Saturday , November 26 2022
You are here: Home / মতামত / গাইবান্ধায় টার্নিং পয়েন্ট?
গাইবান্ধায় টার্নিং পয়েন্ট?

গাইবান্ধায় টার্নিং পয়েন্ট?

ইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে কারও কোনও আগ্রহ ছিল না, রাজনীতিতেও কোনও উত্তেজনা ছিল না। সাবেক ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনটিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটে তাদের শরিক জাতীয় পার্টিসহ মোট ৫ জন প্রার্থী ছিলেন। তবে বিএনপিসহ মূল বিরোধী দল যথারীতি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাই সবাই আরেকটি একতরফা নিরুত্তাপ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেই নিরুত্তাপ নির্বাচনে দারুণ উত্তেজনা নিয়ে আসে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল দারুণ এক ‘চালে’ বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসেই নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করে ফেললেন।

সকাল ৮টা থেকে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। দৃশ্যত শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ চলছিল। তবে নির্বাচন কমিশন ঢাকায় বসেই সিসিটিভিতে নির্বাচন মনিটর করছিল। তারা স্বচক্ষে নানা অনিয়মের চিত্র দেখে একের পর এক কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে থাকেন। দুপুর ১২টার মধ্যে ৪৪টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে অনেকটা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন। গোপন কক্ষে অন্যরা ঢুকছে, ভোট সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে না। তবে কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো, তা আমরা এখনও বলতে পারব না।’

পুরো নির্বাচনে ভোটগ্রহণ বন্ধ করার আগে দফায় দফায় ৫১টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। সে প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মনে করে ৫১ কেন্দ্রের ভোট বন্ধ হয়ে গেলে বাকি যে কেন্দ্রগুলো আছে তার ভিত্তিতে ফলাফল মূল্যায়ন সঠিক হবে না। পরবর্তীতে বিধিবিধান, আইনকানুন পর্যালোচনা করে কমিশন নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে’।

আরপিও আগেও ছিল। পুরো নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের ছিল। অতীতে বাংলাদেশে বিভিন্ন নির্বাচনে এরচেয়ে আরও অনেক বেশি অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু কোনও নির্বাচন কমিশনই তাদের এই ক্ষমতা কখনও প্রয়োগ করেননি। ফলে অতীতের কোনও নির্বাচন কমিশনই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। বরং তারা সরকারের ধামাধরা হিসেবেই নিন্দিত হয়েছেন। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালও দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক বড় বড় কথা বলে আসছিলেন। কিন্তু মুখের কথায় মানুষের আস্থা অর্জন করা যাবে না। এ জন্য চাই কার্যকর অ্যাকশন। গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্তত কাজী হাবিবুল আউয়াল প্রমাণ করলেন, চাইলে নির্বাচন কমিশনের সুষ্ঠু নির্বাচন করা বা তেমন না করতে পারলে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে।

বিভিন্ন টেলিভিশনে লাইভে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের কথা শুনতে শুনতে আমি একটু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। এমনই আরেকটি উপনির্বাচন বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ। ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সে উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম আর কারচুপির অভিযোগ করেছিল। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ। তিনি নিজে মাগুরা গিয়েছিলেন নির্বাচনি পরিস্থিতি দেখতে। সেখান থেকে ঢাকায় ফেরার পথে হেলিকপ্টারে চড়ার আগে তিনি নিজেও নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কাজী হাবিবুল আউয়ালের মতো তিনি আরপিও’র ৯১ ধারা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিচারপতি রউফ যদি সেদিন হেলিকপ্টারে চড়ার আগে নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। মাগুরা-২ উপনির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সে আন্দোলনের মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফাভাবে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সে নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি বিএনপি। ক্ষণস্থায়ী সে সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান করেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।  সে বছরই ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ।

ছক উল্টে গেছে। সেদিন যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে ছিল সেই বিএনপিই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। তবে কাজী হাবিবুল আউয়াল গাইবান্ধা-৫ আসনের নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে ট্রাম্পের ওপর ওভারট্রাম্প মেরে দিয়েছেন। চাইলে যে নির্বাচন কমিশন ভোট বন্ধ করে দিতে পারে, প্রমাণ করে দিলেন সেটা। তবে ঢাকায় বসে সিসিটিভিতে একটি আসনের নির্বাচন মনিটর করা আর একযোগে ৩০০ আসনের নির্বাচন মনিটর করা এক কথা নয়। আমরা বারবার বলি, আইন থাকলেই হবে না, তার প্রয়োগ করতে হবে। একটি মাত্র আসনে হলেও আইনের প্রয়োগ করে কাজী হাবিবুল আউয়াল অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এটা বারবার বলা হয়, ভালো নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা।

মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির নেতিবাচক টার্নিং পয়েন্ট। গাইবান্ধা-৫ আসন ইতিবাচক টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

About দৈনিক সময়ের কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top
error: Content is protected !!