম্বরী দেবী (১৮৫৯-১৮৮৪), আর হৃদয়গ্রাহী চরিত্র অমলের ভূমিকায় রয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।রবীন্দ্র জীবনের অধ্যায়গুলো বিশ্লেষণ করে প্রায় সকলেরই এক মত যে, গল্পটিতে কিছুটা হলেও রবীন্দ্রনাথের জীবনের স্মৃতিচিহ্ন বিদ্যমান রয়েছে। বিশিষ্ট রবীন্দ্র-গবেষক, কট্টর সমালোচক, লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরী (১৮৯৭-১৯৯৯) তাঁর আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ (২য় খণ্ড) (১৩৯৮ বঙ্গাব্দ) গ্রন্থে বলেছেন ‘রবীন্দ্রনাথ নষ্টনীড় লিখিয়া জনশ্রুতিকে ইতিহাস বলিয়া গ্রহণ করিবার অবকাশ কেন দিলেন তাহা আমি আজ পর্যন্ত ভাবিয়া স্থির করিতে পারি নাই। কাদম্বরী দেবীর ব্যাপারে তাঁহার কোনো অপরাধ জ্ঞাতসারে ছিল না তাহা দেখাইয়া জনশ্রুতির বিরুদ্ধে নিজের সাফাই গাহিতে চাহিয়াছিলেন, এই সিদ্ধান্ত করিয়া আমি রবীন্দ্রনাথের অপমান করিব না’। কিন্তু গোলমাল বেঁধে গিয়েছিল অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের ‘কবি ও কবিপত্নী’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার পর। এতদিন যে ধারণা নিয়ে সাহিত্য রসিকরা রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে ফিরছিলেন, তারা আবার পেছন ফিরে রবীন্দ্রনাথকে দেখতে চাইছেন। চলার পথের চাকা আবার পেছনমুখী হয়েছে। এ বুঝি গবেষণারই ফল। অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য প্রমাণ করতে চেয়েছেন, আসলে ‘নষ্টনীড়’ গল্পের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি নিশ্চিত রবীন্দ্রজীবনের প্রতিচ্ছবি। তবে তা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথের সাথে ভূপতি-চারুলতা-অমল সাদৃশ্যে তুলনীয় নয়, বরং বিস্ময়করভাবে এটি রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনী-বলেন্দ্রনাথ কাহিনির সঙ্গে যুক্তিযুক্ত। এরকম মন্তব্য তিনি প্রকাশ করার পর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবনার জগৎ কিছুটা বদলাতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথকে তিনি যা বলতে চেয়েছেন এবং প্রমাণ করতে চেয়েছেন তাহলো গল্পটিতে ভূপতির চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ, যিনি একটি ইংরেজী পত্রিকার সম্পাদক। আমরা জানি ব্যক্তিগত জীবনে রবীন্দ্রনাথ ‘সাধনা’ (১৮৯১) পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। গল্পটির সঙ্গে এর একটা যোগসাযুজ্য আছে। অপরদিকে মৃণালিনী দেবী চরিত্রের সঙ্গে চারুলতা চরিত্রটিরও একটি গভীর মিল পরিলক্ষিত হয়। আর তাহলো মৃণালিনী কম শিক্ষিত হলেও রবীন্দ্রনাথের জীবনে এসে সে যথেষ্ঠ সাহিত্য মনস্ক মানুষ হয়ে উঠতে থাকে। তার প্রভাব আমরা এই গল্পটির মধ্যে পরিলক্ষিত হতে দেখি। গল্পটির মধ্যে আরো যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে তাহলো- চারুলতা চরিত্রের মধ্যে দারুণ এক নিঃসঙ্গতা। আর সেই নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হয়ে এসেছে অমল। সত্যিকার অর্থে ভাবলে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর অপরিসীম কর্মময় জীবনে এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, পর্যাপ্ত সময় তিনি তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে দিতে পারেননি। মৃণালিনীর সেই নিঃসঙ্গতায় সঙ্গী হয়ে দেখা দেয় তাঁর ভাই বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৪৫-১৯১৫) পুত্র ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭০-১৮৯৯)।
গল্পের মধ্যে মৃণালিনীর নিঃসঙ্গতা, আর তাঁর জীবনে বলেন্দ্রনাথের সঙ্গপ্রিয়তা চারুলতা-অমলের জীবনের ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রাবন্ধিকগণ মনে করেন। অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের জোর দাবী করে যেটি বলতে চেয়েছেন- তাহলো রবীঠাকুরের স্ত্রী মৃণালিনীকে সময় না দেওয়া ও অবহেলাজনিত কারণে সমবয়সী ঠাকুরপোর সঙ্গে তার সম্পর্কের হাতছানি। শুধু তাই নয়, তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন কালের প্রবাহে বলেন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি মৃণালিনীর জীবনকে আরো মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। গল্পের সাথে এ-কাহিনির সংযোগ যেটি তাহলো- অমলকে আমরা দেখেছি বিয়ে করে বিদেশে চলে যেতে। যার অব্যবহিত পরে চারুলতার জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার সময়। যাকে প্রাবন্ধিক মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি মনে করেন। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর আগে বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বলেন্দ্রনাথকে প্রমথনাথ বিশী (১৯০১-১৯৮৫) ‘রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী বলে মনে করেছেন’। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর সাথে প্রাবন্ধিক মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর যোগসাযুজ্য খুঁজে পেতে চান তিনিও। যে কারণে তিনি উল্লেখ করেন- ‘বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু শোক মৃণালিনীর মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল তা তাঁর শরীরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। নতুবা বলেন্দ্রনাথের অকাল প্রয়াণের তিনবছর যেতে না যেতেই মৃণালিনীর এমন আকস্মিৎ প্রয়াণ কেন?’ এই কেনর জবাব আমাদের পক্ষে দেওয়া কষ্টকর, বরং জানার জন্যে আরো দুর অগ্রসারী হতে পারি আমরা। মৃণালিনী দেবী যখন শিলাইদহে আসেন তখন তাঁর সঙ্গে তিনি তাঁর প্রিয় সঙ্গী হিসেবে বড় মেয়ে মাধুরী লতা (বেলা) (১৮৮৬-১৯১৮), ছেলে রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬১) ও রবীন্দ্র-ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে এসেছিলেন। এটি আমরা রবীন্দ্রনাথের জীবনীতে লক্ষ করি। কাকীমার সঙ্গে তাঁর পদ্মাপারে বেড়ানো, পথ ভুলে হারিয়ে যাওয়া, বালিহাস দেখা, রোমাঞ্চকর অনুভূতির কথা জানতে পারি। সমবয়সী কাকীমার সঙ্গে এটি তাঁর স্নেহ-প্রীতির সম্পর্ক। এটিকে অন্যকিছু ভাবা যায় বলে আমরা মনে করি না। কিন্তু লেখককূল ভেবেছেন অন্যকথা। আমাদের সমস্যা যেটি তাহলো- একই ‘নষ্টনীড়ে’ রবীন্দ্রনাথকে কতভাবে খূঁজে ফিরবো আমরা। ‘নষ্টনীড়’ নিয়ে পূর্বেকার লেখকদের সঙ্গে অমিত্রসূদনের মতানৈক্য যেটি, তাহলো গল্পটির ভূপতিই আসলে রবীন্দ্রনাথ।
‘নষ্টনীড়ে’র কাহিনির সঙ্গে বেশিরভাগ লেখকেরা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ককে মূল্যায়ন করেন বেশি। এ-প্রসঙ্গে আমরা যা জানি তাহলো-ভূপতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রের মিলই বেশি। কেননা বহির্জীবনে ব্যস্ত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী কাদম্বরীকে যথেষ্ঠ সময় দিতেন না। তাঁর বহির্মুখ স্বভাব, স্ত্রীর প্রতি উদাসীনতা, অন্য নারীর প্রতি আসক্তি কাদম্বরীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তাছাড়া কাদম্বরী ছিলেন সত্যিকার অর্থে গল্পের চারুলতার মতই সাহিত্যপ্রেমী, যা রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতিতে (১৯১২) খুঁজে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘সাহিত্যে বউঠাকুরাণীর প্রবল অনুরাগ ছিল। বাংলা বই তিনি যে পড়িতেন কেবল সময় কাটাইবার জন্য, তাহা নহে- তাহা যথার্থই তিনি সমস্ত মন দিয়া উপভোগ করিতেন। তাহার সাহিত্য চর্চায় আমি অংশী ছিলাম’। রবীঠাকুরের উপরোক্ত উক্তির সত্যতাই মেলে বেশি এগল্পের মেলবন্ধনে। কেননা চারুলতা চরিত্রের সঙ্গে কাদম্বরীর যোগসূত্রটা খুঁজে পাওয়া যায় উৎকৃষ্টমানে এগল্পে। তাছাড়া সে আর পাঁচজন সাধারণ রমণীর মত ছিল না। পরিশীলিত মনের অধিকারিণী কাদম্বরীর দিন কাটতো লেখাপড়া এবং সাহিত্যচর্চায়। আর যার পূর্ণ প্রতিরূপ ফুটে উঠেছে গল্পের চারুলতা চরিত্রের মধ্য দিয়ে।
কাদম্বরীর সঙ্গে চারুলতার আরো এক জায়গায় মিল পাওয়া যায় তাহলো- কাদম্বরী নিঃসন্তান ছিলেন, গল্পের চারুলতাও তেমনি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অমল চরিত্রের মিলটাই বড় সুন্দর। অমলের সাথে রবীন্দ্রনাথকেই বেশি মানায়। আর এ-কারণে বলা যায় ঠাকুরবাড়ির নিঃসঙ্গ জীবনে কাদম্বরীর নিঃসঙ্গতার এবং সাহিত্যের প্রিয়সঙ্গী দেবর রবীন্দ্রনাথই ছিলেন। সে কারণে অমল চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিছায়া বললে অত্যুক্তি হয় না। গল্পের কাহিনিতে দেখা যায়, অমলের বিবাহ এবং বিদায়ের পরে চারুলতার নিদারুণ মুষড়ে পরা, যে ঘটনার সঙ্গে কাদম্বরীর মৃত্যুকে টেনে আনতে চায় প্রায় সকলেই। আর তাছাড়া কাদম্বরীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের কথা রবীন্দ্রজীবনে অস্বীকার করার মতো বিষয়ও অবশ্য নয়। গল্পে অমলের বিবাহের সঙ্গে, রবীন্দ্রনাথের বিবাহের কথা যদি চিন্তা করা যায় তাহলে- অমলের বিবাহ পরবর্তী চারুলতার ভেঙ্গে পড়ার কাহিনির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ পরবর্তী সময়ে কাদম্বরীর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রাবন্ধিক সাথী সেন গুপ্তা (?) এ বিষয়ে বলেছেন- ‘কাদম্বরীর মৃত্যু ও কিছুটা রহস্যময়। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের (১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর) কিছুকাল পরে কাদম্বরী আত্মঘাতিনী (১৯ এপ্রিল ১৮৮৪) হয়েছিলেন’।
তাহলে কি বলা যায়, বহু বিতর্কিত ‘নষ্টনীড়’ গল্পের আড়ালে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের গল্পই রচিত হয়েছে গল্পটিতে। গল্পটির মধ্যে মৃত্যুচেতনা, ব্যথা, বেদনা, বিদায়, হারিয়ে যাওয়া, নষ্টালজিয়া ইত্যকার বিষয়গুলোও কাজ করেছে। সেই সকল চেতনার মধ্যে কি তাহলে ভূপতি-চাররুলতা-আর অমলেরা দাঁড়িয়ে? আর সেই বিখ্যাত চরিত্রের মধ্যে চলে এসেছে ঠাকুরবাড়ির মৃত্যু রহস্যগুলো। ভূপতি-চারুলতা-অমলকি তাহলে রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনী-বলেন্দ্রনাথ, নাকি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথ? এর সত্যিকার সমাধান সত্যিই দুরূহ। রবীন্দ্রনাথ সমুদ্রের মতো আমরা সেই সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে নতুন কিছু সন্ধানের অপেক্ষায়। রবীন্দ্রসমুদ্রে নদীরা মিলিত হতে চায় সর্বদাই। সেইসব নদীই কি শেষপর্যন্ত সমুদ্রের ভেতরের রহস্য জানতে পারে? রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘নষ্টনীড়ে’র কাহিনি নিয়ে আরো অনেক অজানা তথ্যই বোধহয় রয়ে গেছে। এখনই সমাধানের সুযোগ আসেনি। সে কারণে আমাদেরও বোধহয় আরো অনেককাল অপেক্ষা করতে হবে, অবিনাশী-অবিনশ্বর সেই রবীন্দ্রজীবনের জন্যেই। রবীন্দ্রগল্পে দাম্পত্য সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আবির্ভুত। দাম্পত্য সমস্যার গভীরে আমরা সমাজের নানা চিত্রও এসব গল্পে উদ্ভাসিত হতে দেখেছি। রবীন্দ্রজীবনও এসবের একেবারে বাইরে ছিলে বলেও মনে হয় না। রবীন্দ্রজীবন ও ছোটোগল্প তাই আমাদের কাছে আধার ও আধেয় স্বরূপ।
বিবাহ এখন একটা আতঙ্ক ও ভীতিকর বিষয় হিসেবে বিবাহযোগ্য নরনারীর কাছে ধরা দিয়েছে। যেখানে এখন দেবদূতরাও পা বাড়াতে ইতস্তত করে! এই একুশ শতকের পৃথিবীতেÑ যেখানে ভাঙনের গান ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে ‘ বিবাহ, দম্পতি, দাম্পত্য এইসব সনাতনী শব্দগুলো দ্রুত হারিয়ে ফেলছে তাদের গুরুত্ব-তখন বিবাহ হয়ে উঠছে এক দহনকালের গল্প। ‘আসলে আমরা এখনো যারা সম্পূর্ণ আধুনিক হয়ে উঠতে পারিনি, যাদের মনে এখনো প্রশ্ন জাগে যে এক হৃদয় ভরা আবেগ আর রঙিন স্বপ্ন নিয়ে নীড় বাঁধতে চাওয়া দুই মানব-মানবী কেনই বা তাদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারে না, কেনই বা তাদের ঐ নিটোল স্বপ্নকে ছিন্ন হতে দেখে নীরব রক্তক্ষরণে নিরুপায়ভাবে ক্ষয়িত হয়। অথচ আমরা আজও তো বিশ্বাস করি দুই অনাত্মীয় নারী-পুরুষের এই ঘনিষ্ট বন্ধন এখনো পৃথিবীর গহিন অন্ধকারে জ্বালাতে পারে জীবনের অনির্বাণ অগ্নিশিখাÑ সৃষ্টি করতে পারে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের বন্ধন। কিন্তু কেন এই প্রত্যাশাভরা রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনকে ঢেকে ফেলে কালান্তক মেঘ?’

ড. বাকী বিল্লাহ বিকুল
অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!